ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. মো. নাসির উদ্দিন আহমেদ

সাবেক পরিচালক,
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


১৪ অক্টোবর, ২০২২ ০৩:৪১ পিএম

সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের অনুষঙ্গ

সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের অনুষঙ্গ
তরুণ বয়সেই প্রত্যেকের উচিত, শত কষ্ট সত্ত্বেও আয়ের অন্তত ১৫-২০ ভাগ সঞ্চয় করা। বিশেষ করে সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী সঞ্চয় করা।

একটি সন্তান মাতৃগর্ভে আসার পর মায়ের যত্ন সকলের দায়িত্ব। এই সময়টুকুতে মানসিক ও শারীরিক পরিচর্যা এবং বিশ্রাম প্রয়োজন। শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সবাই এ ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া ধর্মীয় ও সামাজিক দায়িত্ব।

সন্তান লালন পালনে বাবা-মার ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। দুই সন্তানদের সঙ্গে তুলনা করা অন্য সন্তানের মানসিক বিকাশে আঘাত করে। কারো সঙ্গে কারো তুলনা হয় না। একজন সন্তান আরেকজন সন্তানের চেয়ে আলাদা ভিন্ন ভিন্ন পেক্ষাপটে; আবেগগত চাহিদা এবং মানসিক ও শারীরিক বিকাশ আলাদা।  

ছয় বছর পর্যন্ত শিশুকে পুষ্টিকর খাবার, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার শিক্ষা নিবিড় যত্নের সাথে দেওয়া উচিত। লক্ষ্যে পৌঁছাতে কোনো শিশুকে চাপ দেওয়া মা-বাবাসহ অভিভাবকদের জন্য অনুচিত। জীবনে কেবল সুখী ও সফল হওয়াই মানুষের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। 

বর্তমান সামাজিক অবস্থায়, উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সম্প্রসারিত পরিবার থেকে আলাদা হয়ে আমরা নিউক্লিয়ার পরিবারের চলে গিয়েছি। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ, একান্নভুক্ত পরিবারের মধ্যেই যে আদান-প্রদান থাকে সেগুলোর অনুপস্থিতিতে আমাদের শিশুদের কাঙিক্ষত বিকাশ হচ্ছে না।

সকল শিশুকে খেলাধুলা, সামাজিক কাজ ও শারীরিক পরিশ্রমে উৎসাহিত করা উচিত।
 

অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সংসারে অশান্তি তৈরি নয় 

আমার এই দীর্ঘ জীবনে একটি জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করেছি, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধব আমার সম্বন্ধে কি ভাবছে, কি বলছে, সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে সংসারে অনিবার্য অশান্তি আমরা তৈরি করছি। এর থেকে পরিত্রাণের পথ হলো, জ্ঞানী এবং নিরপেক্ষ বুদ্ধিমান ও সৎ মানুষের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করা।

আমিও দেখেছি, বিপদের সময় আত্মীয়-স্বজন, বিশেষ করে ঘনিষ্ঠজনরা আন্তরিকতা নিয়ে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন না, বরং অযাচিত উপদেশ দিবে, কষ্ট দিবে, অপমানিত করবে।

তরুণ বয়সেই সঞ্চয়ী হোন

তরুণ বয়স থেকেই প্রত্যেকটি মানুষের উচিত, শত কষ্ট সত্ত্বেও আয়ের অন্তত ১৫ থেকে ২০ ভাগ সঞ্চয় করে রাখা। বিশেষ করে যাদের সন্তান জন্ম গ্রহণ করেছে, তার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী সঞ্চয় করা।

সন্তানের ভুলগুলো বন্ধু হয়ে শোধরে দিন 

সন্তানকে ভালো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দেওয়া উচিত, সেই সঙ্গে ধর্মীয় ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়া উচিত। কোথাও কোনো ত্রুটি হলে তাদেরকে বন্ধুর মতো বোঝানো উচিত, রাগ দিয়ে নয়।

বয়সন্ধিকালে মেয়ে বা ছেলে অনেক ভুল করতে পারে। খুব শান্তভাবে তাদের বুঝানো উচিত। বাবা-মায়ের জেদ বা অসহনশীলতা মোটেই কাম্য নয়। বাচ্চাদের সঙ্গে সময় দেওয়া ফরজ। ওদের শূন্যতা বা কষ্ট সম্পর্কে মা-বাবাকেই বন্ধু হয়ে জানতে হবে।

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে উঠুক বিশ্বাসের উপর

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের বোঝাপড়া হওয়া উচিত বিশ্বাস এবং ভালোবাসার উপর। এটা না হলে আপনার পরিবারে কখনও শান্তি আসবে না। সকলের উচিত সম্মানবোধ নিয়ে কথা বলা।

বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিন সম্মিলিতভাবে

অসুস্থ যিনি হয়ে যান, হউক সন্তান, মা-বাবা; তার প্রতি সহনশীলতা ও সেবা, সেই সঙ্গে দয়ার্দ্র হওয়া অবশ্য কাম্য। অসুস্থতার সেবা কীভাবে দিতে হয়, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকেই, সে শিক্ষা খুব ছোটবেলা থেকে দেওয়া উচিত। পরিবার প্রধানের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। 

আমাদের সকলেই মিলে মিশে বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেওয়া উচিত, বিশেষ করে তাদের বৃদ্ধ বয়সে। এ দায়িত্ব একজনের উপর চাপিয়ে দেওয়াটা অনুচিত। 

সন্তানের পড়ালেখা আনন্দদায়ক হচ্ছে?

সন্তানকে যখন শিক্ষকের কাছে দেবেন, বিশেষ করে মেয়েদেরকে পুরুষ শিক্ষকের কাছে, সেখানে আপনার উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়। তাকে কখোনই একাকী কোনো পুরুষ শিক্ষকের কাছে বিশেষ করে বয়সন্ধিকালে রাখা উচিত নয়। 

আপনাদেরকে দেখতে হবে আপনার সন্তান কোনো মানসিক শূন্যতায় ভুগছে কিনা, পড়ালেখা তার জন্য আনন্দদায়ক হচ্ছে, নাকি বেদনাদায়ক, তার আনন্দ করার পর্যাপ্ত মাধ্যম আছে কিনা।

খেয়াল রাখবেন, সে কি পরিবারের সাথে যথেষ্ট সময় পাচ্ছে, বাবা-মার সাথে মেলামেশার সুযোগ পাচ্ছে? বাসায় ধর্মীয় রীতিনীতি এবং সামাজিক রীতি-নীতির মধ্য থেকে শালীনভাবে সকলের সঙ্গে বেড়ে উঠা উচিত।

যে পরিবারে স্বাধীনতাবিবর্জিত মেলামেশা হয় সেখানে সবাই অধঃপতিত হতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গৃহিনীর উচিত নয়, উঠতি বয়সী মেয়েদেরকে গৃহপরিচারিকা নিয়োগকরণ। কোনো পুরুষ মানুষকে বিশ্বাস করা উচিত না, সন্মানজনক ব্যতিক্রম বাদে। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম।

বয়সন্ধিকালে সন্তানের প্রতি চাই বাড়তি মনোযোগ

বয়সন্ধিকালে ছেলে-মেয়েদেরকে বাইরে স্বাধীনভাবে ঘুরতে দেওয়া উচিত না। শিশুরা কি করছে, তারা টেলিফোনে কি আলাপ করছে, সেগুলো নজরে রাখা উচিত। স্মার্ট ফোন, কম্পিউটারে বাচ্চা কি করছে তাও দেখা উচিত। প্রতিদিন মা-বাবার উচিত স্কুল-কলেজে তারা কাদের সঙ্গে মিশছে, তারা ঘরে কখন ফিরছে, সে ব্যাপারগুলোতে দৃষ্টি দেওয়া।

আমি আমার এই জীবনে দীর্ঘদিন চাকরিতে পেশাগত কাজ বেশি করেছি, পরিবারকে সময় দেওয়া হয়ে উঠেনি। তাই আমি পরিবারকে ইচ্ছে বা অনিচ্ছায় হোক কিছুটা ধ্বংস করেছি। আপনারা এমনটা করবেন না, সকলের জীবন সুন্দর হোক এই কামনায়। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক