০৩ জুন, ২০২০ ০৫:০০ পিএম
সরকারের সঙ্গে চুক্তি বাতিল

নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করোনার চিকিৎসায় আনোয়ার খান মেডিকেল

নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করোনার চিকিৎসায় আনোয়ার খান মেডিকেল

মো. মনির উদ্দিন: করোনাভাইরাস চিকিৎসায় সরকারের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করেছে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। গত ৩১ মে থেকে এ চুক্তি থেকে সরে আসে তারা। ফলে এখন থেকে আনোয়ার খান হাসপাতালে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হবে। 

এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এহতেশামুল হক আজ বুধবার (৩ জুন) দুপুরে মেডিভয়েসকে বলেন, ‘পাবলিক প্রাইভেট কো-অপারেশেনের ভিত্তিতে কোভিড হাসপাতাল চালু করার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়েছিল। সরকারের সহযোগিতায় গত ৩১ মে পর্যন্ত আমরা এ সেবা চালিয়েছি। এখন সক্ষমতা অনুযায়ী নিজেরা চালাতে পারবো। সরকারের সহযোগিতার দারকার নাই। নিজেরা চালাতে পারলে আরও ভালো স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারবো। রোগীদের তাৎক্ষণিক সেবা দেওয়ার জন্য অনেক কিছু প্রয়োজন হয়। এটা সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে নিশ্চিত করাটা কঠিন হয়ে যায়। যেহেতু সক্ষমতা অর্জন করেছি, সুতরাং কোভিড হাসপাতাল অবশ্যই চলবে, সরকারের সহযোগিতায় না; নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়।’

নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষাসহ সব কিছু অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে যতক্ষণ কোভিড-১৯ আছে এর সঙ্গে আমাদের মোকাবেলা চলবে। আমাদের এখান থেকে কোনো রোগী ফেরত যাবে না, কোভিডি কিংবা নন-কোভিড। তবে বেড ফাঁকা না থাকলে রোগীদের ফেরত পাঠানো ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নাই। এ অবস্থায় রোগী না নিতে পারলে স্বজনরা রাগ করে বসে। এ মুহূর্তে হাসপাতালের কোভিড সেকশনে একটি বেডও খালি নেই। এখানে আইসিইউতে ১০টি বেড আছে। এগুলো পূর্ণ থাকলে ১১ নম্বর রোগীকে কিভাবে নেবো? না নিতে পারলে রাগ করে। এটি হচ্ছে বর্তমানে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ ও সংকট।’

হাসপাতালের পরিচালক বলেন, অন্যান্য সেকশনগুলো কোভিড রোগীদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো, কোনো কোভিড রোগী যেন ফেরত না যায়। জেনে খুশি হবেন, আনোয়ার খানে এখন কোভিড রোগীদের ডায়ালাইসিসও শুরু হয়েছে। 

সরকারি সুবিধা না থাকায় এখন করোনা রোগীদের স্বাস্থ্য সেবার খরচ বেড়ে যাবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৫ ভাগ রোগীকে বিনা মূল্যে চিসিৎসা দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে আগে থেকেই নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় একটি বিল করতেই হবে। কিন্তু যে দিতে পারবে না, তাকে সর্বোচ্চ ডিসকাউন্ট দেওয়ার জন্য কর্তপক্ষের নির্দেশনা রয়েছে। 

তবে এ ক্ষেত্রে তাদের বেশ কিছু সমস্যায় পড়তে হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন সবার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হলো—করোনার চিকিৎসায় সম্পৃক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের ১০ কর্মদিবসে এক মাস গণ্য হচ্ছে। এছাড়া তাদের জন্য হোটেল পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের পরিবহনের জন্য যেসব মাইক্রোবাস ভাড়া নেওয়া হয়, করোনার কথা শুনলে মাঝপথে স্বাস্থ্যকর্মীদের রেখে ড্রাইভার চলে যায়। একইভাবে তাদের খাবারগুলো পৌঁছানোও চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রহী (পিপিই) বাবদ একজন স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য দিনে ছয় হাজার টাকা খরচ হয়। এ খরচ কে বহন করবে, জানি না। এটি হয় তো করোনা চিকিৎসায় বড় সংকট হিসেবে দেখা দেবে।’

নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কেন 

এ অবস্থায় করোনার চিকিৎসায় সরকার ঘোষিত সুযোগ-সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন কেন—জানতে চাইলে ‘বিষয়টি একদম পরিষ্কার। সরকার আমাদের একজন চিকিৎসকের বেতন ধরে এক লাখ টাকা। কিন্তু ওই আইসিইউ কনসালটেন্টকে দিতে হচ্ছে তিন লাখ টাকা। মেডিকেল অফিসারের বেতন সরকার ধরে দিয়েছে ৩৬ হাজার টাকা। আমাদের দিতে হচ্ছে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। একজন সিস্টারকে বেতন দেওয়ার কথা ১৮ হাজার টাকা, দিতে হচ্ছে ৩২ হাজার টাকা। এই সংকটগুলো, ভেতরের কথাগুলো কাউকে বলতে পারছি না। গণপরিহনের ভাড়া ৬০ ভাগ বাড়ানো হলো। এটা বহন করতে জনগণের অসুবিধা হচ্ছে। আবার মালিকরা বলছেন, না বাড়ানো হলে বাস চালানো যাবে না। এ নিয়ে এখন পরস্পরকে দোষারূ করা হচ্ছে। সুতরাং করোনা নিয়ে দোষারূপ বন্ধ করে সমন্বিতভাবে বসা উচিত।’ 

অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য  

উচ্চমূল্যের কোনো সেবা না নিয়েও কোভিড রোগীদের অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে ক্লারিক্যাল কিছু ভুল হয়েছে। এগুলো এরই মধ্যে সমাধান করে দেওয়া হয়েছে। বিয়টি হলো, কোভিড আর নন-কোভিড বিলের যে সফটওয়্যার ওটাতে তারা ওলট-পালট করে ফেলেছিল।’

যা বললেন রোগীর স্বজনরা 

এ প্রসঙ্গে রোগীর ভাই আরিফুল ইসলাম শিমুল মেডিভয়েসকে বলেন, ‘অভিযোগটা সে রকম না। এখানে অ্যাকাউন্টসের একটি ভুল ছিল। ভর্তি হওয়ার সময় বলা হয়েছিল, এটা সরকারিভাবে চিকিৎসা প্রদান করা হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রোগী ভর্তি করানো হয়। পজিটিভ থেকে নেগেটিভ আসলে ২ জুন রিলিজের জন্য যাই। একটি বিলের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এর কারণ জানতে চাইলে তারা জানান, সরকারের সঙ্গে তাদের চুক্তি শেষ হয়ে গেছে। তারা আসলে বিষয়টি জানতো না। হয় তো তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো কথা বলেনি। তাহলে এমনটি হতো না। গণমাধ্যমের কল্যাণে বিষয়টি জানাজানি হলে পরিচালক স্যার আমাকে ফোন দিয়েছেন। আমাদের কাছ থেকে নেওয়া অতিরিক্ত টাকা ফেরত পেয়েছি।’

প্রসঙ্গত, রাজধানীতে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে ১৩টি হাসপাতাল। এর মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালের তালিকায় রয়েছে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত ১৬ মে হাসপাতালটির ২০০ বেডের কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড ভবনের উদ্বোধন করেন। অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ এই হাসপাতালে ২০০টি নতুন বেড, ১০টি আইসিইউ, ১০টি এইচডিও ও পাঁচটি ভেন্টিলেটর রয়েছে। পাশাপাশি কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য রয়েছে পিসিআর মেশিনের সুবিধা। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত