মো. আল আমিন ভূঁইয়া
মো. আল আমিন ভূঁইয়া
নিবন্ধিত নার্স (বিএনএমসি)
হেলথ সার্ভিস অফিসার
রিদম বাংলাদেশ ট্রাস্ট
০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০১ পিএম
বাংলাদেশের নার্সিং পেশা: সংকট, সম্ভাবনা ও টেকসই ক্যারিয়ার কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশের নার্সিং পেশার বর্তমান কাঠামো যেন এক গোলকধাঁধা। একজন নার্সের শিক্ষাগত যোগ্যতা, ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা, উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়নের জন্য আমাদের দেশে আদৌ কোনো সুসংগঠিত ব্যবস্থা আছে কি?
ডিপ্লোমা ও বিএসসি নার্সদের এক পরিচয়
একজন সদ্য পাস করা ডিপ্লোমা নার্স এইচএসসি পাসের পর ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নার্সিং শিক্ষায় প্রবেশ করেন। এরপর তিন বছর অ্যাকাডেমিক ও ক্লিনিক্যাল শিক্ষা এবং ছয় মাস ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করে পেশায় প্রবেশ করেন। অন্যদিকে একজন বিএসসি নার্স আরও বিস্তৃত ও দীর্ঘ অ্যাকাডেমিক প্রস্তুতি নিয়ে একই পেশায় আসেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দুজনের পরিচয়ই অনেক ক্ষেত্রে ‘সিনিয়র স্টাফ নার্স’ হিসেবে।
উচ্চশিক্ষাতেও পদোন্নতির অভাব
এদিকে একজন নার্স যখন এমএসসি, এমপিএইচ কিংবা পিএইচডির মতো উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন, তখনও তার জন্য সুস্পষ্ট ক্যারিয়ার অগ্রগতি ও পদোন্নতির কাঠামো কতটা কার্যকর—এটি বড় প্রশ্ন।
পিসিটি ও ডিপ্লোমা নার্সদের পার্থক্য
গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রশ্ন হলো, পেশেন্ট কেয়ার টেকনিশিয়ানের (পিসিটি) মতো বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল এবং একজন পূর্ণাঙ্গ ডিপ্লোমা নার্সের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, ক্লিনিক্যাল প্রস্তুতি ও পেশাগত দায়িত্ব কি একই মানদণ্ডে বিবেচিত হওয়া উচিত? কিন্তু দেশে তা-ই হচ্ছে, পিসিটিরা ৬ মাস ইন্টার্ন করে লাইসেন্স পরীক্ষা দিয়ে হয়ে যাচ্ছেন ডিপ্লোমা নার্সের সমমান।
পেশাগত মানদণ্ড রক্ষা
পিসিটিদের নিজস্ব যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের যথাযথ মূল্যায়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু একজন নিবন্ধিত ডিপ্লোমা নার্সের শিক্ষা ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সঙ্গে তাদের পেশাগত অবস্থানকে অস্পষ্টভাবে এক করে ফেলা হলে সেটি নার্সিং পেশার জন্য কোনোভাবেই একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা হতে পারে না।
যোগ্যতানির্ভর বেতনের দাবি
একজন বিএসসি নার্সের জন্য কি আলাদা ও যৌক্তিক বেতন কাঠামো থাকা উচিত নয়? একজন এমএসসি, এমপিএইচ বা পিএইচডিধারী নার্সের উচ্চশিক্ষার প্রতিফলন কি তার পদোন্নতি, দায়িত্ব ও বেতনে থাকা উচিত নয়?
অবশ্যই থাকা উচিত। একজন নার্সের পরিচয় শুধু ‘সিনিয়র স্টাফ নার্স’ পদে এসে থেমে যাওয়া উচিত নয়।
ক্লিনিক্যাল ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব
ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতার ভিত্তিতে একজন নার্সের ক্যারিয়ার অগ্রগতির সুস্পষ্ট পথ থাকতে হবে। হাসপাতালে যোগ্য ও অভিজ্ঞ নার্সদের জন্য ইনচার্জ, সুপারভাইজার, মেট্রনসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ক্লিনিক্যাল নেতৃত্বের পদ থাকতে হবে।
নার্সিং শিক্ষা ও ক্যাডার কাঠামো
একইভাবে নার্সিং শিক্ষায় ইনস্ট্রাক্টর, লেকচারার, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ও প্রফেসর হওয়ার সুস্পষ্ট সুযোগ থাকতে হবে। একই সঙ্গে নার্সদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ প্রফেশনাল ক্যারিয়ার স্ট্রাকচার এবং কার্যকর প্রফেশনাল বিসিএস/ক্যাডার নিয়েও নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
মেধাবীদের আকৃষ্ট করার চ্যালেঞ্জ
একজন তরুণ যখন দেখে যে নার্সিংয়ে যত উচ্চশিক্ষাই অর্জন করা হোক, শেষ পর্যন্ত ক্যারিয়ারের একটি বড় অংশ একই পদ ও একই কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকতে হয়, তখন মেধাবী শিক্ষার্থীরা কেন এই পেশাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেবে?
বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এমন অনেক শিক্ষিত ও দক্ষ নার্স রয়েছেন, যারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রমেট্রিক, এনক্লেক্সের মতো পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিদেশে কাজের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের দক্ষতা কাজে লাগানো এবং পরিকল্পিতভাবে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে আমরা কতটা এগোতে পেরেছি?
রেমিট্যান্স ও সরকারি উদ্যোগ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষ নার্সের চাহিদা রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ থেকে দক্ষ নার্স পাঠানোর জন্য যদি সরকার প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা, লাইসেন্সিং সহায়তা, বৈদেশিক নিয়োগ ও নিরাপদ অভিবাসনের সমন্বিত ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, তাহলে একদিকে যেমন দেশের বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—সরকারের ঘুম কবে ভাঙবে?
আমি কোনো পেশাকে ছোট করতে চাই না। বরং আমি চাই প্রত্যেক পেশাজীবী তার যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ অনুযায়ী যথাযথ মর্যাদা পান।
সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার
আমার দাবি খুবই পরিষ্কার—যোগ্যতা, উচ্চশিক্ষা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন চাই। নার্সদের জন্য এমন একটি কাঠামো চাই, যেখানে একজন ডিপ্লোমা নার্স, বিএসসি (BSc) নার্স এবং উচ্চশিক্ষিত নার্স প্রত্যেকে তার যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পাবেন। এতে শুধু নার্সরাই উপকৃত হবেন না; বরং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাও আরও দক্ষ ও শক্তিশালী হবে।
মেধাবী তরুণদের নার্সিং পেশায় আকৃষ্ট করতে হলে শুধু প্রচারণা যথেষ্ট নয়। তাদের সামনে একটি সম্মানজনক, স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে। নার্সিং পেশার উন্নয়ন মানেই স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, আর সেই উন্নয়নের জন্য এখন প্রয়োজন নার্সিং পেশার কাঠামোগত সংস্কার।
জেএইচ/