অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান

অধ্যাপক, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ
 উপ-উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়


২৭ অক্টোবর, ২০২২ ০৩:১৬ পিএম

আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে গবেষণার বিকল্প নেই

আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে গবেষণার বিকল্প নেই
প্রতিবছর বিএসএমএমইউ থেকে শিক্ষক, চিকিৎসক ও ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা মঞ্জুরী প্রদান করা হয়।

বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য গবেষণা কর্মের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি যথার্থই বলেছেন, গবেষণা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) শিক্ষক, চিকিৎসক ও ছাত্রছাত্রীদের গবেষণার প্রতি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর এই অনুধাবন শতভাগ সঠিক। চিকিৎসা পেশাসহ স্বাস্থ্যখাতকে সমৃদ্ধ করতে এবং রোগীদের নিত্য নতুন অত্যাধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে গবেষণার বিকল্প নেই।

উন্নত দেশগুলো চিকিৎসা ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার মূলে রয়েছে তাদের সুগঠিত চিকিৎসা গবেষণার অবকাঠামো। নতুন রোগ, রোগের জীবাণু, রোগ আক্রান্তের প্রক্রিয়া, রোগের চিকিৎসা, কার্যকরী ওষুধ, ওষুধের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উন্নতদেশগুলো সবসময় কয়েকধাপ এগিয়ে। উন্নত বিশ্বে আবিষ্কৃত চিকিৎসা পদ্ধতি বা ব্যবস্থা আমাদের এই ভৌগলিক অবস্থানের জনগণের উপর কার্যকরভাবে প্রয়োগের জন্য চিকিৎসা বিষয়ক গবেষণা অত্যন্ত জরুরি।

বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গবেষণা খাতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মৌলিক গবেষণা ও মনোন্নয়নের জন্য এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছেন যা অত্যন্ত সময়োপযোগী। বিএসএমএমইউ’র গবেষণাখাতের বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ৪ কোটি থেকে ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সমন্বিত গবেষণা কার্যক্রমের ১০০ কোটি টাকা থেকে বিএসএমএমইউ’র শিক্ষকরা ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছেন। এ জন্য আমি সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অধিকতর জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এক সঙ্গে ২৪ জন গবেষক, শিক্ষক ও চিকিৎসককে পিএইচডি কোর্সে ইনরোলমেন্ট করেছে।

আজ ২৭ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ গবেষণা দিবস-২০২২ উদযাপিত হচ্ছে। এতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান প্রধান অতিথি হিসেবে এই মহতী দিবসের উদ্বোধন করেন। যে সময়ে এই গবেষণা দিবস উদযাপিত হচ্ছে, তা দেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বিএসএমএমইউ’র উদ্যোগে সম্প্রতি কোভিড-১৯ এর ৯৩৭টি জেনোম সিকোয়েন্সিং এর উপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। কোভিড-১৯ এর টিকা গ্রহীতাদের উপর গবেষণা কার্যক্রমের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এ থেকেই এটা স্পষ্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাসেবার সঙ্গে সঙ্গে গবেষণা কার্যক্রমকেও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষক, চিকিৎসক ও ছাত্রছাত্রীদের গবেষণার জন্য গবেষণা মঞ্জুরী প্রদান করা হয়। শুধু চিকিৎসাসেবা বা গবেষণা কার্যক্রম নয়, উচ্চতর মেডিকেল শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান ভূমিকা পালন করছে। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে ৫৬টি বিভাগ। এমডি, এমএস, এমপিএইচ, এমফিল, ডিপ্লোমাসহ ১০০টিরও বেশি পোস্ট গ্রাজুয়েট বিষয় চালু আছে। এরমধ্যে ৬২টি হলো রেডিডেন্সী কোর্স। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজ ও ইন্সটিউটের সংখ্যা ৪৬টি। দেশীয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এখানে বিদেশী শিক্ষার্থীরাও উচ্চতর মেডিকেল ডিগ্রী অর্জনের জন্য লেখাপড়া করছেন।

চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে দু-একটি কথা না বললেই নয়। প্রতিদিন প্রায় আট থেকে ৯ হাজার রোগী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগে সেবা নিয়ে থাকেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সকলের জন্য হেলথকার্ড চালু করা হয়েছে। সাধারণ জরুরি বিভাগ চালু ও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য নতুন অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে পেডিয়াট্রিক এন্ডোক্রাইনোলজি ক্লিনিক, পেডিয়াট্রিক থাইরয়েড ক্লিনিক ও গ্রোথ ক্লিনিক, এইচপিভি ল্যাব, শেখ রাসেল চাইল্ডহুড ক্যান্সার সারভাইভর গ্যালারি, রিপ্রোডাকটিভ এন্ডোক্রাইনোলজি এন্ড ইনফার্টিলিটি বিভাগে ডিম্বাশয়ে স্টেম সেল থেরাপি প্রতিস্থাপন, শ্বাসকষ্টসহ বক্ষব্যাধির বিভিন্ন রোগের জরুরি চিকিৎসার জন্য জরুরি বিভাগ, পোস্ট কোভিড কেয়ার সেন্টার,স্লিপল্যাব, ব্রঙ্কোসকপি,  অত্যাধুনিক ইবাস, প্রসিডিউর রুম, শিশু সার্জারি বিভাগে স্কিল ল্যাব, ডিজিটাল লাইব্রেরি, ৩টি ডিভিশন তথা পেডিয়াট্রিক (শিশু) ইউরোলজি ডিভিশন, নিউনেটাল (নবজাতক) সার্জারি ডিভিশন ও পেডিয়াট্রিক সার্জিক্যাল অনকোলজি ডিভিশন এবং হিজরা নামে পরিচিত তৃতীয় লিঙ্গের শিশুদের চিকিৎসার জন্য ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বহির্বিভাগ ক্লিনিক, লিভার ক্যান্সারের সর্বাধুনিক চিকিৎসাগুলোর অন্যতম টেইস চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে।

গবেষণা নিয়ে আরো দু-একটি কথা বলে আমার লেখার ইতি টানছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে স্বতন্ত্র সেল গঠন করা হয়েছে।  গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা, রকফেলার ফাউন্ডেশন, অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সে, সিএমএইচ, ইউনিসেফ, আইসিডিডিআরবি, ঢাকা রোটারি ক্লাব অব মেট্রোপলিটন, যুক্তরাষ্ট্রের হাইল্যান্ড মেডিকেল সেন্টার, ইউএসএইড, সেভ দ্য চিলড্রেন, জন হপকিন্স, শিকাগো ইউনিভার্সিটি, মাহিদোল বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডার নভেল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জাপানের নাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়, এআইএমএস ব্রাউন এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অসংক্রামক রোগ (নন কমিউনিকেবল ডিজিস) গবেষণায় আঞ্চলিক কেন্দ্রের উদ্বোধন করা হয়েছে। করোনাভাইরাস নিয়ে বিভিন্ন ধরণের গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গবেষণা কার্যক্রমে অর্থায়নে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ফান্ড, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। আমি গবেষণা সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের আর্থিক ও কারিগরী সহায়তায় ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের উদ্বোধন করেছেন। এটা বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যসেবাখাতে একটি বড় ধরণের সাফল্য এবং একই সাথে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসা বিষয়ক গবেষণাকে আরো বেগবান করবে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত