তাপপ্রবাহে বাড়ছে গর্ভবতী নারী ও অনাগত শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি, ২৬ শতাংশেরও বেশি অকাল প্রসবের শঙ্কা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তাপপ্রবাহ ও তাপঝড়। এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে গর্ভবতী নারী ও তাঁদের অনাগত শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে গর্ভপাত, মৃত সন্তান জন্ম, জন্মগত ত্রুটি, উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া এবং নির্ধারিত সময়ের আগে সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এমনকি কোনো অঞ্চলের স্বাভাবিক তাপমাত্রার তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেলেও এই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে গর্ভাবস্থার জটিলতার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে তাপপ্রবাহের পরবর্তী সপ্তাহে অকাল প্রসবের ঝুঁকি ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গর্ভবতী নারীর বসবাসের এলাকার গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পরবর্তী কয়েক দিনে অকাল প্রসবের আশঙ্কা ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একইভাবে গর্ভাবস্থার শেষ মাসে তাপপ্রবাহের মধ্যে থাকলে অকাল প্রসবের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
মেক্সিকোর ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৮০ লাখের বেশি শিশুর জন্মসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে রয়টার্স। এতে দেখা গেছে, সন্তান জন্মের আগের চার সপ্তাহে তাপঝড় বা সাধারণ তাপপ্রবাহের প্রভাবে অকাল প্রসবের হার গড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যায়। তাপের সংস্পর্শের মাত্রা বেশি হলে এই হার বেড়ে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর ফলে মেক্সিকোতে প্রতিবছর উষ্ণ মৌসুমে অতিরিক্ত ১ হাজার ৪০০-এর বেশি শিশু অপরিণত অবস্থায় জন্ম নিচ্ছে।
প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া ও অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে শুধু অকাল প্রসব নয়, মায়ের শরীরেও নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, কিডনির সমস্যা এবং প্লাসেন্টা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি।
চীনের ২০ লাখ নারীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অস্বাভাবিক গরমের সঙ্গে প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ১৩ শতাংশ বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। এই জটিলতা থেকে কিডনি বিকল, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দরিদ্র নারী, বেশি বয়সী নারী, ধূমপায়ী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত এবং নিয়মিত ওষুধ সেবনকারী গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যমজ সন্তান ধারণকারী নারীরাও বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন।
তাপঝড়ের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ছয় দশকে তাপপ্রবাহের ধরন ও বিস্তারে বড় পরিবর্তন এসেছে। ১৯৬০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে মাত্র ৫০টি বড় তাপঝড়ের ঘটনা ঘটেছিল। অথচ চলতি দশকেই এখন পর্যন্ত ৬৬৫টির বেশি তাপঝড় শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বড় তাপঝড়টি প্রায় এক বছর ধরে পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ এলাকায় বিস্তৃত ছিল।
প্রতিবেদনে তাপঝড় বলতে এমন বড় তাপপ্রবাহকে বোঝানো হয়েছে, যার সর্বোচ্চ বিস্তৃতি পৃথিবীর অন্তত ১ শতাংশ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষকদের মতে, শুধু মরুভূমি বা প্রচণ্ড গরমের অঞ্চলেই এ ঝুঁকি সীমাবদ্ধ নয়। নাতিশীতোষ্ণ ও তুলনামূলক শীতল অঞ্চলেও স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা বাড়লে গর্ভবতী নারীরা ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
গবেষকের নিজের গর্ভাবস্থাতেও ছিল তাপের প্রভাব
রয়টার্সের প্রতিবেদনে দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য গবেষক দার্শনিকা লাখুর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। গর্ভাবস্থায় তিনি নিজেই তাপের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছিলেন। একই সময়ে তিনি যমজ সন্তানের মা হতে যাচ্ছিলেন।
তাঁর গর্ভাবস্থায় জোহানেসবার্গে ৭৪ দিন তাপঝড়ের পরিস্থিতি ছিল। তাঁর বাড়ির কাছের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল।
গর্ভাবস্থার একপর্যায়ে তাঁর প্লাসেন্টায় রক্তপ্রবাহের অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। পরে রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং প্রস্রাবে প্রোটিন পাওয়া যায়, যা প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার লক্ষণ। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের আগেই তাঁর যমজ সন্তান জন্ম নিতে হয়। জন্মের পর শিশু দুটিকে দীর্ঘ সময় নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখতে হয়েছিল।
তবে লাখুর অকাল প্রসবের একমাত্র কারণ তাপ ছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। যমজ সন্তান ধারণের কারণেও তাঁর আগে থেকেই ঝুঁকি ছিল। এ বিষয়ে তাঁর উপলব্ধি, তাপ তাঁর সন্তান জন্মের সময় আরও এগিয়ে এনেছিল।
সুরক্ষায় সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি
গবেষকদের মতে, গর্ভবতী নারীদের তাপজনিত ঝুঁকি কমাতে পর্যাপ্ত পানি পান, শীতল পরিবেশে অবস্থান, প্রয়োজন ছাড়া প্রচণ্ড গরমে বাইরে না যাওয়া এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরার মতো পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় চিকিৎসকদের তাপের সংস্পর্শে থাকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া বা অন্যান্য জটিলতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। গবেষকেরা গর্ভাবস্থায় মাতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ, বিনা মূল্যে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং ভ্রাম্যমাণ শীতলীকরণ কেন্দ্র চালুর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগ। কারণ, নিম্ন আয়ের অনেক পরিবারের পক্ষে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহার করা কিংবা প্রচণ্ড গরমে কাজ ও যাতায়াত বন্ধ রাখা সম্ভব হয় না। সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তাপপ্রবাহকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এমআর/