শৈশবে চিকিৎসক বাবার অ্যাপ্রোনে অভিনয় করতেন ঢাবির তৃতীয় প্রফে অনার্সধারী আনিকা
সাখাওয়াত হোসাইন: ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) কে-৭৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আনিকা তাহসিন তাসু। তাঁর বাবা একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ছোটবেলা থেকে বাবাকে দেখে আনিকা স্বপ্ন দেখেন চিকিৎসক হবেন এবং বাবার পথ ধরে বাবার ক্যাম্পাসেই পড়বেন। তিনি ছোটবেলায় বাবার ওটি ড্রেস পড়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ডাক্তারির অভিনয়ও করেছেন। তার অভিনয় বাস্তবে রুপ নিবে। আর কিছুটা পথ গেলেই নামের আগে ডাক্তার লিখার সৌভাগ্য করবেন আনিকা তাহসিন।
বুধবার (২০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজগুলোর ২০১৮-১৯ সেশনের এমবিবিএস তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। এতে সব বিষয়ে মেডিকেলের সর্বোচ্চ নাম্বার অনার্স পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ঢাকা মেডিকেলের তিন শিক্ষার্থী। এরমধ্যে নোয়াখালীর কৃতি সন্তান আনিকা তাহসিনও একজন। ফল প্রকাশের পর ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে ডিএমসির সবুজ চত্বরে কথা হয় মেডিভয়েস প্রতিবেদকের। আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর সাফল্যের নানা গল্প।
অনুভূতি ও পড়াশোনার কৌশল
আনিকা তাহসিন বলেন, আমি যতটা প্রত্যাশা করেছি, তার চেয়েও বেশি ভালো ফলাফল করেছি। আমি ভাবিনি, এতো ভালো ফলাফল করবো। অনুভূতি আসলে বলার মতো নয়, অনেক অনেক ভালো লাগছে। আমি অনেক বেশি সারপ্রাইজ হয়েছি, এতো ভালো ফলাফল করেছি। এটার ক্রেডিট সবসময় আমি আমার শিক্ষক এবং পিতা-মাতাকে দিবো। তাঁরা আমার জন্য অনেক করেছেন।
অন্যন্যাদের চেয়ে এগিয়ে থাকার কৌশল জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেকে আছে শুধু গাইড বই পড়ে পাস করার চিন্তা করে। গাইড পড়ে ভালোর রেজাল্ট করার চেষ্টা করে। স্বাভাবিকের চেয়ে ভালো ফলাফল করার জন্য গাইড যথেষ্ট নয়, বেসিক অনেক বেশি মেটার করে। দেখা যায় ভাইভাতে অনেক শিক্ষক বেসিক থেকে প্রশ্ন করেন, উত্তর তখনই দেওয়া যাবে, যদি বেসিক ক্লিয়ার থাকে। বেসিক ক্লিয়ার করার জন্য অবশ্যই মূল বই পড়তে হবে, এর কোনো বিকল্প নাই। চতুর্থ বর্ষ এবং ফাইনাল ইয়ারে সময় অনেক কম, পুরো বই পড়ার সুযোগ থাকে না। আমরা ডিএমসিতে সিনিয়র এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে জেনে রাখতাম, কোন কোন বিষয়গুলোর আসার সম্ভাবনা আছে। যেসব প্রশ্ন বিগত বছর বেশি এসেছে, সেগুলো বিস্তারিত পড়ার চেষ্টা করতাম। শুধু গাইড নয়, শিক্ষকদের লেকচার ইত্যাদি ফলো করতাম।
কোন অনুপ্রেরণায় আসা
আমার অনুপ্রেরণার উৎস বাবা। আমার বাবা একজন চিকিৎসক। ছোটবেলা থেকে বাবাকে দেখে আসছি। বাবা মানুষের সেবা করেন। আর সার্জারি ড্রেসের প্রতি আলাদা একটা টান ছিল। ছোটবেলায় যখন দেখতাম বাবা ওটি ড্রেস পড়তো, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে বাবার ওটি ড্রেস পড়ে ডাক্তারির অভিনয় করতাম বাসায়। আমার বাবা নিজেও ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থী ছিলেন। আমার ইচ্ছা ছিল আমি আমার বাবার ক্যাম্পাসে যাবো। ছোটবেলা থেকে বলে আসছে, তুমি বাবার মেয়ে, বাবার মেয়ে। আমিও প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি বাবার মেয়ে। বাবাকে ফলো করতে করতে ঢাকা মেডিকেলে আসা। সেখান থেকে মা-বাবার অনুপ্রেরণায় একটু একটু ভালো রেজাল্ট করার চেষ্টা করতাম।
মেডিকেল লাইফ উপভোগ
মেডিকেল সেক্টরটা অনেক অনেক কনজাস্ট্যান্ট। কম সময়ে অনেক বেশি পড়াশোনা করতে হয় এবং অনেক বড় সিলেবাস আমাদেরকে দেওয়া হয়। আমি অবশ্যই বাংলাদেশের মেডিকেল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছি। অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা একটু নিজেকে বেশি বেশি দেখানোর চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে মেডিকেল শিক্ষার্থীদেরকে বলবো, প্লিজ আপনারা আপাদের বন্ধুদের প্রতি সহানুভূতিশীল হন এবং সহমর্মিতার হাত বাড়ান। কারণ মেডিকেল লাইফটা অনেক চাপের বিষয়। সবাইকে সমানভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সবার এই সক্ষমতা থাকে না। আর সবাই সমানভাবে চাপও নিতে পারে না। এক্ষেত্রে কিছু কিছু মানুষের সহযোগিতা খুব প্রয়োজন। যে একটু পিছিয়ে যাচ্ছে, তার প্রতি ঘৃণা বা অবজ্ঞা নয়, তাঁর প্রতি আমরা সহানুভূতিশীল হই।
আমার কাছে মনে হয়, মেডিকেলে অনেক অনেক চাপ থাকে। খুবই কঠিন পরিস্থিতি। একা নিজে কিছু করা সম্ভব নয়। কঠিন সময় পার করার জন্য আশেপাশের মানুষগুলো অনেক বেশি হেল্পফুল হতে হয় এবং ইতিবাচক হতে হয়। আসলে আমাদের আশেপাশের পরিবেশ ততটুকু হেল্পফুল নয়। একটা মানুষকে উদ্ধার করা এবং তাঁকে অনুপ্রাণিত করা। আমাদের সিনিয়র, জুনিয়র বা ব্যাচমেটদের যদি দেখি ঠিক মতো পড়তে পারছে না। এসময় তাদেরকে হেয় করার চাইতে নিজ থেকে সাহায্য করা উচিত। তাহলে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দুর্ঘটনা কমে যাবে। শিক্ষকদেরও আমি অনুরোধ করবো, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য।
মেডিকেল লাইফে চ্যালেঞ্জ
মেডিকেলের বড় চ্যালেঞ্জ হলো কম সময়ে অনেক বড় সিলেবাস শেষ করা। আর যাদের শিখতে সময় লাগে, তাদেরকে অন্যান্য বিষয়গুলো একটু ত্যাগ করা লাগে। ব্যক্তিগতভাবে আমারও শিখতে অনেক সময় লাগে, এতে অন্যান্য অনেক বিষয় আমাকে ছেড়ে দিতে হয়। সপ্তাহের ছয় ক্লাস এটা আমার কাছে কেমন জানি লাগে। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদেরকে দেখি সপ্তাহে তিন বা চার দিন ক্লাস করে, অন্যান্য সময় তাঁরা সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে সময় দেয় এবং তাঁরা দক্ষতা অর্জন করতে পারে। আমাদেরকে সকাল সাতটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত ক্লাসে থাকতে হয়। ইভিনিং থাকলে সন্ধ্যা হয়ে যায়। এ ছাড়া অনেক বেশি পড়াশোনা করা লাগে। আমরা অন্যান্য সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের দক্ষতা অর্জন করার মতো সময়ই পাই না। আমাদেরকে যদি সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের দক্ষতা অর্জন করার মতো সময়টুকু দেওয়া হয়, তাহলে অনেক ভালো হবে।
নবীন মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ
নতুনদেরকে বলবো, তোমরা হতাশ হইও না। শুরুতে আমিও এসে ধাক্কা খেয়েছি। আমি বাংলা মিডিয়ামে পড়াশোনা করে এসেছি। এখানে এসে হুট করে এতো এতো ইংরেজি বই পড়া লাগছে, খুব কষ্ট হয়েছে। শুরুতে ভাবছি ছেড়ে দিবো, তবে আশা ছাড়িনি। শুরুতে সবারই কষ্ট হয়। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে বানিয়েছেই এমনভাবে যেকোনো পরিস্থিতি যেন সে খাপ খাওয়াতে পারে। সৎভাবে লেগে থাকলে আমরা অবশ্যই মানিয়ে নিতে পারবো। আর শুধু গাইড নির্ভর পড়া আমাদেরকে কমাতে হবে। সময় অনেক কম, পুরো বই পড়তে পারি না। গাইড পড়া লাগবে, কিন্তু গাইডকে মূল সূত্র হিসেবে ধরা যাবে না।
সাফল্যোর ধারাবাহিকতা
মেডিকেলের পাস-ই যথেষ্ট এবং এতে সন্তোষ্ট থাকা উচিত। ৬০ শতাংশ মার্ক পাওয়ার জন্য যে পরিমাণ কষ্ট করতে হয়, যারা প্রফ দেয়, তারাই বলতে পারে কতটা পরিশ্রম করতে হয়। অনার্স মার্ক বা প্লেস এগুলো পেতে অবশ্যই কঠিন পরিশ্রম করতে হয়। তার সাথে ভাগ্যও অনেক বড় বিষয়। দেখা যায়, অনেকে অনেক অনেক বেশি পরিশ্রম করেছে, কিন্তু কোনো এক কারণে অনার্স মার্ক আসেনি। এতে দুঃখ পাওয়া উচিত নয়। কারণ পড়াশোনা করলে তা ভবিষ্যতে কাজে লাগবেই। যেই জ্ঞানটা ভাইবাতে শিক্ষককে দেখানো যায়নি, সেই জ্ঞানটাই কোনো না কোনো দিন কোনো একজন রোগীকে বাঁচাবে। তাই বলি অনার্স ভাগ্যের ব্যাপার, পেলে আলহামদুলিল্লাহ। শিক্ষকরা অনেক সহযোগিতা করেছেন। যারা অনার্স মার্ক পেতে চায়, তাকে সবসময় সর্বোচ্চটা দিতে হবে।
নিজেকে যেখানে দেখতে চান
পড়াশোনা শেষে আমার দেশে থাকার ইচ্ছা নেই। আর যদি দেশে থাকি, বিসিএস দিবো। এর মাধ্যমে নিজেকে ভালো অবস্থানে আনতে চেষ্টা করবো। আমি যদি মেডিকেল খাতে ভালো অবস্থানে যেতে পারি, তাহলে বেশ কিছু পরিবর্তন আনবো। যেগুলোতে আমি ভুক্তভোগী ছিলাম, আমি চাই, আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন সেগুলোর ভুক্তভোগী না হয়। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের হতাশা, দুর্ঘটনা, কম সময়ে অনেক বড় সিলেবাস ইত্যাদি পরিবর্তন আনবো। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গুরুত্ব দিবো। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবাসে যথাযথ সুযোগ-সুবিধা দিবো, যাতে বেসিক বিষয়গুলোতে কোনো সমস্যা না হয়।
বিগত ফলাফল
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় ১০৫তম স্থান অর্জন করেছি। এমবিবিএস ফার্স্ট প্রফেশনাল পরীক্ষা ফিজিওলজি বিষয়ে অনার্স মার্কসহ পাস করেছি। সেকেন্ড প্রফেশনাল পরীক্ষায় কমিউনিটি মেডিসিন এবং ফরেনসিক মেডিসিন দুই সাবজেক্টে অনার্স মার্ক পেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।
বেড়ে ওঠা
গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে জন্মগ্রহণ করেন আনিকা তাহসিন। মফস্বলেই তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। নোয়াখালী সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তাঁর বাবা ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে- ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি নোয়াখালী আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজের নাক কান গলা বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর মাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তিনি বর্তমানে নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। দুইবোনের মধ্যে বড় আনিকা তাহসিন।
এএইচ
-
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
-
২৯ ডিসেম্বর, ২০২৪
-
২৫ ডিসেম্বর, ২০২৪
-
১২ ডিসেম্বর, ২০২৪
-
২৯ নভেম্বর, ২০২৪
-
২৭ নভেম্বর, ২০২৪
-
২৭ নভেম্বর, ২০২৪
-
২৭ নভেম্বর, ২০২৪
-
২৭ নভেম্বর, ২০২৪