ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস; বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস (গাইনি এন্ড অবস্)
ফিগো ফেলো (ইতালি)
গাইনি কনসালটেন্ট, 
পপুলার ডায়াগনোস্টিক সেন্টার, বগুড়া
কালচারাল সেক্রেটারি, ওজিএসবি, বগুড়া

 


১৪ জানুয়ারী, ২০২৩ ০৬:৫২ পিএম

অ্যান্ডোমেট্রিওসিস: এক ভয়াবহ যন্ত্রণার নাম

অ্যান্ডোমেট্রিওসিস: এক ভয়াবহ যন্ত্রণার নাম
জরায়ুর মোট তিনটি স্তর থাকে। সবচেয়ে বাইরের পর্দা পেরিমেট্রিয়াম। মাঝের মাংসল স্তর মায়োমেট্রিয়াম। আর সবচেয়ে ভেতরের স্তর এন্ডোমেট্রিয়াম।

সদ্য কৈশোরে পা রেখেছে দুরন্ত পিয়া (ছদ্মনাম)। পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর হঠাৎ ই তার এতদিনের দুরন্তপনায় ছেদ পড়ল। পিরিয়ডের দিনগুলোতে ভয়াবহ যন্ত্রণা দিন দিন বাড়তেই থাকল। সবাই বলতে লাগল, কারো কারো এমন হয়েই থাকে। এটাই স্বাভাবিক। সহ্য করো। কিন্তু যত দিন যায়, সহ্যের মাত্রা তত ছাড়িয়ে যায়।

বছরখানেক পর যখন দূরন্তের স্কুল তো বটেই, পরীক্ষাও বাদ দিতে হলো পিরিয়ডের কারণে। তখন তাকে নেওয়া হলো ডাক্তারের কাছে। সব পরীক্ষা করে চিকিৎসক বললেন, দূরন্তের ডিম্বাশয়ে একটা চকলেট সিস্ট হয়েছে।

মাস চারেক আগে সন্তান জন্মদান করেছে রতি (ছদ্মনাম)। আগে পিরিয়ড নিয়ে কোন ঝামেলা না থাকলেও ইদানিং পিরিয়ড হলে যন্ত্রণায় ছটপট করে। সবাই বলতে লাগল, বাচ্চা হওয়ার পর কারো কারো এমন হয়েই থাকে। ঠিক হয়ে যাবে ধীরে ধীরে। ঠিক হওয়া তো দূরে থাকুক, দিন দিন পিরিয়ড রতির কাছে হয়ে উঠল এক আতঙ্কের নাম।

সহ্যের সীমা পেরিয়ে যখন পিরিয়ডের সময়গুলোতে তার দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হতে লাগল, তখন স্মরণাপন্ন হলো একজন গাইনেকোলজিস্টের। চিকিৎসক পরীক্ষা করে বললেন, সব দেখে মনে হচ্ছে, আপনার অ্যান্ডোমেট্রিওসিস হয়েছে।

রাইসা (ছদ্মনাম) বিয়ের এক বছর পর থেকেই সন্তান ধারণের চেষ্টা করছে। প্রায় বছর পাঁচেক হতে চলল, সন্তান তো হচ্ছে ই না, বরং তার পিরিয়ডের ব্যাথা ভয়ংকর আকার ধারণ করছে দিনকে দিন।

ইদানিং পিরিয়ডের দিনগুলোতে সে অফিসও ঠিকমতো করতে পারে না। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে রাইসার অ্যান্ডোমেট্রিওসিসে ধরা পড়লো। অ্যান্ডোমেট্রিওসিস এই খটমটে শব্দটা কারো কারো পরিচিত হলেও বেশিরভাগ মানুষের কাছেই একেবারে অপরিচিত একটি শব্দ। কি হয় এতে?

জরায়ুর মোট তিনটি স্তর থাকে। সবচেয়ে বাইরের পর্দা পেরিমেট্রিয়াম। মাঝের মাংসল স্তর মায়োমেট্রিয়াম। আর সবচেয়ে ভেতরের স্তর এন্ডোমেট্রিয়াম। প্রতি মাসে ইস্ট্রোজেন নামক হরমোনের প্রভাবে এই এন্ডোমেট্রিয়াম কিছুটা বিস্তারিত হয়ে নিজেকে সম্ভাব্যভ্রূণের জন্য তৈরি করে। কেননা, এখানেই তৈরি হয় ভ্রূণের শয্যা। যে সাইকেলে ভ্রূণ তৈরি হয় না, অ্যান্ডোমেট্রিয়ামের অতিরিক্ত অংশটুকু নষ্ট হয়ে ঝরে পড়ে, যেটাকে আমরা সাধারণ ভাষায় পিরিয়ড বা মাসিক বলে থাকি।

এখন কোন কারণে যদি এই অ্যান্ডোমেট্রিয়াম তার স্বাভাবিক আবাসস্থলের বাইরে বাসা বাঁধে। যেমন- ডিম্বাশয়, ডিম্বনালী কিংবা তলপেটের অন্য কোন অংশে, এটাকে আমরা বলি এন্ডোমেট্রিওসিস।

অ্যান্ডোমেট্রিওসিসে ব্যাথা কেন হয়? হরমোনের প্রভাবে প্রতি মাসে অ্যান্ডোমেট্রিয়াম যে যে স্থানে বাসা বাঁধে প্রতিটিতেই বিস্তার লাভ করে। পরবর্তীতে ভ্রূণ তৈরি না হলে পিরিয়ডের যখন শেডিং (shedding) শুরু হয়, জরায়ুর মূল অ্যান্ডোমেট্রিয়াম ঠিকই তার অতিরিক্ত অংশটুকু ঝরিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু অস্বাভাবিক স্থলে বাসা বাঁধা অ্যান্ডোমেট্রিয়ামের শেডিং জমা হতে থাকে নিজ আবাসস্থলেই। ফলে শুরু হয় তীব্র ব্যাথা। ধীরে ধীরে এটি বাড়তে থাকে। বের হওয়ার তো কোন পথ নেই। আর দিন দিন বাড়তে থাকে ব্যাথা।

এডেনোমায়োসিস আর অ্যান্ডোমেট্রিওসিসের মধ্যে পার্থক্য কি?

অ্যান্ডোমেট্রিওমা যখন জরায়ুর মাংসল স্তরের মধ্যে বাড়ে তখন এটাকে বলা হয় এডেনোমায়োসিস। এক্ষেত্রেও প্রতি মাসে পিরিয়ডের সময় প্রচুর ব্যাথা হয়। সেই সাথে রক্তক্ষরণও বেশি হয়। সাধারণত এটি একটু বেশী বয়সের দিকে হয়।

চকলেট সিস্টের সাথে অ্যান্ডোমেট্রিওসিসের কি সম্পর্ক? এন্ডোমেট্রিওসিস ডিম্বাশয়ের মধ্যে হলে প্রতি মাসে পিরিয়ডের রক্ত একটি নির্দিষ্ট ওয়ালের মধ্যে জমা হয়ে তৈরি করে সিস্ট। ঐ রক্ত যেহেতু শেডিং হতে পারে না, ধীরে জমাটবদ্ধ হয়ে চকলেটের রঙ ধারণ করে। এটাকে তাই বলা হয় চকলেট সিস্ট। কেন হয় এন্ডোমেট্রিওসিস?

বলা হয়ে থাকে, কিছুটা জেনেটিক প্রবণতা রয়েছে এ ব্যাপারে। আবার কখনো কখনো জন্মগত ত্রুটির কারণে যোনীপথের কোথাও প্রতিবন্ধকতা থাকলে পিরিয়ডের শেডিং স্বাভাবিক গতিপথ বদলে উল্টোদিকে ধাবিত হয়। ফলশ্রুতিতে পেটের ভেতরের দিকে গিয়ে তলপেটের বিভিন্ন অংশে বাসা বাঁধে। এই একই ঘটনা ঘটতে পারে জরায়ুর মুখে কোন অপারেশানের কারণে উক্ত স্থানে ক্ষত হয়ে স্বাভাবিকতা নষ্ট হলে। সিজার বা জরায়ুর অন্য কোন অপারেশানের সময় কোন কারণে জরায়ুর ভেতরের স্তর বাইরে প্রতিস্থাপিত হলে। এছাড়াও আরো জটিল কিছু কারণ আছে যা সাধারণের বোধগম্য নয়।

জটিলতা কি হতে পারে?

অ্যান্ডোমেট্রিওসিস হরমোন নির্ভরশীল একটি ক্রমবর্ধমান রোগ, এর প্রবৃদ্ধি যতো বাড়ে ততো ছড়াতে থাকে আশেপাশের অঙ্গাংশে। ফলে ক্রমশঃ বাড়তে থাকে জটিলতা। যে কোন অঙ্গের উপরি ভাগে এটি জমা হয়ে উক্ত অঙ্গের মসৃনতা নষ্ট করে। ফলে একটি অঙ্গাংশ আরেকটির সাথে জোড়া লেগে যায়। নষ্ট হয় অঙ্গাংশের স্বাভাবিক গঠন এবং অবস্থান। ফলে পিরিয়ডের ব্যাথার পাশাপাশি হতে পারে অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ। বেড়ে যায় বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি।

করণীয় কি?

আমাদের দেশের মেয়েদের ব্যাথা সহনীয়া একটা ট্যাবু আছে। আমি এটাকে বলি ‘ব্যাথাবিলাস’। পিরিয়ডের ব্যাথাকে মেয়েরা স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষেপণ করে। এরপর যখন অসহনীয় হয়ে ডাক্তারের কাছে আসে, ততদিনে রোগের জটিলতা অনেক বেড়ে যায়। তাই, পিরিয়ডের ব্যাথার ব্যাপারে অবহেলা না করে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ গাইনেকোলজিস্টের পরামর্শ নিয়ে সময়মতো রোগ নির্ণয় করা এবং এর প্রতিকার করা জরুরি।

সর্বসাধারণের সচেতনতা-ই দিতে পারে অ্যান্ডোমেট্রিওসিসের মতো যন্ত্রণাদায়ক রোগের জটিলতা থেকে সঠিক সময়ে মুক্তির উপায়।

এসএএইচ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : স্বাস্থ্য টিপস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি