জরায়ুমুখ ক্যান্সার চিকিৎসায় সাফল্য, কমবে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: সার্ভিক্যাল বা জরায়ুমুখ ক্যান্সার চিকিৎসার গবেষণায় ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছেন গবেষকরা। নতুন চিকিৎসার প্রেক্ষিতে ধারণা করা হচ্ছে রোগটি থেকে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমে যাবে। খবর সিএনএনের।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ক্যান্সারের উন্নত চিকিৎসার অংশ হিসেবে একটি ছয় সপ্তাহের কেমোথেরাপির কোর্স যুক্ত করার ফলে রোগীর বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত সোমবার দ্য ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্রাজিল, ভারত, ইতালি, মেক্সিকো এবং যুক্তরাজ্যের ৩২টি চিকিৎসা কেন্দ্রের ৫০০ জন রোগীর ওপর এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। যাদের ২০১২ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল। সকলেরই শরীরে রোগটি জটিল অবস্থায় ছিল। টিউমার সেল অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল।
গবেষণা পরিচালনায় থাকা কন্ট্রোল গ্রুপ শুধুমাত্র কেমোরাডিওথেরাপিকে একটি আদর্শ প্রক্রিয়া হিসেবে ধরে এই গবেষণা চালায়। যার মধ্যে রেডিয়েশন এবং ড্রাগ সিসপ্ল্যাটিন অন্তর্ভুক্ত ছিল। রোগীদের কেমোরাডিওথেরাপি শুরু করার আগে ছয় সপ্তাহ কার্বোপ্ল্যাটিন এবং প্যাক্লিট্যাক্সেল কেমোথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
গবেষকরা দেখেছেন যে, যারা কেমোথেরাপির একটি সংক্ষিপ্ত কোর্স করেছিলেন তাদের মধ্যে ৮০% অন্তত আরও পাঁচ বছর বেঁচে ছিলেন এবং ৭২% রোগীর কোনো ক্যান্সার ফিরে আসেনি বা ছড়িয়ে পড়েনি।
বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসার সময় কিছু প্রতিকূল ঘটনা ঘটেছিল, যার মধ্যে ক্লান্তি বা দুর্বলতা, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা, সংক্রমণ বা শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা কম ইত্যাদি রয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, কেমোরাডিওথেরাপির আগে কেমোথেরাপি ব্যবহার করে রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনার ক্ষেত্রে তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। জরায়ুমুখ ক্যান্সারে রোগীর এই উন্নতির জন্য অপেক্ষাকৃত খরচও অনেক কম। ওষুধগুলি সস্তা এবং সহজেই পাওয়া যায়।
ইউনিভার্সিটি কলেজ হাসপাতালের ডা. মেরি ম্যাককরম্যাক ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এই রোগের চিকিৎসা গবেষণায় গত ২০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি সবচেয়ে বড় উন্নতি। আমি ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী সমস্ত রোগীদের জন্য অবিশ্বাস্যভাবে গর্বিত; তারা আমাদের সর্বত্র সার্ভিক্যাল ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসা আরও উন্নত করার সুযোগ দিয়েছে।’
সিসপ্ল্যাটিনভিত্তিক কেমোথেরাপি হল সার্ভিক্যাল ক্যান্সারের চিকিৎসার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলির মধ্যে একটি। এই চিকিৎসায় বেঁচে থাকার হার ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত উন্নত করে। যদিও টিউমার অপসারণ সার্জারি একটি বিকল্প পদ্ধতি, কিন্তু কিছু বিশেষজ্ঞ কেমোথেরাপি পছন্দ করেন।
সার্ভিক্যাল ক্যান্সার এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ ছিল। এখনও প্রতি বছর এই রোগে দেশটির প্রায় ৪ হাজার নারী মারা যায়।
ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন অনুসারে, সার্ভিক্যাল ক্যান্সার স্ক্রীনিং সাধারণত এইচপিভিরর লক্ষণগুলির জন্য পরীক্ষা করে যা জরায়ুর কোষে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। স্ক্রীনিংগুলিতে প্রি-ক্যান্সার কোষের পরিবর্তনগুলি দেখার জন্য একটি প্যাপ পরীক্ষাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ইউএস ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এই বছর রোগীদের এইচপিভি পরীক্ষায় তাদের নিজস্ব নমুনা সংগ্রহ করার জন্য একটি নতুন বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, যা স্ক্রিনিং প্রক্রিয়াটিকে সহজতর করে। এটি এইচপিভি ভ্যাকসিন বা স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রায় সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। এমনটি জানিয়েছেন জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অনকোলজির অধ্যাপক ড. ওটিস ব্রাউলি।
এই রোগের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি ব্যবহারে বমি, এবং চুল পড়ার মতো অপ্রীতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে ব্রাউলি উল্লেখ করেছেন। তিনি আশা করেন, ভবিষ্যতে ইমিউনোথেরাপির মতো আরও উন্নত ও কার্যকর বিকল্প এসব রোগের চিকিৎসায় অন্তর্ভুক্ত হবে, যা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একজন ব্যক্তির নিজস্ব ইমিউন সিস্টেম ব্যবহার করবে।
এনএএন/