ডা. শাহজাদা সেলিম 

ডা. শাহজাদা সেলিম 

সহযোগী অধ্যাপক,
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় 


১৪ নভেম্বর, ২০২০ ০৩:২৪ পিএম
টাইপ-২ ডায়াবেটিস

৭/৮ বছর বয়সেই আক্রান্ত হয় বাংলাদেশের মানুষ

৭/৮ বছর বয়সেই আক্রান্ত হয় বাংলাদেশের মানুষ

‘ডায়াবেটিস সেবায়, পার্থক্য আনতে পারেন নার্সরাই’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস।

ডায়াবেটিসের নানা দিকের মধ্যে কারা বেশি ঝুঁকিতে আছেন তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডায়াবেটিসের ঝুঁকিটা সর্বাগ্রে গুরুত্ব সহকারে আলোচনায় আসার দাবি রাখে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি এর ঝুঁকি মূল্যায়ন করি, তাহলে আতঙ্কিত হওয়ার মতো তথ্য শুনাতে হবে। পৃথিবীর যে কয়টি দেশের মানুষ অধিক সংখ্যায় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে।

এছাড়া টাইপ-২ ডায়াবেটিস যেটা সাধারণ একটু বেশি বয়সে হয়, অর্থাৎ ৪০ বা ৪৫ বছর বয়সের পরে, বাংলাদেশে তা খুব কম বয়সে হয়। একই চিত্র আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও। এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ৭, ৮ ও ৯ বছর বয়সে ডায়াবেটিস দেখা দেয়। এটা আমাদের জন্য বড় একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা।

কেন এই ঝুঁকি

এসব ঝুঁকির পেছনে কিছু জেনেটিক কারণ আছে। অবশ্য এসব ঝুঁকি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সকল দেশেরই কম বেশি আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, আমাদের পারিপার্শ্বিক ও ব্যক্তিগত কিছু কারণও। 

এর মধ্যে বড়গুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো: 

১. আমরা ক্রমশ শ্রমহীন জাতিতে পরিণত হচ্ছি। আমরা কেউ শারীরিক পরিশ্রম করতে চাই না। আর্থিক উন্নতি ও যান্ত্রিক সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় আমাদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আমাদের শারীরিক শ্রম দিতে হবে না। এর ফলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। 

২. ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ মারাত্মক রকম খাদ্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। যেমন: এক সময় আমরা পর্যাপ্ত খাবারের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগেছি। না খেয়ে থেকে যেমন অপুষ্টিতে ভুগেছি, তেমনিভাবে এখন বেশি খেয়েও অপুষ্টিতে ভুগছি। কারণ যার যতটুকু খাওয়া উচিত ততটুকু খাওয়া হচ্ছে না। মোটা দাগের উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। যেমন: বিশ্বে যতগুলো গবেষণা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ দিনের ৭০-৮০ শতাংশ খাবার গ্রহণ করছে শর্করা জাতীয়। আর শর্করাই তো গ্লোকোজ, এটাই কিন্তু রক্তে গিয়ে বেড়ে যাচ্ছে।

এছাড়া বিবিসিতে গত বছরের মাঝামাঝিতে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি গবেষণায়ে দেখা গেছে, সারা পৃথিবীতে কম প্রোটিন গ্রহণ করা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এক নম্বরে রয়েছে। অন্যদিকে শাক-সবজি ও ফলমূল খাওয়ার প্রবণতাও আমাদের মধ্যে কম। আরও মারাত্মক বিষয় হলো, আলুকে আমরা শাক-সবজি ভাবছি। অথচ এতে ভাত-রুটির চেয়েও শর্করা বেশি। 

সুতরাং সামগ্রিক দিক বিবেচনায় নিয়ে ডায়াবেসির ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণ চাইলে শারীরিক শ্রম বাড়াতে হবে। বয়স ও সেক্স অনুসারে রুটিন মাফিক কায়িক শ্রম করতে হবে। একই সঙ্গে সবার ক্যালরি ও পুষ্টি চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করে শর্করা, আমিষ ও শাক-সবজি খেতে হবে। 

সহজ কথা হলো, যাদের এখনো ডায়াবেটিস হয়নি, তারা কিন্তু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন না। অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনে সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন না। জেনে রাখুন, আপনিও ডায়াবেটিসের তীব্র ঝুঁকির মধ্যেই আছেন। শুধুমাত্র বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করার কারণেই জেনেটিক একটি ত্রুটি আপনার মধ্যে রয়ে গেছে। এছাড়াও বংশীয় ও পারিপার্শ্বিক হাজার রকম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছি আমরা। 

অতএব এ অবস্থা থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নাই। মনে রাখতে হবে, যার ডায়াবেটিস হয়নি, তিনি যদি কিছু পদক্ষেপ নিয়ে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেন, তাহলে এর চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না। কারণ ডায়াবেটিস হয়ে যাওয়া মানে তিনি আজীবনের জন্য ডায়াবেটিসের রোগী। তখন তাকে শুধু দিন গুণতে হবে, ‘কখন তার কিডনি নষ্ট হয়, কখন চোখ নষ্ট হয়, কখন হার্ট অ্যাটাক হয়, কখন স্ট্রোক হয় ইতাদি। তিনি কখনো নন-ডায়াবেটিস হবেন না। তাই আক্রান্ত হওয়ার আগেই আমাদের সতর্ক হতে হবে।

এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত