নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হেনস্তার করায় সিরাজগঞ্জ মেডিকেলে ছাত্রদল নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার
মেডিভয়েস রিপোর্ট: সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাবিম হক নীরবের বিরুদ্ধে একাধিক নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হেনস্তাসহ নানা উপায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করার অভিযোগ করেছেন অধ্যয়নরত বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। এসবের বিচার চেয়ে মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জুলফিকার আলীর কাছে আলাদা লিখিত আবেদন করেছেন তারা। এ ঘটনায় নীরবকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের আবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিনীত নিবেদন এই যে, আমরা ১২তম ব্যাচের নিয়মিত শিক্ষার্থী। অত্র মেডিকেল কলেজের ১০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাবিম হক নিরব, রোল: ৩০ শিক্ষাবর্ষ: ২৩-২৪. এই মেডিকেলের ১১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীর সাথে যৌন হেনস্থা, জোরপূর্বক ধর্ষণ প্রচেষ্টা এবং এর প্রতিবাদ করলে তাকে নানা প্রকার হুমকির সম্মুখীন করার মতো জঘন্য কার্যকলাপে লিপ্ত হয়েছে।’
‘উপরন্তু, ১২তম ব্যাচের অনেক মেয়ে শিক্ষার্থীদের অনুরূপ অবস্থা ও প্রস্তাবের সম্মুখীন করছে। ১০তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সাথেও অনুরূপ কার্যকলাপে তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। এ ছাড়াও অনেক আভযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
এহেন অবস্থায়, আমরা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ একাডেমিক ব্যবস্থা গ্রহণ (স্থায়ীভাবে বহিষ্কার) করার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
মাসের পর পর টাকা না দিয়ে মিল গ্রহণের অভিযোগ
এ ছাড়াও সাবিম হক নিরবের বিরুদ্ধে মাসের পর মাস টাকা না দিয়ে মিল গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে কথা বলায় এক শিক্ষার্থীকে মৌখিকভাবে এবং অনলাইনে হুমকি দিয়েছেন নিরব।
এ বিষয়ে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) মেডিকেল কলেজের দশম ব্যাচের শিক্ষার্থী অধ্যক্ষের কাছে লিখিত আবেদনে অভিযোগ করেন, ‘জনাব, বিনীত নিবেদন এই যে, আমি আপনার মেডিকেল কলেরে ৩য় বর্ষের একজন শিক্ষার্থী। আমি ১০ম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাবিম হক নিরবের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ তুলে ধরছি। আমি এই মাসের মিল ম্যানেজার। মাসের শুরুতে আমাদের হোস্টেলে মিল কমিটির মিটিং হয়েছে। মিটিংয়ে কথা উঠছে যে, সানবিম হক নিরব গত কয়েক মাস থেকে মিল চালায় কিন্তু মিলে কোনো ধরনের টাকা দেয় না।
তবে, সম্প্রতি টাকা চাইলে নীরব সকল বকেয়া পরিশোধ করে বলে মেডিভয়েসকে জানান ওই শিক্ষার্থী।
প্রফে ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি
ওই শিক্ষার্থী জানান, ‘এমতাবস্থায় ব্যাচমেট হিসেবে আমাকে বলার দায়িত্ব দেয়া হয়। আমি নিরবকে এ বিষয়ে বললে, সে আমাকে বলে মিলের টাকার কথা তোকে কে বলছে তার নাম বল, তাকে আমি দেখে নিবো। তোদের মিল কমিটি আর রাখবো না, আমি কোনো টাকা দিতে পারবো না, তোরা যা করার করিস। শেষে আমাকে বলেছে, তুই বেশি বাড়াবাড়ি করতেছিস তোকে প্রফে ফেল করায় দিবো।’
‘অতএব, বিষয়টি বিবেচনা করে নিরবের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ একাডেমিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবি জানাছি।‘
‘প্রফ, পিন্সিপাল স্যার সব তার হাতে’
মেডিকেল কলেজের ১২তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী গত ১৮ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষের কাছে এক আবেদনে নিরবের হেনস্থার বিচার চান। তিনি অভিযোগ করেন, আমি ১০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাবিম নিরব কর্তৃক হেনস্তার শিকার।
আবেদনে তিনি আরও লেখেন, ‘২৩ জুলাই বলেছিল আজ যেন তোর ব্যাচের সব মাঠে আসে। না হলে কিন্তু অবস্থা খারাপ হবে। ৫টার মধ্যে যেন সবাই যায়। নিজের অনেক লোকজন আছে দেখাতে ক্যাম্পাসে জোরপূর্বক আমাদের ৫-৭ জনকে সাথে নিয়ে ঘুরতো। মাঝে মধ্যে বলতো প্রফ, পিন্সিপাল স্যার, সব তার হাতে। পুরো ব্যাচের সকল ছাত্রকে ক্রিকেট খেলতে নামিয়েছিন থ্রেট দিয়ে।
পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের হল থেকে ডেকে নেওয়ার অভিযোগ
সাবিম হক নিরবের শাস্তি চেয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর অধ্যক্ষে কাছে লেখা আবেদনে ১২তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিনীত নিবেদন এই যে, আমি আপনার মেডিকেল কলেজের একজন ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। ১০ম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাবিম হক নিরব, নিজের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করলে বিভিন্ন হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি গালিগালাজ করত। যেকোনো সময় হল থেকে বাইরে ডেকে নিয়ে যেত। ফলে পড়াশোনায় সমস্যা হতো। আইটেম, কার্ড’র কথা বললে বলতো যে, তাদের প্রফ পাশ। তুই কী চাস? এ ছাড়া বিভিন্ন সময় আমাকে ও আসাদের ব্যাচ ব্যাচমেটদের হল থেকে বের করতে চাইতো। বিনীত প্রার্থনা, নিরবের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে ওকে ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার করে বাধিত করবেন।’
এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন সময় নানাভাবে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে।
যা বললেন মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ
জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জুলফিকার আলী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘সাবিম হক নীরবের বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ দিয়েছে। এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দেবে। এর ভিত্তিতে একাডেমিক কাউন্সিল ব্যবস্থা নেবে। এখানে আমার একক কোনো সিদ্ধান্ত নেই।’
অভিযোগ রয়েছে নীরব অধ্যক্ষের আনুকূল্যে অনেক শিক্ষার্থীকে প্রফ পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। বিভিন্ন অন্তরঙ্গ ছবির মাধ্যমে অধ্যক্ষের সঙ্গে তার সখ্যতার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষক হিসেবে সবার সঙ্গে আমার ভালো সম্পর্ক থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বিষয়টি অন্য দিকে নেওয়ার সুযোগ নেই। কাউকে বাড়তি আনুকূল্য দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। নিরবের বিরুদ্ধে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল যে সিদ্ধান্ত দেবেই তাই বাস্তবায়ন হবে।
ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার
এদিকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক সাবিম হক নীরবকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই কথা জানানো হয়।
ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক (সহ-সভাপতি পদমর্যাদা) মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, কেন্দ্রীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের ভিত্তিতে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক সাবিম হক নীরবকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার করা হলো। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির আজ এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।’
গত ১ মে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ শাখার কমিটির অনুমোদন করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
আংশিক এই কমিটির সভাপতি করা হয় রিক্তিক হাসানকে এবং সাধারণ সম্পাদক করা হয় সাবিম হক নীরবকে। এ ছাড়া সৈয়দ আবরার ফাইয়াজকে সিনিয়র সহ সভাপতি, হাবিব উন নবীকে সিনিয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, আব্দুল্লাহ আল নোমানকে সাংগঠনিক সম্পাদক, তাইফ নাজাফি আরিফকে দপ্তর সম্পাদক, মো. আব্দুল্লাহ আল আকিবকে প্রচার সম্পাদক, ফাহমিদা ইসলাম ফামিকে ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক করা হয়।
এর মধ্যে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সাধারণ সম্পাদক সাবিম হক নীরবকে বহিষ্কার করা হলো।
যা বললেন কলেজ শাখা ছাত্রদল সভাপতি
সাবিম হক নীরবকে কেন্দ্রীয় সংসদের বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রদল সভাপতি রিক্তিক হাসান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘হ্যাঁ সত্য। এটা সেন্ট্রাল থেকেই করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের অনেকেই অনেক অভিযোগ করছিল। সেটার পরিপ্রেক্ষিতে একাডেমিক একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং সেন্ট্রাল থেকেও সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়।
একাডেমিক সিদ্ধান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একাডেমিক কাউন্সিল তিন কার্যদিবসের মধ্যে একটা সিদ্ধান্ত জানাবে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। বড় ধরনে শাস্তি আসতে পারে।
রিক্তিক হাসান বলেন, নীরবের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অভিযোগ এসেছে। মানে যেমন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা, ভয় দেখানো—এ রকম। একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়া পর্যন্ত আমরা আর বেশি কিছু বলবো না। বিষয়টি এভয়েড করতে চাচ্ছি।
সকল অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য জানতে সাবিম হক নীরবের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হয়। তবে তার ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
এমইউ/