মো. মাহবুবুর রহমান
মো. মাহবুবুর রহমান
আহ্বায়ক,
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট
৩০ জুলাই, ২০২৬ ০৪:১১ পিএম
জরুরি জাতীয় ল্যাবরেটরি নীতিমালা
স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত মেডিকেল ল্যাবরেটরি খাত
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার ও উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সবার জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ দেশের স্বাস্থ্যখাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। সরকারের এই দূরদর্শী পরিকল্পনা সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি আধুনিক, কার্যকর ও জনমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা জাগিয়েছে।
চিকিৎসাব্যবস্থায় মেডিকেল ল্যাবরেটরির ভূমিকা
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগ নির্ণয়ের ৭০ শতাংশেরও বেশি চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত নির্ভর করে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ফলাফলের ওপর। সঠিক রোগ নির্ণয় ছাড়া কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব নয়। তাই চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নের সঙ্গে মেডিকেল ল্যাবরেটরি ব্যবস্থার উন্নয়ন সরাসরি সম্পর্কযুক্ত।
দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাস্থ্যসেবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত ক্ষেত্র হলো মেডিকেল (ডায়াগনস্টিক) ল্যাবরেটরি সেবা। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বাংলাদেশে মেডিকেল ল্যাবরেটরি সেবার উন্নয়ন, পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাক্ষেত্র পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের বাইরে থেকে গেছে।
দক্ষ জনবলের সংকট ও শূন্যপদের বাস্তবতা
বর্তমানে দেশে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ল্যাব পেশাজীবীর ঘাটতি ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। প্যাথলজিস্ট, ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য সহায়ক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়লেও সেই অনুপাতে জনবল তৈরি ও নিয়োগের কার্যকর উদ্যোগ এখনও পর্যাপ্ত নয়। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে অসংখ্য পদ শূন্য থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা ও স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক মানের ওপর।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, দেশের মেডিকেল ল্যাবরেটরিগুলোতে ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট ও মাইক্রোবায়োলজিস্টদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল বহু দেশে বিষয়ভিত্তিক উচ্চশিক্ষাপ্রাপ্ত বায়োকেমিস্ট ও মাইক্রোবায়োলজিস্টরা রোগ নির্ণয়, গবেষণা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং ল্যাব ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। বাংলাদেশেও বর্তমানে বহু বেসরকারি ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরিতে বায়োকেমিস্টরা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাই সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে এই পেশাজীবীদের জন্য পৃথক পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ হবে এবং রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
জরুরি পদ সৃষ্টি ও পেশাগত উন্নয়ন
একই সঙ্গে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য পর্যাপ্ত পদ সৃষ্টি, নিয়মিত নিয়োগ এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ল্যাবরেটরি পরিচালনা, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষার নির্ভুলতা নিশ্চিতকরণ এবং রোগীর নিরাপত্তা রক্ষায় দক্ষ টেকনোলজিস্টদের ভূমিকা অপরিসীম। একটি শক্তিশালী ল্যাবরেটরি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে তাদের অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত ল্যাব পেশাজীবীদের বেতন ও ক্যারিয়ার কাঠামো। বর্তমানে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এ খাতের কর্মীদের জন্য স্বীকৃত বেতন কাঠামো কিংবা সুস্পষ্ট পদোন্নতি ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন নীতিমালা নেই। এর ফলে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন এবং দক্ষ পেশাজীবীদের একটি অংশ অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় ল্যাবরেটরি নীতিমালা
স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মেডিকেল ল্যাবরেটরি সেক্টরকে জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। একটি আধুনিক জাতীয় ল্যাবরেটরি নীতিমালা প্রণয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি, নিয়মিত নিয়োগ, পেশাগত স্বীকৃতি এবং বেসরকারি খাতে ন্যায্য বেতন কাঠামো নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই খাতকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
বর্তমান সরকারের আগামী এক বছরে প্রায় এক লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই বৃহৎ জনবল নিয়োগ কর্মসূচি স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা ও মান—উভয়ই বৃদ্ধি করবে বলে দেশের মানুষ আশাবাদী।
ল্যাবরেটরি পেশাজীবীদের সমান অগ্রাধিকার
তবে এই নিয়োগ কার্যক্রমে চিকিৎসক ও নার্সদের পাশাপাশি মেডিকেল ল্যাবরেটরি পেশাজীবীদেরও সমান গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। কারণ আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগ নির্ণয়ই চিকিৎসার ভিত্তি, আর সেই ভিত্তি নির্মাণ করে মেডিকেল ল্যাবরেটরি। দক্ষ প্যাথলজিস্ট, ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য ল্যাব পেশাজীবীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সরকারের এই বৃহৎ নিয়োগ কর্মসূচিতে মেডিকেল ল্যাবরেটরি সেক্টরের জন্য পর্যাপ্ত পদ সৃষ্টি, দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে যেমন দক্ষ চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন, তেমনি একটি আধুনিক, নির্ভরযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন মেডিকেল ল্যাবরেটরি ব্যবস্থাও সমানভাবে অপরিহার্য।
আধুনিক ল্যাবরেটরি ব্যবস্থা শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি
মনে রাখতে হবে, একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর। আর একটি শক্তিশালী রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে মেডিকেল ল্যাবরেটরি সেক্টরের উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। তাই স্বাস্থ্যখাতের সামগ্রিক উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এখনই মেডিকেল ল্যাবরেটরি সেক্টরকে জাতীয় অগ্রাধিকারের আওতায় আনা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
এমআর/