১৪ এপ্রিল, ২০২১ ০৭:০৩ পিএম
লকডাউনে মুভমেন্ট পাস

কর্মস্থলে যেতে হয়রানির শিকার চিকিৎসকরা, ব্যাহত হতে পারে স্বাস্থ্যসেবা

কর্মস্থলে যেতে হয়রানির শিকার চিকিৎসকরা, ব্যাহত হতে পারে স্বাস্থ্যসেবা
ছবি: সংগৃহীত

মো. মনির উদ্দিন: লকডাউনে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক চিকিৎসক। মুভমেন্ট পাস না থাকায় তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়েছে। এতে করোনার এ দুঃসময়ে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। তবে মুভমেন্ট পাসের আওতামুক্ত নাগরিকরা যথাযথ পরিচয় প্রদান সাপেক্ষে পুলিশের সর্বাত্মক সহযোগিতা পাবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা রোধে আজ বুধবার (১৪ এপ্রিল) থেকে দেশব্যাপী চলছে লকডাউন। এ সময়ে একান্তই বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনে নাগরিকদের জন্য মুভমেন্ট পাসের ব্যবস্থা করেছে সরকার। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও সাংবাদিকসহ জরুরি সেবায় নিয়োজিতদের মুভমেন্ট পাস লাগবে না বলে জানানো হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘সাংবাদিকদের এই পাস নিতে হবে না। এ ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ফায়ার সার্ভিস, পানি সরবরাহ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি, বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের বর্জ্য অপসরণকারী সদস্যসহ এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সদস্যরা জরুরি প্রয়োজনে বের হতে পারবেন।’

তবে মুভমেন্ট পাসের আওতামুক্ত হওয়া সত্ত্বেও লকডাউনের প্রথম দিন আজ বুধবার (১৪ এপ্রিল) সকালে কর্মস্থলে যেতে গিয়ে হেনস্থার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক চিকিৎসক। তারা বলেন, চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে আইডি কার্ড প্রদর্শনের পরও তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়— ‘আপনি যে ডাক্তার তার প্রমাণ কী?’

কর্মস্থলে যেতে গিয়ে বাঁধার সম্মুখীন হওয়া স্কয়ার হাসপাতালের কোভিড ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) কর্মরত ডা. নাজমুল ইসলাম হৃদয় মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আজকে সকাল ৮টায় আমার ডিউটি ছিল। বাসা (মুন্সীগঞ্জ) থেকে নিজের গাড়ি নিয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশে বের হই। সাইনবোর্ডের একটু পরে গাড়ি থামানো হয়। এ সময় আমার গলায় আইডি কার্ড ঝুলানো ছিল। কিন্তু তাঁরা (পুলিশ) আমার কাছে মুভমেন্ট পাস চাইলেন। আমি বললাম, এটা সবার জন্য লাগবে না। জরুরি পরিসেবায় নিয়োজিত হিসেবে চিকিৎসকরা এর আওতামুক্ত। এর পরও ৩০০০ টাকা জরিমানা করা হয়। তাদের অভিযোগ, আমি সরকারি আইন ভঙ্গ করেছি। তাঁদের ভাষ্য হলো, ব্যক্তিগত গাড়িতে কেন যাবেন, হাসপাতালের গাড়িতে যেতে হবে। উত্তরায় অবস্থানের সময় হাসপাতালের গাড়িতে যাতায়াত হতো। বর্তমানে আমার অবস্থান মুন্সীগঞ্জে। কর্তৃপক্ষ সেখানে কিভাবে হাসপাতালের গাড়ি দেবে?’

এ সময় অনেককে ছেড়ে দেওয়া হলেও তার গাড়ি আটকে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। বলেন, ‘আমার গাড়ি কেন থামিয়ে দেওয়া হলো বুঝলাম না। সকল সদস্য আমাকে যাওয়ার সুযোগ দিলেও অতিউৎসাহী একজন এ জরিমানা করেছেন।’

বিশিষ্টজন প্রতিক্রিয়া

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইউজিসি অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ মেডিভয়েসকে বলেন, পরিচয় দেওয়ার পরও তাঁর নামে মামলা দেওয়া উচিত হয়নি, যেহেতু তিনি জরুরি পরিসেবায় নিয়োজিতদের মধ্যে পড়েন। … এটা ঠিক না, এটা মহাঅন্যায়। হাসপাতালে জরুরি বিভাগ তো খোলা, সে হিসেবে চিকিৎসকরা তো অবাধে কর্মস্থলে যেতে পারার কথা। তা না হলে তাঁরা এতো রোগীর চিকিৎসা কিভাবে দেবেন? তাঁরা যে কষ্ট করে যাচ্ছেন, এটাই তো বেশি। আর যেন এমন না হয়, তা নিশ্চিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, লকডাউন একটি আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বিত একটি সিদ্ধান্ত। সেখানে সরকার যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে আমরা সেটাই অনুসরণ করবো। সরকার যদি মনে করে চিকিৎসকদের জন্য আলাদা আইডি পাস লাগবে, যা দেখালে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। তাহলে তাই করবো, আবার যদি সিদ্ধান্ত হয় যে—সবার জন্য মুভমেন্ট পাস থাকবে, তাহলে সেটাই হবে। চিকিৎসকরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিবেন। কোনো চিকিৎসককে জরিমানা করা হলে তিনি ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। যিনি জরিমানা করেছেন, তার কাছে হয় তো তথ্য ছিল না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেই হয় তো সমাধান হয়ে যাবে।

জরুরি পরিসেবায় নিয়োজিত থাকার কারণে চিকিৎসকরা লকডাউনের মুভমেন্ট পাসের আওতাভুক্ত না। আমাদের তো কাজে যেতেই হবে। সেকারণে আইডিকার্ড দেখালে চিকিৎসকদের ছেড়ে দিতে হবে। তার ব্যত্যয় হলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে যে সে আইন মানছেন না।

এ বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম একাধিকবার চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি। অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. মো. ফরিদ হোসেন মিঞাও ফোন ধরেননি। 

পেশাজীবী নেতাদের বক্তব্য 

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের  (বিডিএফ) প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাশ মেডিভয়েসকে বলেন, বিডিএফ থেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা বলেছেন, চিকিৎসকদের কোনো মুভমেন্ট পাস লাগবে না। তারা নিজেদের আইডি কার্ড দেখিয়েই যেতে পারবেন। অতিউৎসাহী পুলিশ সদস্যরা এই কাজগুলো করছেন। এতে চিকিৎসকরা তাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা করবেন। এতে স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত হওয়ার বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস এন্ড রেস্পন্সিবিলিটিজের (এফডিএসআর) মহাসচিব ডা. শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘নির্দেশনায় বলা আছে, চিকিৎকরা মুভমেন্ট পাসের আওতামুক্ত থাকবেন। তার পরও অতিউৎসাহী কিছু পুলিশ কর্মকর্তা এ কাজটি করেছেন। আমরা এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা আশা করবো, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, এ ব্যাপারে দ্রুতই ব্যবস্থা নেবেন। পুলিশের নির্দেশনা উপেক্ষা করে যারা এ রকম হয়রানি করছে, আমরা তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

পুলিশের বক্তব্য

জানতে চাইলে পুলিশের ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যানিং) মো. হায়দার আলী খান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমার কাছে এখনো পর্যন্ত কেউ কিছু বলেনি। চিকিৎসকরা এর অন্তর্ভুক্ত না হলেও তিনি কোন কাজে যাচ্ছেন তা দেখতে হবে। তিনি কি ডিউটিতে যাচ্ছেন নাকি অন্য কোনো কাজে? এমনকি তিনি করোনা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসার সঙ্গে জড়িত নাকি অন্য কিছু। এ পেশার মধ্যে তো জরুরি এবং স্বাভাবিক চিকিৎসার কিছু বিষয় আছে। একজন মেডিসিনের প্রাকটিশনার, তিনিও হাসপাতালে যান। তার ডিউটি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিংবা রোস্টার করে দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের একটি প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার কথা, যেখানে উল্লেখ থাকবে—এই রোস্টারে ডিউটির জন্য আমার এই চিকিৎসক হাসপাতালে আসবেন। তিনি এই গাড়ি ব্যবহার করবেন। আমরা সবাইকে এভাবে অনুরোধ করেছি, কর্তৃপক্ষ যেন বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করে দেয়। আমরা চাই, চিকিৎসকদের দায়িত্বের সময়ের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ একটি প্রত্যয়নপত্র প্রদান করুক। দেখুন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যাংক খোলা হয়েছে। তাই বলে তাদের শতভাগ কর্মী মুভমেন্টের অনুমোদন পাবেন না।’ 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : মুভমেন্ট পাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক