০৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ১০:০৬ পিএম

জাতীয় ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচি প্রণয়নের আহ্বান

জাতীয় ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচি প্রণয়নের আহ্বান
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ আপাতঃসুস্থ ব্যক্তিকে ক্যান্সারের কিছু সহজ পরীক্ষার আওতায় নিয়ে আসা এবং এর মাধ্যমে গোপন থাকা ক্যান্সার রোগীদের খুঁজে বের করা—ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ লক্ষ্যে জাতীয় ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচি প্রণয়নের আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, বিএসএমএমইউ পরিচালিত মূলতঃ জরায়ুমুখের ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং কার্যক্রমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখা সহায়তা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে চারশ’র মতো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভায়া সেন্টার চালু হয়েছে, যা একটি বড় অগ্রগতি। তবে এর কার্যক্রম হাসপাতালভিত্তিক হওয়ায় বিগত ১৫ বছরে লক্ষ্যমাত্রার দশ ভাগের বেশি অর্জিত হয়নি। তাই এই কর্মসূচিকে ঢেলে সাজাতে হবে।

বিশ্ব ক্যান্সার দিবস উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার (৪ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে কমিউনিটি অনকোলজি সেন্টার ট্রাস্ট ও সিরাক-বাংলাদেশের আয়োজনে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তারা।  

সিরাক-বাংলাদেশ এর প্রধান এস এম সৈকতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ক্যান্সার রোগতত্ত্ববিদ ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ন জয়ন্তীর বছরে দেশের ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের অবহেলিত ও অসম্পূর্ণ কাজগুলো গতি পাক—এমন একটি অসাধারণ বিষয়কে আলোচনার জন্য বেছে নেওয়ার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। 

তিনি আরও বলেন, দেশে ক্যান্সার চিকিৎসা সুবিধায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। ক্যান্সার ইনস্টিটিউট স্থাপিত হয়েছে। ৫০ শয্যা থেকে ৩০০ বেডে উন্নীত হয়েছে। ৫০০ বেডে সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু রেডিওথেরাপি বিভাগ দিয়ে শুরু হলেও আধুনিক বিশ্বের মতো সার্জারি, কেমোথেরাপি, গাইনি ও শিশু ক্যান্সার বিভাগসহ অনেক বিভাগ সংযোজিত হয়েছে। প্রতিরোধ ও গবেষণার জন্য ক্যান্সার ইপিডেমিওলোজি বা রোগতত্ব বিভাগ হয়েছে। ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য আলাদা বিভাগ হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি বেশ কিছু হাসপাতাল উন্নতমানের ক্যান্সার চিকিৎসা সুবিধা চালু করেছে। তবে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা থাকায় বিপুল সংখ্যক ক্যান্সার রোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

সভায় জানানো হয়, বেসরকারি হাসপাতাল সেবার উচ্চমূল্যের জন্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। একমাত্র সরকারি সমন্বিত বিশেষায়িত ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে দীর্ঘ অপেক্ষমান তালিকা দূর-দূরান্তের মানুষের চিকিৎসা সেবা পাওয়ার আরেকটা অন্তরায়। তাই চিকিৎসা সুবিধা মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। 

শুধু চিকিৎসা দিয়ে ক্যান্সার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের চারটি উপাদান: 

১. প্রাথমিক প্রতিরোধ, 
২. প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয়, 
৩. নির্ণয় ও চিকিৎসা, 
৪. প্রশমন সেবা বা পেলিয়েটিভ কেয়ার।

দুঃখজনক হলেও সত্য, চিকিৎসার পাশাপাশি অন্য উপাদানগুলো সমান তালে বেড়ে উঠতে পারেনি।  শুধু  চিকিৎসা নয়, ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণের সবগুলি উপাদান মিলেই ক্যান্সার সেবা—এই ধারণাটি সর্বক্ষেত্রে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি।

প্রাথমিক প্রতিরোধের জন্য জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন ও টিকাদানে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি প্রয়োজন। এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী ও পেশাজীবি সংগঠনগুলো একযোগে কাজ করা জরুরি। ইপিআই কর্মসূচি ও খাবার স্যালাইন জনপ্রিয় করার অভিজ্ঞতা তো আমাদের আছে। আলাদা কার্যক্রম থাকলেও ক্যান্সার প্রতিরোধে সেই রকম সমন্বিত উদ্যোগ নেই।

সভায় জানানো হয়, লক্ষণ দেখা দিলেই যাতে সবাই হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, তার জন্য ক্যান্সারের সতর্ক সংকেতগুলো জনসাধারণকে জানানোর ব্যবস্থা করতে হবে। স্ক্রিনিং অর্থাৎ লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ আপাতঃসুস্থ ব্যক্তিকে ক্যান্সারের কিছু সহজ পরীক্ষার আওতায় নিয়ে আসা ও এর মাধ্যমে গোপন থাকা ক্যান্সার রোগীদের খুঁজে বের করা, ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশে ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের কোন জাতীয় কর্মসূচি নেই। বিএসএমএমইউ পরিচালিত মূলতঃ জরায়ুমুখের ক্যান্সার ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং কার্যক্রমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখা এই কার্যক্রমে সহায়তা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে চারশ’র মতো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভায়া সেন্টার চালু হয়েছে, যা একটি বড় অগ্রগতি। কিন্তু এর কার্যক্রম সমাজভিত্তিক ও সংগঠিত না হয়ে কেবলমাত্র হাসপাতালভিত্তিক হওয়ায় বিগত ১৫ বছরে লক্ষ্যমাত্রার দশ ভাগের বেশি অর্জিত হয়নি। তাই এই কর্মসূচিকে ঢেলে সাজাতে হবে। মুখগহ্বরের ক্যান্সারকে অন্তর্ভুক্ত সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও বিভাগ এবং গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করে একটি জাতীয় ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচি প্রণয়ন জরুরি। 

বক্তারা বলেন, ক্যান্সার চিকিৎসাকে রাজধানীকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত করে দেশের স্বব অঞ্চলের মানুষের কাছাকাছি নিতে হবে। সরকার এ ক্ষেত্রে বিশাল উদ্যোগ নিয়েছে আট বিভাগে বিভাগীয় শহরের মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ১০০ শয্যার অন্তঃবিভাগ, ৫০ শয্যার দিবা-কেন্দ্র, সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি, সর্বোপরি ক্যান্সার প্রতিরোধ, গবেষণা, নির্ণয় ও চিকিৎসার ছয়টি বিশেষায়িত বিভাগ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সাহসী ও দূরদর্শী প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার বাস্তবায়ন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন তাদের নিজ ঠিকানার কাছাকাছি সরকারি এসব কেন্দ্রে ক্যান্সার চিকিৎসায় বিশেষায়িত ক্যান্সার সার্জন, কেমোথেরাপির জন্য মেডিকেল অনকোলজিস্ট, বিকিরণ চিকিৎসার জন্য রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, শিশুদের জন্য পেডিয়েট্রিক অনকোলজিস্ট, নারীরা জরায়ুসহ প্রজণনতন্ত্রের ক্যান্সারের জন্য গাইনি অনকোলজিস্টের সেবা নিতে পারবেন, যা আগে একমাত্র জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটেই পাওয়া যেত।

ক্যান্সার নিবন্ধন, প্রতিরোধ, গবেষণা ও সমাজভিত্তিক প্রতিরোধ ও স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম পরিচালনার জন্য ক্যান্সার ইপিডেমিওলোজির পূর্ণাঙ্গ বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করা সরকারের সবচেয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, যা ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন বক্তারা। 
 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক