ডা. খান লামিয়া নাহিদ
সহকারী অধ্যাপক, পেডিয়াট্রিক এন্টারোলজি ও পুষ্টি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ ১১:০১ এএম
সুস্থ শিশুর কেমন খাবার চাই?
আদর আর যত্নের অন্যনাম নবজাতক। শিশুদের সুস্থ রাখতে মায়ের বুকের দুধের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে জন্মের পর শালদুধ খাওয়ানো শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছয় মাস পর শিশুকে বাড়তি খাবার দিতে হবে। তবে খাবারদাবার হতে হবে অবশ্যই স্বাস্থ্যসম্মত।
শালদুধের উপকারিতা
ভূমিষ্ট হওয়ার পর নবজাতককে প্রথম যে খাবারটি দেওয়া হয় সেটি হচ্ছে মায়ের বুকের শালদুধ। শালদুধকে বলা হয় শিশুর প্রথম টিকা। কারণ, এ দুধের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এবং রোগ প্রতিরোধকারী এনটিবডি। শিশু যখন শালদুধ পায়, তখন তার পরবর্তী মাসগুলো খুবই ভালো যায়। যেমন: নবজাতক শিশুর ঠাণ্ডা, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশ কমে যায়। তাই শিশু যখন ভূমিষ্ট হয় তখন শালদুধ খাওয়াতে হবে। অনেকে নবজাতককে শালদুধের পরিবর্তে মিছরির পানি অথবা মধু মুখে দেন; এটি করা উচিত নয়। জন্মের পর ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে শুধু মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এ সময় শিশুকে মায়ের বুকের দুধ ছাড়া অন্যান্য খাবার প্রশ্নই উঠে না। কারণ, এ সময় শিশুকে সলিড খাবার দেওয়া যায় না। শিশুর শরীরে খাদ্য হজম করার এনজাইমগুলো অপরিপক্ক থাকে। এজন্য এ সময় বুকের দুধ দেওয়াই সর্বোত্তম। অনেক সময় শিশু মায়ের বুকের দুধ পায় না, তখন বাড়তি খাবার দেওয়া হয়। বাড়তি যে ইনফ্যান্ট ফর্মূলা অর্থাৎ বাইরের যে দুধগুলো খাওয়ানো হয়। সেগুলো ফিডারের মাধ্যমে খাওয়ানো হয়। অনেক সময় ফিডার পরিষ্কার করা হয় না, কিংবা বাটি চামচে দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে জীবানু শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। ফলে, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য রোগ হতে পারে। ছয় মাস পর বুকের দুধের পাশাপাশি শিশুকে বাড়তি খাওয়ার দিতে হবে। ওই সময় শিশুর শরীরের এনজাইমগুলো পরিপক্ক হয়। হজম শক্তি বৃদ্ধি পায়। এজন্য তখন বাড়তি খাওয়ার দেওয়া যায়।
যেমন হওয়া উচিত শিশুর খাবার
পুষ্টিকর খাদ্য শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। খাবারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, শর্করা থাকতে হবে। ফ্যাটি থাকতে হবে পরিমাণ মতো; এটি কমবেশি হওয়া যাবে না। খাবার এমন হতে হবে, যাতে মুখে দিলেই সে খায়। শিশুর খাবার অবশ্যই সহজপ্রাচ্য হতে হবে।
খাবার হিসেবে খিচুড়ি
শিশুকে ঘরের তৈরি খাবার দিতে হবে। যেমন: খিচুড়ি। এটি এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেনো শিশুর উপকারে আসে এবং সে এটি খায়। খিচুড়ির মধ্যে চাল, ডাল, তেল এবং লবণ ও মসলা পরিমাণ মতো দিতে হবে। দুই মুঠো চাল দিলে এক মুঠো ডাল দিতে হবে। অর্থাৎ ২: ১ অনুপাতে চাল-ডাল মেশাতে হবে। প্রচুর পরিমাণে সবজি দেওয়া যাবে না। যে কোনো একটা সবজি কম পরিমাণে দিতে হবে। এবং যে সবজিটা সহজপ্রাচ্য যেমন: মিষ্টি কুমড়া, পেপে, লাউ—এ জাতীয় সবজি দিতে হবে। তেলের পরিমাণ হবে এক টেবল চামচ। যেসব মসলা স্বাদ ঠিক রাখে সেগুলো দিতে হবে। খিচুড়ি তৈরি করার পর খেয়ে দেখতে হবে এটি সুস্বাদু কিনা? খাবার উপযুক্ত হয়েছে কিনা? খিচুড়িটা হবে এমন যে, একদম শক্ত নয় আবার একদম নরমও নয়। খিচুড়ি কখনো ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করা যাবে না। কারণ, ব্লেন্ড করলে খাবারের যে ফাইবারগুলো আছে সেগুলো ভেঙে যাবে। ফলে শিশুর বিভিন্ন সমস্যা হতে পারে। এ ফাইবারগুলো শিশুর মল তৈরিতে সাহায্য করে। ঠিক মতো পম্পটুলস তৈরিতে সাহায্য করে। খিচুড়ি ব্লেন্ড করলে শিশুর এ উপকারটা হবে না। ব্লেন্ড করলে আরেকটা অসুবিধে হলো, শিশু খাবার চিবাতে শিখবে না। এখন আপনারা বলতে পারেন, শিশুর দাঁত নেই কিভাবে চিপাবে? সেক্ষেত্রে দাঁতের মাড়ি দিয়ে চিবাবে, এতে মাড়ি গঠন এবং দাঁত গজাতে সহায়ক হবে।
খাওয়ানোর পরিমাণ
খিচুড়িটা দিতে হবে বুকের দুধের পাশাপাশি। প্রথমে শিশু বুকের দুধ খাবে, এরপর যতটুকু খালি থাকে সে পরিমাণে খিচুড়ি খাওয়াতে হবে। প্রথমেই ভাবা যাবে না যে, এতটুকুই খাওয়াবো। অনেক সময় শিশুকে জোর করে খাওয়ানো হয়। কিন্তু এ সময় জোর করা যাবে না। যতটুকু ইচ্ছে করে খায় ততটুকু দিতে হবে। মায়েরা আরেকটি ভুল করে থাকে, চামচ দিয়ে খাওয়ায় এবং সাথে সাথে এক চামচ করে পানি দিতে থাকে। শিশুদের পাকস্থলি খুব ছোট। শক্ত খাবার এবং সাথে বারবার পানি দিতে থাকলে তার পেট ভরে যাবে, তাহলে শিশু আর খাবার নিতে পারবে না। শিশুকে পুরো খাওয়ার দেওয়ার দশ থেকে পনের মিনিট পর পানি খাওয়ানো উচিত।
কতবার খাওয়াবো
ছয় থেকে নয় মাস বয়সে দৈনিক তিনবার সলিড খাওয়ার দিতে হবে। নয় থেকে বারো মাস বয়সে চার থেকে পাঁচবার খাওয়াতে হবে। খিচুড়ির সাথে অন্যান্য খাওয়ার বিকল্প হিসেবে দিতে হবে। অনেক সময় একটা খাবারে শিশুরা বিরক্ত হতে পারে। খিচুড়ির পাশাপাশি শিশুকে সুজি দেওয়া যেতে পারে। হালুয়া এবং শিশুকে ফল খাওয়ানো যেতে পারে। ধীরে ধীরে খাদ্য তালিকায় ডিম যুক্ত করতে হবে।
এএইচ