এস.এ. সাজিন হক

এস.এ. সাজিন হক

শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ।


৩০ অগাস্ট, ২০২০ ০৮:২৬ পিএম

ডা. ইসমাত জাহান লিমা: একজন করোনাজয়ী সম্মুখযোদ্ধা

ডা. ইসমাত জাহান লিমা: একজন করোনাজয়ী সম্মুখযোদ্ধা

সূর্যের প্রভা যেমন সকালকে আলোকিত করে বলে আমি শুধু প্রভাতের জন্য নয়, দিনান্তেও থাকতে চাই মানুষের মাঝে, ঠিক তেমনি একজন আলোকিত মানুষ হলেন ডা. ইসমাত জাহান লিমা।করোনাকালীন সময়ের একজন সম্মুখযোদ্ধা।

করোনাভাইরাসের প্রকোপে গোটা দেশ যখন থমকে গিয়েছে তখন মানুষের সেবা দিতে এগিয়ে এসেছেন একদল সাহসী যোদ্ধা। গৃহবন্দী সাধারণ জনজীবন যখন নিরাপত্তার আড়ালে, তখন নিরাপত্তা বেষ্টনী হতে বেরিয়ে স্টেথোস্কোপ হাতে সম্মুখযুদ্ধ হতে পিছু হটেননি তাঁরা।

এমনি একজন সম্মুখযোদ্ধা হলেন ডা. ইসমাত জাহান লিমা। তিনি ১৯৮১ সনে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব হতে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এবং মাদার তেরেসার মতো মহান ব্যাক্তিদের জীবনাদর্শকে একান্তই আপন করে নিয়েছিলেন তিনি। একারণেই মানবসেবার অদম্য বাসনাকেই অন্তরে ধারণ করে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। মানবদরদী, হিতাকাঙ্ক্ষী ডা. ইসমাত জাহান লিমা শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন কিছু স্বেচ্ছাসেবামূলক অঙ্গসংস্থার সাথে। মানবসেবার মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে উপলব্ধি করেছিলেন চিকিৎসাসেবার মাধ্যমেই তিনি সরাসরি মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারেন। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ১৯৯৬ সনে অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৯৮ সনে হলিক্রস কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

শৈশব থেকেই লালিত স্বপ্ন পূরণের উদ্দেশ্যেই ১৯৯৮ সনে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে ফুল ফ্রি স্টুডেন্টশিপে ভর্তি হন ডা. ইসমাত জাহান লিমা। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে তিনি স্বপ্ন পূরণের দিকে অগ্রসর হন আরও একটি ধাপ। সেখানে অধ্যয়নকালে তিনি উপলব্ধি করেন মানবসেবার এই পরমব্রতকে সফলতা দানের জন্য তাঁর একটি সেবামূলক সংগঠনের অতি প্রয়োজন। কৈশোর থেকেই তিনি সন্ধানীর কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং তিনি বুঝতে পারেন তাঁর সেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাবার জন্য সন্ধানীই সর্বোত্তম। তবে এখানে তিনি কিছু প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে ছিলো না কোনো সন্ধানী ইউনিট। তাই তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে একটি কার্যকর সন্ধানী ইউনিট প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন সন্ধানী বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ইউনিটের আহ্বায়ক। ১৯৯৯ সনে সন্ধানী বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৎকালীন সময়ে রক্তদান কর্মসূচি এবং ভ্যাক্সিনেশন ক্যাম্পের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি সন্ধানী বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ইউনিটের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা পদক গ্রহণ করেন। তিনি গোটা মেডিকেল কলেজ শিক্ষাজীবনে ছিলেন একজন আদর্শ সন্ধানীয়ান । এখনো তিনি হাজারো ব্যস্ততার মধ্যে সন্ধানী বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ইউনিটের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছেন। 

এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণভাবেই মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করেন এই কৃতি সন্তান। যেহেতু তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশে কোনো মহিলা কলোরেক্টাল সার্জন ছিলেন না সেহেতু তিনি বাংলাদেশের সর্বপ্রথম মহিলা কলোরেক্টাল সার্জন হবার তীব্র ইচ্ছা পোষণ করেন এবং উক্ত বিষয়ে এমএস ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম মহিলা কলোরেক্টাল সার্জন । এছাড়াও, তিনি এফসিপিএসে গোল্ড মেডেল অর্জন করেন।

করোনাকালীন সময়ে একজন সম্মুখযোদ্ধা চিকিৎসক হিসেবে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে দায়িত্ব পালন করেন। কর্তব্যরত অবস্থায় তাঁর চারপাশের মৃত্যুর মিছিল তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। কর্তব্যকালে কিছু রোগীর জরুরি অবস্থায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তাঁদের চিকিৎসাসেবা দিতে একবারও পিছুপা হননি। মৃত্যুভয় তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এভাবে নিরলস চিকিৎসাসেবা দেওয়াকালীন জনসাধারণের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে আকস্মিকভাবে ২০ জুন আক্রান্ত হন করোনাভাইরাসে। করোনার ভয়ানক থাবা ছাড় দেয়নি এই অকুতোভয় সৈনিককে। একজন আহত যোদ্ধা যেমন বীরদর্পে এগিয়ে যান যেকোনো মূল্যে স্বজাতিকে উদ্ধারের লক্ষ্যে, ঠিক তেমনি তিনিও দমে যাননি কখোনো । করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর স্বশরীরে কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত থাকতে না পারলেও টেলিমেডিসিন সেবা চালিয়ে গিয়েছেন ডা. ইসমাত জাহান লিমা।

দীর্ঘ একমাস করোনায় আক্রান্ত থাকার পর তিনি সুস্থতা লাভ করেন। স্বামী-সন্তান আক্রান্ত হবার পর তাঁর বৃদ্ধ শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকায় পরিবারের পক্ষ থেকে পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতে প্রথমে সম্মতি পাননি তিনি। মানবসেবার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে সকল বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে নিজের ও পরিবারবর্গের স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও গত ২৮ জুলাই পুনরায় কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসেন।

‘জগতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তাহার করিয়াছেন নারী অর্ধেক তাহার নর’, ডা. ইসমাত জাহান লিমা যেন উক্ত চরণেরই মূর্ত প্রতীক। এখনও কিছু শারীরিক দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি রয়ে গিয়েছেন চিকিৎসাসেবায় অনড়। ডা. ইসমাত জাহান লিমার মতো অকুতোভয় সৈনিকরা কাজ করে চলেছেন বলেই আমরা এখনো আশায় বুক বাঁধি যে আমাদের এই পৃথিবী আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠবে। ‘বেঁচে থাকুন এসকল সম্মুখযোদ্ধারা, বেঁচে থাক মানবতা।’

মেডিভয়েস এর জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্ট গুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা

অতিরিক্ত বেতন নিচ্ছে একাধিক বেসরকারি মেডিকেল

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
স্বাধীনতা পদক ২০১৭ প্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী
বাংলাদেশের গাইনী এবং অবসের জীবন্ত কিংবদন্তী

স্বাধীনতা পদক ২০১৭ প্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. টি এ চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী