বৈঠকে সমাধান হয়নি, কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা পাবনা মেডিকেল শিক্ষার্থীদের
মেডিভয়েস রিপোর্ট: আট দফা দাবিতে পাবনা মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনে আশ্বাস দিয়ে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ পার পেতে চায় বলে দাবি করেছে শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে ক্লাস, ওয়ার্ড-পরীক্ষা বর্জন করে আরও কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তাঁরা।
আজ রোববার (২৩ জুলাই) বেলা সাড়ে ১২টা থেকে দুইটা পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চলা বৈঠক শেষে এ ঘোষণা দেন পাবনা মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা। পরে বিষয়টি মেডিভয়েসকে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক শিক্ষার্থী।
তাঁরা বলেন, ‘আজকে মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধি দল আমাদের সাথে মেডিকেলের তানিজা হায়দার সম্মেলন কক্ষে শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় সভার আয়োজন করেন। সেখানে তাঁরা তাঁদের সীমাবদ্ধতা ও বৈশ্বিক সংকটের কথা বলে গতানুগতিক আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা আশানুরূপ কোনো সমাধান না পাওয়ায় পরবর্তীতে আন্দোলন আরও বেগবান করতে সচেষ্ট হবে। সেই সঙ্গে যত দিন না পর্যন্ত সমস্যার সমাধান হবে না তত দিন পর্যন্ত আন্দোলন ও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।’
তাঁরা আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে যে, সকল ছোট ও সহজ দাবিগুলো আছে, সেগুলো বাস্তবায়নেও কলেজ কর্তৃপক্ষ কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, বরং ব্যর্থতা স্বীকার করে সব দায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত বিভাগের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আজ বিকেলে পাবনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. উবায়দুল্লাহ ইবনে আলী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তার কথা বলেছে, তাদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ, প্রশাসন আর গোয়েন্দার সংস্থার কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার দাবিটি সমাধান হচ্ছে। গেইটে দারোয়ান রাখা হচ্ছে, পাবনা মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা ছাড়া কেউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। গণপূর্তকে ডাকা হয়েছে, পানির সমস্যা সমাধান হচ্ছে। আমার পক্ষ থেকে যেসব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব, সেগুলোর সমাধান করে দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মূল দাবি হলো মেডিকেলের স্থায়ী তিনটা বাস। এরপর দৃষ্টিনন্দন গেইট, মেডিকেলের সীমানা তৈরি করা। এসবের বরাদ্দ সরকার থেকে দেওয়া হয়নি, বাজেট আসলে করে দেওয়া হবে। এর আগে তাঁরা হাসপাতালের দাবি করেছিল, এখন হাসপাতাল প্রস্তুত হওয়ার পথে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যুতের ডুয়েল লাইন চেয়েছে, বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে কথা বলেছি। তারা বললো, হোস্টেলে কখনও ডাবল লাইন দেওয়া হয় না। শিক্ষার্থীদের কিছু দাবি চাইলেও এই মুহূর্তে মেনে নিতে পারি না। আমরা চাই সমস্যার সমাধান হোক, সেদিকেই আমাদেরকে যেতে হবে। শিক্ষার্থীরা ক্লাস, পরীক্ষা দিলে না তাদেরও ক্ষতি, আমাদেরও খারাপ লাগে। আমরা সর্বাত্মকভাবে চাইবো, শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে ক্লাসে ফেরাতে।’
শিক্ষার্থীদের দাবিসমূহ: ১. পাবনা মেডিকেল কলেজে ৩টি নিজস্ব বাসের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে, ২. হোস্টেল ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে, ৩. কলেজ গেট নির্মাণ, কলেজের সামনের রাস্তা সংস্কার ও গরু-ছাগলের অবাধ বিচরণ বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে, ৪. হোস্টেলের ভিতরের জলাবদ্ধতা দূর করতে হবে, ৫. হোস্টেলে নিয়মিত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে হবে, ৬. হোস্টেলের বিদ্যুৎ বিভ্রাট সমস্যা সমাধান করতে হবে, ৭. ডাইনিংয়ে স্থায়ী ভর্তুকির ব্যবস্থাকরণ এবং ৮. স্থায়ী খেলার মাঠের ব্যবস্থা করতে হবে।
শিক্ষার্থীরা বলেন, পাবনা মেডিকেল কলজের নিজস্ব হাসপাতাল নেই। তাঁদেরকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে জেলা সদর হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ক্লাস ও ওয়ার্ড করতে যেতে হয়। অন্যদিকে মেডিকেলের নিজস্ব কোনো পরিবহনও নেই, চুক্তি করে বাস ভাড়া করা হয়। গত ৩০ জুনের পর থেকে ভাড়া করা বাসের সেবাও বন্ধ রয়েছে। এতে তাদের দীর্ঘ ভোগান্তি ও পড়াশোনা বিঘ্নিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, তারা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এসব দাবি নিয়ে কথা বলেছেন, মেডিকেল কর্তৃপক্ষ তাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছে না। এসব কারণে ক্লাস-ওয়ার্ড বর্জন করেছেন তারা। এর আগেও তাদেরকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো কাজ করা হয়নি। শুধু ভোগান্তি দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে পরবর্তী আরও কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করবেন বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন শিক্ষার্থীরা।
জানতে চাইলে গত ২০ জুলাই পাবনা মেডিকেলের শিক্ষার্থী সুরাইয়া সারমিন শান্তা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদেরকে ক্লিনিক্যাল ক্লাস ও ওয়ার্ড করার জন্য জেলা সদর হাসপাতালে যেতে হয়, মেডিকেলের পরিবহন সেবা বন্ধ থাকার কারণে সেখানে যেতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। ক্যাম্পাসে বাহিরের টিকটকার-বখাটে ছেলেরা এসে মেডিকেলের মেয়েদেরকে বিরক্ত করে, আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। রাতে তো বের হওয়া যায়-ই না এবং বিকালে বের হতেও বখাটেদের ভয় থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেডিকেলে এতো বেশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট, যা বলার মতো নয়। ফলে আমাদের পড়াশোনা করা সম্ভব হচ্ছে না। হোস্টেলের খাবারের মানও ভালো না, ভর্তুকির ব্যবস্থা করে খাবারের মান ভালো করতে হবে। পরিবহন সংকটেরও সমাধান দ্রুত করতে হবে।’
আরেক শিক্ষার্থী ইফতেখার আহমেদ আকাশ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মেডিকেলের নিজস্ব কোনো পরিবহন নেই, কিছুদিন পর পর চুক্তি করে বাস ভাড়া করা হয়। এ বছর আমরা কোনো বাস পাচ্ছি না, অনেক দিন ধরে বাস সেবা বন্ধ। হাসপাতালে শহরের ভিতর দিয়ে যেতে হয়, এতে অনেক যানজট থাকে। একসাথে অনেক শিক্ষার্থী ওয়ার্ডে ক্লাস করার জন্য বের হয় এবং মেডিকেলের নিজস্ব পরিবহন না থাকার কারণে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়। রাস্তায় পর্যপ্ত পরিমাণে পরিবহন পাওয়া যায় না। প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভাড়া দিয়ে ওয়ার্ড করতে যেতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের মানসিক কষ্ট ও ভোগান্তি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচ বছর ধরে যে হোস্টেল নির্মাণ করা হচ্ছে, এর মধ্যে একটার দুই তলা পর্যন্ত করা হয়েছে, আরেকটা তিন তলা পর্যন্ত করে কাজ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ ছয়তলা ফাউন্ডেশন করা হয়েছে। দ্রুত শিক্ষার্থীদের আবাসিক সমস্যা সমাধান করতে হবে।’
-
২৩ জুলাই, ২০২৩
-
২০ জুলাই, ২০২৩
-
১৭ নভেম্বর, ২০২১