অধ্যাপক ডা. মো. বাহাদুর আলী মিয়া

অধ্যাপক ডা. মো. বাহাদুর আলী মিয়া

নিউরোলজি বিভাগ, বিএসএমএমইউ


০৮ জুন, ২০২৩ ০৫:৫৫ পিএম

ধূমপান ও ক্যামিকেলে বাড়ে ব্রেন টিউমারের শঙ্কা

ধূমপান ও ক্যামিকেলে বাড়ে ব্রেন টিউমারের শঙ্কা
ব্রেন টিউমারের প্রতীকী ছবি।

প্রতিনিয়ত বাড়ছে দেশে ব্রেন টিউমারের রোগীর সংখ্যা। ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকেই এ রোগের চিকিৎসা নিতে পারেন না। আর দেশে এই রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও হাতেগোনা। আবার অধিকাংশ মানুষই জানেন না রোগটি সম্পর্কে। ফলে চিকিৎসায় জটিলতা আরও বেড়ে যায়। আসুন, জেনে নেওয়া যাক ব্রেন টিউমার আদ্যোপান্ত।

ব্রেন টিউমার কি?

আগে টিউমার সম্পর্কে জানতে হবে। টিউমার হলো, আমাদের শরীরে সাধারণ টিস্যুগুলো যখন অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়, সেটাই টিউমার। যেটা আমাদের শরীরের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। আর এই বৃদ্ধি পাওয়াটা যদি ব্রেনের মধ্যে হয়, তাহলে সেটা ব্রেন টিউমার।

ব্রেন টিউমার কেন হয়?

এর নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি। তবে কিছু কিছু কারণ আছে, যেগুলো টিউমার হওয়ার জন্য কাজ করে। টিউমার আমাদের শরীরের ডিএনএ নষ্ট করে ফেলে। এ কারণে জন্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। তারমধ্যে রেডিওথেরাপি, এক্স-রে, ধূমপান, কিছু কিছু ক্যামিকেল আছে, খাবারের রং। এগুলো বেশি বেশি ব্যবহার করলে ব্রেন টিউমার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই টিউমারের কোনো কারণ জানা যায় না।

ব্রেন টিউমারের প্রকার

প্রাথমিকভাবে ব্রেন টিউমারকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একটা হলো ব্রেনের নিজস্ব সেল থেকে যে টিউমার তৈরি হয়। যেমন- ব্রেনের নিউরন, ব্রেনের কভারিং অথবা ব্রেনের রক্তনালি থেকে টিউমার তৈরি হলে এটাকে প্রাইমারি ব্রেন টিউমার। আবার অন্য জায়গায় টিউমার হয়, ফুসফুস, পোস্টেট, পেটের বিভিন্ন অরর্গানে কোলন বা লিমনোট—এসব জায়গা থেকে প্রথমে টিউমার হয়। সেটা যদি রক্তমাধ্যমে ব্রেনের গিয়ে জায়গা করে নেয়, এটাকে বলা হয় সেকেন্ডারি টিউমার।

লক্ষণ ও উপসর্গ

টিউমারের কতগুলো লক্ষণ আছে। যেমন- মাথা ব্যথা, ব্রেনের প্রেসার বেড়ে যাওয়া, ঘনঘন বমি আর দৃষ্টি শক্তির ওপর প্রভাব পড়ে এবং আস্তে আস্তে দৃষ্টি শক্তি কমে আসে। এ ছাড়াও টিউমারটা ব্রেনের কোন জায়গায় হচ্ছে, তার উপরও লক্ষণ নির্ভর করে। ব্রেনের কিছু জায়গা আছে, সরাসরি দৃষ্টি শক্তির জন্য কাজ করে, সেখানে হলে দৃষ্টি শক্তি কমে যাবে। ব্রেনের কিছু জায়গা আছে, যা আমাদের চিন্তা-ভাবনা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, এসব জায়গায় হলে এগুলো হৃাস পেতে পারে ইত্যাদি। কিছু জায়গা আমাদের সেন্স নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থাৎ তাপ, গরম, ঠাণ্ডা, ব্যথা—এগুলোর একটা নির্দিষ্ট অংশ ব্রেন ক্যারি করে, এ জায়গাগুলোতে হলে তাপ, ঠাণ্ডা অনুভূতি পাওয়া যাবে না। আবার ব্রেন টিউমার হলে খিচুনিও হতে পারে। তারপর, হাত-পার এক অংশ দুর্বল হতে পারে।

নির্ণয় করা হয় যেভাবে

যেকোনো অসুখেরই নির্ণয়ের কতগুলো ধাপ আছে। প্রথমে দেখি রোগী কিভাবে আমার কাছে আসলো, রোগী কি বলে, কোন লক্ষণ আছে। কেউ যদি বলে আমার এতদিন যাবৎ মাথা ব্যথা করে। তিন, চার মাস, ছয় মাস কিংবা এক বছর হতে পারে। ব্রেন টিউমারের মাথা ব্যথা এমন হয়, অনেক সময় রাতে ঘুম ভেঙে যায়। আর দিনে দিনে ব্যথা বাড়ছে, কমবে না। তবে দিনের কোনো অংশে বাড়তে বা কমতে পারে। অন্য ব্যথা হলে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে চলে যাবে কিন্তু ব্রেন টিউমারের ব্যথা যাবে না। যত সময় যাবে রোগীর ব্রেনে চাপ বাড়বে এবং বমি হতে পারে। এরপর দৃষ্টি শক্তির সমস্যা হবে। খিচুনিও হতে পারে। তখন আমরা ধরে নিবো, এই রোগীর টিউমার থাকতে পারে। অন্য কোনো কারণে ব্যথা হচ্ছে কিনা তাও দেখতে হবে। যেমন- মাইগ্রেনের ব্যথা, আঘাত বা কোনো দুর্ঘটনা ছিল কিনা, টেনশন করে কিনা। এসব কারণ যদি না হয়, তাহলে বুঝে নিতে হবে রোগীর ব্রেন টিউমার হতে পারে। এরপর রোগীর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। আর ব্রেন টিউমার হলে রোগীর শরীরের কোনো জায়গায় তার লক্ষণগুলো দেখা যাবে।

বর্তমান সময়ে ব্রেন টিউমারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনেকটা সহজ হয়ে আসছে। যেমন- সিটি স্কেন আছে, এমআরআই আছে। এছাড়াও আরও কিছু আছে। যেমন-এমআরএস, এটা এমআরআই এর মতই। একই মেশিনে করা হয়, প্রটোকল আলাদা।

ব্রেন টিউমার প্রতিরোধে করণীয়

যে রোগের কোনো কারণ জানা যায়। তা প্রতিরোধ করা খুব মুশকিল। যেমন বলা হয়, রেডিয়েশনে যাতে আমরা না যাই, খারাপ খাবার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকি, যেখান-সেখান থেকে আমরা যেন খাদ্যগ্রহণ না করি। এগুলো আমাদেরকে বেঁচে চলতে হবে। এটি প্রতিরোধ করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করার জন্য আগাম টিকা আছে, কিন্তু টিউমার প্রতিরোধ করার জন্য কোনো টিকা নেই। যে-দুই বা একটা কারণ আছে, সেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে।

আক্রান্তদের চিকিৎসা

ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা। দুই ধরনের হতে পারে। নন-ম্যালিগন্যান্ট, ম্যালিগন্যান্ট। টিউমারটা যদি বড় এবং ব্রেনের খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হয়, তাহলে অপারেশন করতে হবে। ম্যালিগন্যান্ট হলে তো করতেই হবে। অনেকগুলো থাকে ব্রেনের নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, সেগুলো অপারেশন করা সম্ভব হয় না। সিঙ্গেল টিউমার হলে অপারেশন করতে হবে। অপারেশন করা সম্ভব না হলে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি ইত্যাদি নিতে হবে।

সাধারণত কোন বয়সে আক্রান্ত হয়

বাচ্চা বয়সে কিছু কিছু টিউমার হয়। যেমন- মেডেল অব ফেলেস্টোমা, কোরিও ফেলেস্টোমা এগুলো বাচ্চাদের বেশি হয়। বয়স বেশি হলে অন্যান্য টিউমার বেশি হয়। যেমন-লাঞ্চের টিউমার, পোস্টেড টিউমার ইত্যাদি এখান ব্রেনে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর লাঞ্চে টিউমার খুবই কম হয়।

ব্রেন টিউমারে আক্রান্তদের পরিসংখ্যান নেই

বাংলাদেশ কতগুলো টিউমার আছে। তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। ব্রেন টিউমারে কতজন লোক ভুগছে, তার কোনো সার্ভে বাংলাদেশে নেই।

ব্রেন টিউমারের চিকিৎসা অপ্রতুল

এই রোগের চিকিৎসা যে খুব সহজলভ্য তা নয়। কারণ ব্রেন টিউমার অপারেশন করতে নিউরো সার্জন লাগে, নিউরো সার্জন বাংলাদেশে কম। আর এই অপারেশন করতে গেলে একটা আইসিইউ সাপোর্ট লাগে, যেখানে-সেখানে এই অপারেশন করা যায় না। যে হাসপাতালে আইসিইউ আছে বা খুব দ্রুত আইসিইউতে নেওয়া যাবে, এমন হাসপাতালে অপারেশন করতে হয়। ব্রেনের কিছু এরিয়া আছে, সেসব এরিয়াতে টিউমার হলে আইসিইউ সাপোর্ট প্রায়ই লাগে।

কাজেই ব্রেন টিউমার অপারেশন যে, খুব সহজে করা যায়, তা নয়। আর এই অপারেশনের যন্ত্রপাতিগুলোও খুব ব্যয়বহুল। আর এতো জনবহুল দেশে বিশেষজ্ঞ নিউরো সার্জনের সংখ্যাও কম। বেসরকারি হাসপাতালে গেলে অনেক টাকা ব্যয় হয়, আর সরকারি হাসপাতালে অনেক চাপ থাকে। একটা রোগী ভর্তি হলে এক বা দেড় মাস পর তাঁর ব্রেন অপারেশনের তারিখ পড়ে। সরকারি হাসপাতালে আরও ওটি, নিউরো সার্জন নিয়োগ, নিয়মিত অপারেশন করা যায়, তাহলে রোগীরা উপকৃত হবে।

 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত