মানব দেহে যেভাবে কাজ করে টিকা
কোনো সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু দেহে প্রবেশ করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তাকে অ্যান্টিজেন বা বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে। এই অ্যান্টিজেনকে ধ্বংস করার জন্য দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম অ্যান্টিবডি তৈরি করা শুরু করে, যা জীবাণুকে ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
টিকা এই প্রক্রিয়াতেই কাজ করে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট রোগের টিকা গ্রহণের পর শরীর সেই রোগের বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করে। যেমন করোনা আক্রান্ত রোগীকে যদি টিকা দেওয়া হয়, তাহলে শরীরে করোনার বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি হয়। এই অ্যান্টিবডি তখন ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে।
টিকা দেওয়ার ফলে যেহেতু আগে থেকেই দেহে এন্টিবডি তৈরি হয়ে থাকে, তাই পরবর্তীতে জীবানু শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে না। এভাবে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ, এমনকি রোগ নির্মূলেও ভূমিকা রাখে টিকা।
তবে মাত্র দুটি রোগকে নির্মূল করা গেলেও কয়েক ডজন রোগ দূরীকরণ ও নিয়ন্ত্রণে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে এই প্রতিষেধক।
টিকা কাজ করে যেভাবে
টিকা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্নের অন্ত নাই। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানব দেহে কিভাবে কাজ করে টিকা? বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, রোগ প্রতিষেধক টিকা বা ইনজেকশনের মাধ্যমে রোগের দুর্বল অক্ষতিকর কিংবা মৃত জীবানু রোগীর দেহে ঢোকানো হয়। রোগের বিরুদ্ধে লড়তে শ্বেতকনিকা অ্যান্টিবডি তৈরি করে। পরে রোগীর দেহে রোগজীবানু ঢুকলে অ্যান্টিডবি তাকে মেরে ফেলে। আর এভাবেই সাফল্যের মুখ দেখে একেকটি টিকা।
বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন রোগের জন্য বিভিন্ন ধরনের টিকা তৈরি করেছেন। শেয়ার আমেরিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু রোগ যেমন: হাম, জল বসন্ত ও ইয়োলো ফিভার—ইত্যাদির জন্য তারা এসব রোগের জীবাণু বা প্যাথোজেন তথা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা অন্যান্য সংক্রামক জীবাণুর মধ্যে থেকে কোনো দুর্বল বা অক্ষতিকর জীবাণু ব্যবহার করেন।
অন্যান্য টিকা যেমন: ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধের ইঞ্জেকশন তৈরি করা হয় মৃত অর্থাৎ নিষ্ক্রিয় জীবাণু দিয়ে।
এই পথ অনুসরণ করে বিগত কয়েক দশকে পোলিও টিকা তৈরিতে দুর্বল বা অক্ষতিকর জীবাণু ব্যবহার থেকে সরে এসে নিষ্ক্রিয় জীবাণু ব্যবহারের প্রচলন ঘটেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের বায়োমেডিকেল গবেষণা সংস্থা ওয়াল্টার রিড আর্মি ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ জানিয়েছে, টিকা মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষিত করার মাধ্যমে কাজ করে। এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমন কিছুর সংস্পর্শে এনে দেয়, যা দেখতে যে জীবাণু বা প্যাথোজেনকে আমরা প্রতিরোধ করতে চাই—ঠিক সে রকম। সেই বিশেষ জীবাণু বা প্যাথোজেনকে লক্ষ্য করে শরীর এক ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে এবং তার বিরুদ্ধে লড়ার জন্য তৈরি করে সুনির্দিষ্ট এন্টিবডি। পরে মানুষ যখন আসল রোগ-জীবাণুর সংস্পর্শে আসে, তখন তার শরীরের স্মৃতি জেগে ওঠে এবং সেই জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়ার জন্যে আগে থেকেই সতর্ক থাকে।
তবে টিকা যেভাবে ও যত শক্তি নিয়েই কাজ করুক, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা হলো: 'ভ্যাকসিনস ডোন্ট সেভ লাইভস। ভ্যাকসিনেশনস সেভ লাইভস'। অর্থাৎ টিকা জীবন বাঁচায় না, টিকাকরণ জীবন বাঁচায়।
টিকায় যেসব রোগ নির্মূল হয়েছে
কোনো সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষায় টিকার গুরুত্ব অপরিসীম। বিগত দুই শতাব্দীতে দুই ডজনেরও বেশি রোগের টিকা আবিষ্কৃত হয়। তবে এর মাধ্যমে পৃথিবী থেকে মাত্র দুটি রোগ নির্মূল হয়েছে।
এর একটি হলো গুটি বসন্ত, অন্যটি রাইন্ডারপেস্ট নামে একটি ব্যাধি, যা মূলত গবাদিপশুর হতো।
প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, রোগ নির্মূল করা না গেলে টিকার স্বার্থকতা কোথায়?
প্রতিষেধক টিকার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ করাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে টিকায় রোগ নির্মূল, এরপর দূরীকরণ এবং পরে নিয়ন্ত্রণ।
নির্মূল
অন্তত এক দশক সময়ের মধ্যে বিশ্বের কোন অঞ্চলেই একটি রোগের অস্তিত্ব দেখা না গেলে, অর্থাৎ কেউ আক্রান্ত না হলে—সাধারণত তখন ওই রোগটি নির্মূল হয়েছে বলে ঘোষণা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সে হিসাবে পোলিও রোগ প্রায় নির্মূল হওয়ার পথে।
দূরীকরণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ছয়টি মহাদেশীয় অঞ্চলের মধ্যে অন্তত চারটিতে কোন রোগে এক দশকে কেউ আক্রান্ত না হলে ধরে নেওয়া হয়, রোগটি দূর হয়েছে।
যেমন: হাম। পৃথিবীর বেশির ভাগ অংশে এখন আর মানুষ হামে আক্রান্ত হয় না। দূরীকরণের এ তালিকায় রয়েছে ডিপথেরিয়াসহ বেশ কয়েকটি রোগ।
নিয়ন্ত্রণ
এর অর্থ হচ্ছে আক্রান্ত হওয়ার পর প্রতিষেধক বা টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো রোগকে প্রতিরোধ করা। এর মধ্যে রয়েছে টাইফয়েড ও ম্যালেরিয়ার মত বেশ কয়েকটি রোগ।
টিকার সাফল্য
এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত টিকায় সব রোগ নির্মূল করা না গেলেও এর ব্যবহারের ফলে গত এক শতাব্দীতে প্রাণহানির সংখ্যা অনেক কমেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষেধক টিকার মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর অন্তত ৬০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, শুধুমাত্র হামের টিকার কল্যাণেই প্রতি বছর রক্ষা পাচ্ছে ২৬ লাখ প্রাণ।
উনিশশো ষাটের দশকে হামের টিকা ব্যবহার শুরুর পর ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৮০ শতাংশ কমে আসে।
কয়েক দশক আগেও লক্ষ লক্ষ মানুষ পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গুত্ব কিংবা মৃত্যুবরণ করতেন। এখন পোলিও প্রায় নির্মূল হয়েছে।
টিকা নিয়ে সন্দেহ
গত ১০০ বছরে রোগ প্রতিষেধক টিকার কারণে কোটি কোটি মানুষের জীবন সুরক্ষা পেয়েছে। কিন্তু টিকা আবিষ্কারের সময় থেকেই চিকিৎসার নতুন এই পদ্ধতি নিয়ে জনমনে ছিল বিস্তর সন্দেহ। এ রকম আস্থাহীনতাসহ নানা কারণে কলেরার জীবাণুর সঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন তাঁর শরীরে গ্রহণ করেন বিজ্ঞানী ওয়াল্ডিমার হাফকিন।
অনেক দেশেই টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা ছিল, আর এই প্রবণতা এখনও বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই প্রবণতা সম্পর্কে এতটাই উদ্বিগ্ন যে, তারা একে ২০১৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্যের জন্য ১০টি চরম হুমকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
আগে মানুষ ধর্মীয় কারণে টিকার ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন। তারা মনে করতেন টিকার মাধ্যমে দেহ অপবিত্র হয়। এটা মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার খর্ব করে বলেও মনে করতেন কেউ কেউ।
সাম্প্রতিক সময়ে টিকাবিরোধী ব্যক্তিত্বদের একজন অ্যান্ড্রু জারেমি ওয়েকফিল্ড। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এক রিপোর্টে তিনি এক ভুল তথ্য উপস্থাপন করেন, যাতে ওয়েকফিল্ড দাবি করেন—এমএমআর ভ্যাকসিনের সাথে অটিজম এবং পেটের অসুখের যোগাযোগ রয়েছে।
এমএমআর হচ্ছে একের ভেতর তিন টিকা। এটা শিশুদের ওপর ব্যবহার করা হয় হাম, মাম্পস এবং রুবেলা (যাকে জার্মান মিসলস বলা হয়) প্রতিরোধের জন্য। পরে ওই গবেষণা ভুয়া বলে প্রতিপন্ন হয় এবং তার চিকিৎসার সনদ কেড়ে নেওয়া হয়।
কিন্তু তার ওই দাবির পর টিকা নেওয়া শিশুর সংখ্যা কমে আসে। ২০০৪ সালে শুধুমাত্র ব্রিটেনেই এক লাখের কম শিশু টিকা নেয়। এর ফলে সে দেশে হামের প্রকোপ বেড়ে যায়।
টিকা না নেওয়ার ঝুঁকি
যদি জনসংখ্যার একটি বড় অংশ টিকা নেন, তাহলে রোগের বিস্তার প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। এর ফলে যাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারাও রোগের কবল থেকে রক্ষা পান।
জীবানুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সমন্বিত এ পদ্ধতিকে বলা হয় 'গোষ্ঠীবদ্ধ প্রতিরোধ'। এর ব্যত্যয় ঘটলে সেটা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
গোষ্ঠীবদ্ধ প্রতিরোধের জন্য কত লোককে টিকা দিতে হবে তা নির্ভর করে রোগের শক্তিমত্তার ওপর। যেমন: হামের ক্ষেত্রে জনগোষ্ঠীর ৯৫% লোককে টিকা দিতে হয়। কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম সংক্রামক ব্যাধি পোলিওর জন্য ৮০ ভাগের বেশি লোক টিকা নিলেই ওই জনপদ ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যায়।
গ্রন্থনা: আবু নাঈম মনির
-
২০ জুন, ২০২৬
-
১০ মে, ২০২৬
-
২৬ এপ্রিল, ২০২৬
-
২৪ এপ্রিল, ২০২৬