অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওহাব মিনার

অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওহাব মিনার

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক


১৩ মে, ২০২০ ০১:৫৩ পিএম

করোনা ওয়ার্ডের অভিজ্ঞতা

করোনা ওয়ার্ডের অভিজ্ঞতা

অদৃশ্যে বা অজানায় মানুষের যেমন ভয়-ডর আর আতংক কাজ করে, তদ্রুপ চিন্তার ক্ষেত্রেও অনেক নাম না জানা অদ্ভুদ অলীক চিন্তার ডালপালা গজায় দৃশ্যমান বস্তুতে যা সম্ভব না ৷

সেনাবাহিনীর চাকরিতে যারা চিকিৎসক হিসেবে এএমসিতে যোগদান করেন, ব্যাসিক ট্রেইনিংয়ের পরই তাদের সেনাবাহিনী থেকে পার্বত্যাঞ্চলে পোস্টিং হয়। বিমান, নৌ ও বিজিবি (প্রাক্তন বিডিআর) তে ডেপুটেশনে যায় ৷ বিজিবি থেকেও পার্বত্যাঞ্চলে যাবার সম্ভবনা থাকে ৷

যেহেতু পার্বত্যাঞ্চল দুর্গম, ম্যালেরিয়াপ্রবন ও শান্তিবাহিনীর হঠাৎ অত্যাচারে অতি ঝুঁকিপূর্ণ তাই কিছু কিছু অফিসার তাদের চিকন বুদ্ধি দিয়ে তদবির করে পার্বত্যাঞ্চলে না গিয়ে লুকিয়ে থাকতো ৷ তাদের আচরণে মনে হতো হিল ট্রাক্টস মানেই ম্যালেরিয়া, ব্ল্যাক ওয়াটার ফিভার, কমা- ডেথ ৷

সে ভয় আমাকেও পেয়ে বসেছিল বলে রাঙামাটির মাইনীমুখ যাকে বাংলাদেশের কাশ্মীর বলে জানে মানুষ সেখানে পোস্টিং হবার পর শুভলং ক্রস করার সময় স্পিড বোটে বসে এসএমজি হাতে দুপাহাড়ের দিকে তাকিয়ে শান্তিবাহিনী খুঁজেছি আর আয়তুল কুরসী পড়েছি ৷ জানতামই না ওই পাহাড়ে আমাদের সৈনিকরা রুট প্রোটেকশনে আছে ৷ সেদিন আমি জার্নিটা শান্তি বাহিনী আতঙ্কে উপভোগ করতে না পারলেও দুবছর দশ মাসের দীর্ঘ সময় আর কখনো এমন মনলোভা দৃশ্য উপভোগে কার্পণ্য করিনি ৷

করোনা ক্রাইসিস একটা বাস্তবতা কিন্তু এই অদৃশ্য অতিসুক্ষ জীবাণুতে মানুষের মধ্যে অহেতুক ভীতি কাজ করছে, কাজ করছে আতংক ৷ এমনকি চিকিৎসকরাও যথাযথভাবে পরিস্থিতিকে বিবেচনা করতে পারছে না, মোকাবেলায়ও তদ্রুপ সমস্যা রয়ে যাচ্ছে ৷

যেসব অফিসারগণ পার্বত্যাঞ্চলে চাকরি করেনি তারা অন্যদের সেসব গল্প বা স্মৃতিচারণের সময় চুপসে যেত৷ তদ্রুপ উপজেলায় চাকরি না করা চিকিৎসকগণ নিশ্চিত তাদের জীবনের বড় একটা অধ্যায়কে মিস করলেন ৷ সবকিছুতেই সাধারণের মধ্যে থেকে বেড়ে ওঠার সামাজিক ও কৃষ্টিগত একটা গুরুত্ব আছে ৷

করোনা হাসপাতালগুলোতে ভুতুড়ে পরিবেশ বিদ্যমান, অভিযোগের শেষ নেই অথচ চিকিৎসকরা অন্যান্য স্বাস্থকর্মীরা সারাদিন খাটছে, জীবন শেষ করে দিচ্ছে ৷ রোগীও তাদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলা দরকার, তাদের কথা শোনা প্রয়োজন ৷ তাদের মনোবল অটুট ও প্রফুল্ল রাখা খুব জরুরি৷

সেই অনুভূতি নিয়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালের পরিচালকের সাথে কথা বলে আজ গেলাম তার অফিসে ৷ খুব ধৈর্যশীল অমায়িক এই পরিচালক আমাকে কিভাবে কাজ করবো জানতে চাইলে আমি তাকে জানালাম ৷

প্রপার প্রটেকশন নিয়ে ওয়ার্ডে গিয়ে রোগী ও তাদের কেয়ারগিভারদের সাথে আলাপের, কাউন্সেলিংয়ের অনুমতি দিয়ে আমাকে নিয়ে কনফারেন্স হলে গেলেন ৷

ঊনচল্লিশতম বিসিএসের নতুন চিকিৎসকরা জয়েন করতে এসেছে ৷ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল তাদের উদ্যেশ্যে প্রারম্ভিক কথা শেষ করে আমাকে তাদের উদ্যেশ্যে কথা বলতে আহবান করলেন ৷ তিনি একজন অভিভাবকের মতো নতুন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু অতি জরুরি কিথা বললেন ৷ খুব স্পষ্টভাবে থেমে থেমে তিনি তাদের সাহস রেখে মন দিয়ে কাজ করার আহবান জানালেন৷ আশ্বস্থ করলেন ব্যক্তি নিরাপত্তা মেনে চললে তোমরা কেউ আক্রান্ত হবে না৷

ওদের দেখে আমার খুব ভালো লাগছিলো ৷ অধিকাংশই মেয়ে ৷ বাইরে অপেক্ষমান উদ্বিঘ্ন বাবা ভাই স্বামী ৷ 

জামিল যেখানে নবাগতদের আপনি সম্বোধন করছিলো আমি আমার ছেলে মেয়েগুলোকে সরাসারি তুমি বলে সম্বোধন করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথা বললাম ৷

‘মানুষের সেবা প্রদানের সর্বোচ্চ সুযোগ তাদের আজ এসেছে যার আকাঙ্খা সে এতদিন করে এসেছিলো ৷ মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় জীবনের লক্ষ্য কেন চিকিৎসক হওয়া বাংলা রচনায় তার পক্ষে হাজারো চমৎকার যুক্তি দিয়ে আসার বাস্তব প্রমান রাখার ক্ষণ আজ ৷ কুরআন পড়ার, নামাজ আদায়ের, রোজা রাখার, জাকাত আদায়ের মাধ্যমে যে আল্লাহকে খুশি করতে চায় সে এই হাসপাতালের প্রতি বেডে বেডে সেই আল্লাহ অপেক্ষমান ৷’

তাদের উদাহরণ দিয়ে বললাম- ‘শীতের থির নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ মেলে না ইলিশ মেলে শ্রাবন প্লাবিত নদী বা উত্তাল সাগরে যেখানে ট্রলার ভর্তি মাছ নিয়ে ফিরে জেলে ৷ বিজয়ের জন্য জীবনে ঝুঁকি নিতে জানতে হবে, শিখতে হবে ৷’

একাত্তুরের যুদ্ধের উপমা দিয়ে তাদের অনুপ্রাণিত করলাম যে, ‘সেদিন দৃশ্যমান শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে, দেশের সব মানুষ আক্রান্ত হয়নি ৷ শুধু বাংলাদেশে যুদ্ধ ছিল ভারতসহ অনেকেই আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে ৷ কিন্তু আজ? সারা বিশ্ব আক্রান্ত! কে কাকে সাহায্য করবে? আর শত্রু অদৃশ্যে অদ্ভুদভাবে বিরাজিত৷ অতএব এই যুদ্ধ আরো ভয়াবহ, ভয়ংকর হবে পরিণতি যদি হুশে না থাকি৷ পর্যাপ্ত প্রটেকশন নিয়ে কাজ করতে হবে, বাকি আল্লাহর ইচ্ছা৷ আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহর হুকুম ছাড়া মৃত্যু হয় না - অতএব ভয় পাব না৷ নিজের দায়িত্ব পালন করবো - এতে মনোবল বাড়ে, আত্মা শান্তি পায়৷’

ওদের স্বাগতম জানিয়ে প্রানভরে দোয়া করে আমি বক্তব্য শেষ করলাম৷

পরিচালকের কাছ থেকেও বিদায় নিয়ে প্রথমে পিপিই তুললাম ৷ আমাদের পিপিইর উপির সাদা এই পিপিই পড়ে, ফেস শিল্ড, গগলস, সুকভার পড়ে পুরুষ করোনা ওয়ার্ডে ঢুকে এক একজন রোগীর কাছে গেলাম, তাদের কেয়ারগিভারদের সাথে কথা বললাম৷

একটা সাধারণ ওয়ার্ডের মতোই মনে হল এই ওয়ার্ড৷ রোগীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, দূরে দূরে৷ রোগীরা অধিকাংশই তরুণ৷ বয়স্ক এক দম্পতির স্বামীর এখনো পজেটিভ থাকলেও স্ত্রী নেগেটিভ হয়ে স্বামীকে আশ্বস্ত করছে৷ তার প্রশান্ত চাহুনি৷ কেউ কেউ আইসিইউ থেকে ফিরেছে৷ তিন হাসপাতালে ধাক্কা খেয়ে, দুই লাশের মাঝের সীটে অবস্থান করে কুর্মিটোলা এসে একজন হ্যাপি৷ যুবক এই ভদ্রলোকের মাস্ক সরানোর পর অক্সিজেন নেয়া অবস্থায় তার মুখে হাসি দেখেছি৷

আরেক ভদ্র মহিলার মানসিক বল দেখে আমি অবাক৷ কেরানীগঞ্জ থেকে মহানগর হাসপাতাল হয়ে ঢাকা মেডিকেলে টেস্ট পসিটিভ নিয়ে কুর্মিটোলা আসে৷

বলে- ‘স্যার চার বাচ্চাকে ভগবানের উপর ফেলে রেখে আমি আমার স্বামীকে নিয়ে পাগলের মতো ছুটছি, তার শ্বাস কষ্ট - মনে হল আমারই দম বন্ধ হয়ে আসছে৷ তার চোখে আনন্দাশ্রু, স্বামী মাস্ক পড়া পাশের বেডে৷ স্বামীর দিকে তৃপ্তির একটা চাহুনি দিয়ে বললো- স্বামী ছাড়া আমার জীবনের দাম কি!

ক্ষনিকের জন্য আমার মনে হল- আমি কি শরৎ বা রবীন্দ্র সংলাপ শুনছি কোন!

নারায়ণগঞ্জের একজনকে পেলাম ৷ এদের সবার অবস্থা উন্নতির দিকে ৷ তাদের শোকের স্তরগুলো আর নেই ৷ যেহেতু সুস্থতার দিকে তারা এগুচ্ছে তাই মনটাও ভালো ৷ মনোবল দৃঢ় রাখার জন্য প্রাসঙ্গিক কথাগুলো বললাম ৷ যা বলতে ভুলিনি সেটা হচ্ছে কভিক রিকোভারি হিসেবে মানুষের মধ্যে এই কথাগুলো প্রচার করার জন্য আবেদন করলাম-

* স্বাস্থ্য বিধি ষোল আনা মেনে চলার আহবান করা।
* অহেতুক ঘরের বাইরে না যাওয়ার আহবান করা।
* গুজবে কান না দিয়ে যুক্তি দিয়ে যাচাই বাছাই করার আহবান জানানো।
* ঘরে বসেই আত্মীয়স্বজনসহ অন্য মানুষের প্রতি দরদী আচরণ করা ও তাদের আর্থিক মানসিক সাহায্যে এগিয়ে আসার আহবান জানানো।

এ কথায় সবাই সহাস্যে সায় দিয়েছে ৷

আমার আজকের এই উদ্যোগটা যেহেতু তাদের কাছে নতুন ও অভিনব কর্মকান্ড হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে রোগী ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক ৷ তাদের হাসিখুশি মুখ দেখে আমিও তৃপ্তি পেলাম ৷ পিপিই, ফেস শিল্ড, সু কভার, গ্লাভস সব একটা নিদৃষ্ট রুমে ভিন্ন ভিন্ন বাস্কেটে রেখে লিফ্ট বেয়ে নিচে চলে এলাম ৷

ফিরতে ফিরতে গাড়িতেই অনেক কল পেলাম - কাজটা নাকি ঠিক হয়নি ৷ হায়রে ভগবান!

আমিতো ভাবছি সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশনের সাথে কথা বলে কিছু তরুণ সাইকিয়াট্রিস্টদের,ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের সমন্বয়ে একটা টিম করে পিরিওডিক্যালি কভিড হাসপাতালগুলোতে কাউন্সেলিং সেশন করবো ৷ সেবাপ্রদানকারী সেবাকর্মীদের সাথেও প্রোগ্রাম করবো ৷ মরার আগেই যেন কেউ না মরে- সেটা দেখার দায়িত্ব মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের নেয়া উচিত, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের এই সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত ৷

আমরা যেন এই মহাদুর্যোগ থেকে পরিত্রান পাই ৷ আল্লাহ সহায় হোন ৷ মানবিকতা বেঁচে থাক দীর্ঘদিন ৷

করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম গুলো মেনে চলুন। সর্দি কাশি জ্বর হলে হাসপাতালে না গিয়ে স্বাস্থ্য সেবা দানকারী হটলাইন গুলোতে ফোন করুন। আইইডিসিআর হটলাইন- 10655, email: [email protected]
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না