মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর ও লুটের মামলায় গ্রেপ্তার ৪, পুলিশের অবহেলা তদন্তে কমিটি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: রাজধানীর মিরপুর-১ এ রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে নিরাপত্তাকর্মীদের বেঁধে রেখে সংঘবদ্ধভাবে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে শাহ আলী থানা পুলিশ। এ ছাড়াও দীর্ঘ সময় ধরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় পদক্ষেপ নিতে পুলিশের কোনো অবহেলা ছিল কি-না, তা তদন্তে ৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
আজ শনিবারের (২৬ সেপ্টেম্বর) রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ধ্বংসস্তুপ পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ এসব কথা জানিয়েছেন।
থানার এক কিলোমিটারের মধ্যে তিন ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে এবং ট্রাকে করে মালপত্র নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আমার কাছে মনে হয়েছে, ভবনটিতে যে পরিমাণ ভাঙচুর করা হয়েছে, তা আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার মধ্যে করা সম্ভব নয়। এজন্য যথেষ্ট সময় নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভবনের দুই পাশের টিনশেড ভাঙচুর করা হয়েছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানেও ভাঙচুরের আলামত পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভবনের ভেতরে রান্নার কাজে ব্যবহৃত বেশ কিছু যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
২০০-২৫০ জনকে আসামি করে মামলা
তিনি বলে, ‘ঘটনাটি আমাদের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে আমি উপ-পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশনা দিয়েছি এবং মামলা করা হয়েছে। মামলায় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনের নাম এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বাকিরা অজ্ঞাতনামা। এজাহারে নাম থাকা আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য চেষ্টা করছি। আশা করছি, খুব দ্রুত তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে আমরা চারজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছি। পুলিশের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জড়িত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চলছে।
পুলিশের অবহেলা তদন্তে কমিটি
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এ ঘটনায় পদক্ষেপ নিতে পুলিশের কোনো অবহেলা বা গাফিলতি ছিল কি-না, আমরা তা খতিয়ে দেখছি। ঘটনাটি রাত পৌনে ২টার দিকে ঘটেছে। যেহেতু এটি গভীর রাতের ঘটনা, তাই পুলিশ খবর পাওয়ার পর সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল কি-না এবং পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের অবহেলা ছিল কি-না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে দারুস সালাম জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনারকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আজকের মধ্যেই কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পুলিশের কোনো সদস্যের অবহেলা বা গাফিলতি প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দল বা মতের পরিচয় বিবেচ্য নয়
মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা কোনো দল বা মতের পরিচয় বিবেচনা করব না; অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। আমরা সবসময় এ বিষয়ে সজাগ যে কোনো ধরনের বেআইনি দখল, কার্যক্রম বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড কেউ করতে পারবে না। যে-ই এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকুক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে। তার কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না।
যে সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাঁর ক্ষেত্রেও কি একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি-না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং আমরা তদন্ত করছি। তদন্তে যারাই জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুসারে, মুখোশ পরে দেশীয় অস্ত্র হাতে দুই শতাধিক মানুষ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে প্রথমেই দুজন নিরাপত্তারক্ষীকে জিম্মি করে।
হামলাকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে পুরো স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগে মূল্যবান সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, নগদ অর্থ ও অন্যান্য জিনিসপত্র লুট করে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চত্বরে একটি স্থায়ী ভবন ও তিনটি আধা-পাকা স্থাপনা ছিল।
অভিযোগ উঠেছে, হামলাকারীরা ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
‘ভাঙচুর ও লুটপাটে কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে,’ বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার। এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় মামলা দায়ের করেছেন তিনি।
জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি নাহিদ ইসলামের
রাড্ডা এমসিএইচএফপি সেন্টার ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে তিনি এ দাবি জানান।
নাহিদ ইসলাম বলেন, মধ্যরাতে রাড্ডা এমসিএইচএফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা ভঙ্গুর, তার ভয়াবহ নিদর্শন। রাতভর প্রতিষ্ঠানটিতে ভাঙচুর ও লুটপাট চললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরব ও নির্বিকার ভূমিকা গভীর উদ্বেগের।
নাহিদ ইসলাম বলেন, এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। খোদ রাজধানীর বুকে চর দখলের মতো একটি হাসপাতাল গুঁড়িয়ে দিয়ে দখল করে নেওয়ার ঘটনায় দেশে আদৌ কোনো সরকারের অস্তিত্ব আছে কি-না, তা নিয়েই জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, এই ভাঙচুর ও দখলদারির পেছনে সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এবং মহানগর উত্তর বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতার ইন্ধন রয়েছে।
দিনের পর দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যত নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম। তাঁর ভাষায়, এমন পরিস্থিতি গোটা জাতির জন্য লজ্জার।
বিবৃতিতে তিনি রাড্ডা এমসিএইচএফপি সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান। একই সঙ্গে ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল হোতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বিএনপি নেতাকর্মীদের দায়ী করে ডাকসু ভিপির পোস্ট
এদিকে এ ঘটনায় বিএনপি নেতাকর্মীদের দায়ী করে তীব্র সমালোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) এক ফেসবুক পোস্টে তিনি এসব অভিযোগ করেন।
সাদিক কায়েমের দাবি, ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’র মাধ্যমে হাসপাতালটির জায়গা দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। এ কর্মকাণ্ডের পেছনে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নেতৃত্ব রয়েছে।
ডাকসু ভিপি বলেন, গত ৫০ বছর ধরে হাসপাতালটি প্রসূতি মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে। পাশাপাশি দরিদ্র রোগীদের জন্যও বিশেষ কার্যক্রম রয়েছে। এমন একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানও দখলদারত্ব থেকে রক্ষা পায়নি।
সাদিক কায়েম আরও অভিযোগ করে লেখেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ‘মবসন্ত্রাস ও দখলদারির রাজনীতি’ চলছে। থানা, স্কুল, হাট-বাজার, ময়লার ভাগাড় ও বালুমহালের পর এবার হাসপাতালেও হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সারাদেশে বিএনপির নামে নগ্নভাবে যে জমি দখল ও মবসন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে, এই ঘটনা তারই একটি উদাহরণ।
এছাড়া, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের ‘এলাকা ভাগ করে সন্ত্রাসের ঠিকাদারি দেওয়া হয়েছে’ বলেও অভিযোগ করেন ডাকসু ভিপি। তার ভাষ্য, মিরপুরের ঘটনাটি এরও একটি উদাহরণ।
হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে উল্লেখ করেন সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলা এবং জুলাইয়ে ছাত্রলীগের হামলার মতো ঘটনাও তিনি দেখেছেন।
সাদিক কায়েম বলেন, এসব করে বিএনপি নিজেদের জন্য ধ্বংসের পথ বেছে নিচ্ছে। অবশ্য দখলের নেশায় মত্ত সন্ত্রাসীরা সেই হুঁশ হারিয়ে ফেলেছে।
এমইউ/