২৮ জুন, ২০২০ ০৪:৫৬ পিএম
করোনা সংক্রমণ

চিকিৎসক মৃত্যু হারে যে কারণে শীর্ষে বাংলাদেশ 

চিকিৎসক মৃত্যু হারে যে কারণে শীর্ষে বাংলাদেশ 

মো. মনির উদ্দিন: প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মৃত্যুহারে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। সারা বিশ্বে যেখানে চিকিৎসক মৃত্যুর গড় হার শতকরা ২.৫ ভাগ, সেখানে বাংলাদেশে তা ৪ ভাগ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, চিকিৎসকরা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই করোনা রোগীদের সংস্পর্শে আসছেন। নিম্নমানের পিপিই, মাস্ক ইত্যাদি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।  

তাদের মতে, দেশের অধিকাংশ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনা রোগী দেখা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাপারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। যে অল্প সংখ্যক চিকিৎসক ও নার্সকে অনলাইনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তা দেশের মোট করোনা রোগী ও জনসংখ্যার তুলনায় অপর্যাপ্ত।

এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘করোনায় যে কেউই আক্রান্ত হতে পারেন। এ ভাইরাস ধনী-গরিব, ডাক্তার-নার্স, চাকর-মনিব, রাজা-প্রজা, রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী কাউকেই আলাদাভাবে দেখে না। সুতরাং ডাক্তাররা আক্রান্ত ও মারা যাওয়া অভাবনীয় নয়। ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা হিসেবে ডাক্তারদেরকে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। তাদেরকেই সরাসরি রোগীর কাছে আসতে হয়, কথা বলতে হয়, গায়ে হাত দিতে হয়। এক কথায় রোগীদের খুব বেশি সংস্পর্শে তাদের যেতে হয়। আর করোনা রোগটা ছোঁয়াচে। কথা-বার্তার সময় হয় তো তার সামনে হাঁচি-কাশি দিলো, এতে ডাক্তার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে যেসব চিকিৎসককে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) কাজ করতে হয়, তাদের ঝুঁকি তো আরও বেশি। শুরুতে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর (পিপিই) অপ্রতুলতা নিয়ে কথা উঠেছে। পরে পিপিই যখন দেওয়া হলো, তখন এর গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন ছিল। মাস্ক নিয়ে কথা উঠলো, গায়ে লেখা এন-৯৫ অথচ ভেতরে সাধারণ মাস্ক। সুতরাং তাদের সুরক্ষা নিরাপত্তাও অতটা সুনিশ্চিত করা হয়নি। এগুলো কারণ হতে পারে।’

চিকিৎসকদের নিজেদের ব্যাপারে যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ

অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, সারাক্ষণ রোগীর সুরক্ষার কথা চিন্তা করতে গিয়ে চিকিৎসকদের কেউ কেউ নিজেদের ব্যাপারে উদাসী হয়ে যান। অন্যের জন্য সময় আছে, নিজের বেলায় তাদের সময় নাই। অন্যের তরে নিজেকে উজার করে দেয়, কিন্তু নিজের ব্যাপারে কমই যত্নবান থাকেন। এটাও একটি কারণ।  

তবে জ্যেষ্ঠ যেসব চিকিৎসক মারা গেছেন তাদের মধ্যে অনেকেই নন-কমিউনিকেবল রোগে আক্রান্ত ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, করোনায় তাদের ঝুঁকি তো বেশি।  

সমাধানের উপায় জানতে চাইলে এ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলেন, চিকিৎসকদের নিজেদের ব্যাপারে যত্মশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে তারাও কিন্তু মানুষ। তার জীবন ও সুরক্ষার ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। 

এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের দায়িত্ব হলো, সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসকসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে। এটি যেন প্রশ্নাতীত থাকে। এটা সবচেয়ে জরুরি। অস্ত্র ছাড়া তো তারা যুদ্ধ করতে পারবে না, তাদের অস্ত্র হলো সুরক্ষা ও নিরাপত্তা। 

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা তো খুব সৎ মানুষ? আমাদের পিপিই সরবরাহ থেকে শুরু করে সব কিছুই মানহীন। এজন্য অধিক হারে চিকিৎসক মারা যাচ্ছেন, …কি করা যাবে? মাস্ক, গ্লাভস যদি ঠিক না থাকে, তাহলে মানুষ মারা যাবেই। যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাঠিয়ে দিলাম, অথচ সুরক্ষিত করার সামগ্রী নাই। এ অবস্থায় চিকিৎসক তো মারা যাবেই।’ 

এ ব্যাপারে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘রোগীদের করোনার উপসর্গ গোপন করে চিকিৎসা গ্রহণ এবং তাদের অসচেতনতা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অধিক সংক্রমণ ও মৃত্যু হারের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিপিইগুলো যথাযথ পদ্ধতিতে পরিধান না করার কারণেও চিকিৎসকরা সংক্রমিত হচ্ছেন, মারা যাচ্ছেন।’ 

করোনায় দেশের চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক চাপ কমানোর কৌশল নির্ধারণে গবেষণায় যুক্ত বাংলাদেশি তরুণ গবেষক স্টেইট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কের জাফর আহমেদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বাংলাদেশের ডাক্তার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের পরচালিত গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ২০ ভাগ ডাক্তার আগে থেকেই বড় কোন রোগে আক্রান্ত। এর ফলে করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের মৃত্যুঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি। ডাক্তারদের মৃত্যুহার কমিয়ে আনার স্বার্থে এই ২০ ভাগ ডাক্তারকে শুধুমাত্র নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত করা যেতে পারে। এতে করে নন-কোভিড রোগীরা যেমন সেবার নিশ্চয়তা পাবে তেমনি বেঁচে যাবেন মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা অনেক ডাক্তার।’

তিনি আরও বলেন, ‘কোভিড-১৯ যুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ডাক্তারদের সঠিকভাবে ব্যবহার করা। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বেশিরভাগের জন্য শুধুমাত্র অক্সিজেনই যথেষ্ট। শুধুমাত্র অক্সিজেন সরবরাহের কাজে ডাক্তারদের দিনরাত খাটানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং তাদের গুরুত্বপূর্ণ শ্রম ও মেধাকে আইসিইউসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসার জন্য বরাদ্ধ রাখা উচিত। অক্সিজেন ব্যবস্থাপনার জন্য প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে এবং এর মাধ্যমে ডাক্তারদের উপর চাপ কমানোসহ তাদের করোনা আক্রান্তের হার তথা মৃত্যু কমানো যেতে পারে।’

জাফর আহমেদ বলেন, ‘পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো আমাদেরও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডাক্তার এবং তাদের পরিবারের করোনা পরীক্ষা এবং চিকিৎসা সুনিশ্চিত করতে হবে। ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং চাপ কমাতে গণমাধ্যমে তাদের ঠিকভাবে হাইলাইট করতে হবে, যাতে তারা সবখানে মানুষের কাছ থেকে যথাযথ সমর্থন পান। আমাদের সকল সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত তথ্যনির্ভর। ডাক্তারদের জীবন রক্ষায় নীতিনর্ধারকদের তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।’

করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম গুলো মেনে চলুন। সর্দি কাশি জ্বর হলে হাসপাতালে না গিয়ে স্বাস্থ্য সেবা দানকারী হটলাইন গুলোতে ফোন করুন। আইইডিসিআর হটলাইন- 10655, email: [email protected]
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি