ভারতীয় চিকিৎসকের বেআইনিভাবে বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা, ব্যবস্থা নিতে বিএমডিসির নির্দেশ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) নিবন্ধন ছাড়া বাংলাদেশে বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে ভারতের নাগরিক ডা. ভাদিনগাডু মুনাস্বামী থমাসের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
বিএমডিসির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ডা. লিয়াকত হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘ভারতের নাগরিক ডা. ভাদিনগাডু মুনাস্বামী থমাসের (পাসপোর্ট নম্বর–Z4720059)-এর অবৈধ চিকিৎসা কার্যক্রমের বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে এই চিঠি লিখছি।’
এতে আরও বলা হয়, ডা. থমাস দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বাংলাদেশে যাতায়াত করে আসছেন এবং বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) কোনো নিবন্ধন বা অনুমতি ছাড়াই চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, বিএমডিসির নিবন্ধন ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা একটি বেআইনি অপরাধ।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ডা. থমাসের এই অননুমোদিত চিকিৎসা কার্যক্রম স্থানীয় চিকিৎসক সমাজের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ কারণে বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে স্থানীয় চিকিৎসা কাউন্সিলের বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
এ অবস্থায় বিষয়টি তদন্ত করে ডা. থমাসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের অননুমোদিত আন্তঃসীমান্ত চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এ নিয়ে একটি বেসরকারি স্যাটেলাইটল টেলিভিশনের স্ক্রলে প্রচারিত অনলাইন বিজ্ঞাপনে বলা হয়, ডা. ভি.এম. থমাস আগামী ২১ ও ২২ আগস্ট ঢাকায় সরাসরি গাইনি সমস্যার পরামর্শ দেবেন।
এর আগে গত জুনে একই উপায়ে বাংলাদেশে বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার ব্যাপারে প্রচার চালান তিনি। কাউন্সিলের অনুমতি না নেওয়ায় তখন ভারতীয় চিকিৎসকের রোগী দেখানো ও পরামর্শ সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায় বিএমডিসি।
কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে পাঠানো এ সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়, ‘অনলাইন লিফলেট এবং টিভি স্ক্রলিং এর মাধ্যমে প্রকাশ (ফটোকপি সংযুক্ত) বিদেশী ভারতীয় চিকিৎসক ডা. ভি এম থমাস SIBL FOUNDATION HOSPITAL, 70 Green Road, DhAKA-1205, ঢাকা এই ঠিকানায় আগামী ০৫ জুন ও ০৬ জুন-২০২৬ তারিখ চিকিৎসা প্রদান করিবেন। উক্ত ঠিকানায় যোগাযোগ করার জন্য অনলাইন এ বিজ্ঞপ্তি প্রদান করিয়াছেন, আপনার অবগতির জন্য জানান যাইতেছে যে, উল্লেখিত বিদেশী চিকিৎসক অত্র কাউন্সিল হইতে রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ করেন নাই। এমতাবস্থায় উক্ত বিদেশী চিকিৎসক তাহাদের চিকিৎসা কার্য পরিচালনা করিলে তাহা হইবে আইনের পরিপন্থী। এই বিষয়ে অনতিবিলম্বে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হইল।’
এ ব্যাপারে নিজেদের আইনের ধারা তুলে ধরে বিএমডিসি জানায়, ‘এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০ সনের ৬১ নং আইন আপনার অবগতির জন্য উদ্ধৃত হইল—‘২২. নিবন্ধন ব্যতীত এলোপ্যাথি চিকিৎসা নিষিদ্ধ।-(১) অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন নিবন্ধন ব্যতীত কোন মেডিকেল চিকিৎসক বা ডেন্টাল চিকিৎসক এলোপ্যাথি চিকিৎসা করিতে, অথবা নিজেকে মেডিকেল চিকিৎসক বা, ক্ষেত্রমত, ডেন্টাল চিকিৎসক বলিয়া পরিচয় প্রদান করিতে পারিবেন না।’
‘(২) কোন ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর বিধান লংঘন করিলে উক্ত লংঘন হইবে একটি অপরাধ, এবং তজ্জন্য তিনি ৩ (তিন) বৎসর কারাদন্ড অথবা ১(এক) লক্ষ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হইবেন।’
এর অনুলিপি সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
বিপিএইচসিডিএ’র সভাপতির প্রতিক্রিয়া
বিদেশি চিকিৎসক কীভাবে অননুমোদিত চিকিৎসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনোস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএইচসিডিএ) সভাপতি ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস ডাম্বেল বলেন, গত ৫৬ বছর ধরে বিএমডিসি যেভাবে চলে আসছে, সেখানে পর্যাপ্ত লোকবল, জায়গা বা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো—কিছুই ছিল না। সম্প্রতি আমরা উদ্যোগ নিয়ে একটি জায়গা ভাড়া নিয়েছি। স্বাধীনতার এত বছরে এ ধরনের মৌলিক উদ্যোগ কেউ নেয়নি।’
গত ১৫-১৭ বছরেও বিএমডিসিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, যেখানে নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। সেই ব্যবস্থাটিও কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা চেষ্টা করছি, নতুন আইন প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় সংস্কারের। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে দেশের কিছু মানুষ ভারতের পক্ষে কাজ করছে। তারা ভারতকে নিজেদের মাতৃভূমি মনে করে এবং তাদের স্বার্থে কাজ করে। ফলে এই অননুমোদিত চিকিৎসা চলমান আছে।’
‘৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর ভারতীয় ভিসা বন্ধসহ বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। তখন ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, চিকিৎসা না হলে বাংলাদেশের রাস্তায় মানুষ মারা যাবে। কিন্তু এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় বিজয়। তারা যে দাবি করেছিল, বাংলাদেশে চিকিৎসাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—তা সত্য হয়নি।’
স্বাধীনতার পর থেকেই স্বাস্থ্য খাতকে দুর্বল করার জন্য ভারতের প্রভাবশালী কিছু লোক এখানে কাজ করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জানান, সম্প্রতি একটি হাসপাতালে ক্যান্সার রোগীর মৃত্যুর ঘটনা বিশেষভাবে প্রচার করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনাকে ব্যবহার করে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দুর্বল হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মূলত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করে রোগীদের বিদেশে, বিশেষ করে ভারতে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবছর চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা চিকিৎসার জন্য বাইরে ব্যয় হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ বিলিয়নই ভারতে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ছোটখাটো চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের জন্যও ভারতে চলে যাচ্ছে। এর পেছনে দীর্ঘদিনের প্রচারণা ও মানসিক প্রভাব কাজ করছে।’
এমইউ/