বিশ্বমানের পথে দেশের নিউরোভাসকুলার সার্জারি, বাধা আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উন্নত প্রশিক্ষণ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশে মস্তিষ্কের রক্তনালীর জটিল রোগের চিকিৎসা এখন বিশ্বমানের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন দেশের নিউরোসার্জনরা। তবে প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট, উচ্চ চিকিৎসা ব্যয় এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীরা কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চিকিৎসকরা জানান, সরকারি সহায়তায় সরঞ্জাম ও উন্নত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে দেশে এ ধরনের অস্ত্রোপচারের সংখ্যা দেড় থেকে দুই গুণ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
বুধবার (২৯ জুলাই) সন্ধ্যায় রাজধানীতে ‘নিউরোভাসকুলার উইক’র সমাপনী অ্যাকাডেমিক প্রেজেন্টেশনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। সপ্তাহব্যাপী রাজধানীর একাধিক হাসপাতালে মস্তিষ্কের বিভিন্ন সমস্যায় অস্ত্রোপচারের ওপর নিউরোসার্জনদের মধ্যে এসব পর্যালোচনা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত এক সপ্তাহে রাজধানীর একাধিক হাসপাতালে মস্তিষ্কের রক্তনালীর বিভিন্ন রোগের যে চিকিৎসা হয়েছে, তার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা, অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানগত বিষয়ে মতবিনিময় করাই এই আয়োজনের উদ্দেশ্য।
এতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস (নিন্স) অ্যান্ড হাসপাতালে, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক, মেডিকেল অফিসার, রেসিডেন্ট ও প্রশিক্ষণার্থীসহ ২৫ জন চিকিৎসক অংশ নেন, যাদের সবাই নিউরোসার্জারিতে প্রশিক্ষণরত বা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন।
প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী পর্যালোচনামূলক এই অনুষ্ঠানে সার্জারির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন ঢামেক নিউরোসার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সমন রানা। একই সঙ্গে জটিলতাগুলো এড়িয়ে এসব অস্ত্রোপচার সফলতার দিকে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য দিক নিয়েও আলোচনা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বিভিন্ন বিষয়ের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা মূলত একটি টিম হিসেবে বিআরবি হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং গ্রিন লাইফ হাসপাতালে করা বিভিন্ন নিউরোভাসকুলার চিকিৎসার অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করেছি।’
নিউরোভাসকুলার চিকিৎসার দুটি প্রধান পদ্ধতি
অনুষ্ঠানে মস্তিষ্কের রক্তনালীর রোগের দুটি প্রধান চিকিৎসা পদ্ধতি বিষয়ে তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এগুলো হলো—অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা, যেখানে আধুনিক মাইক্রোস্কোপ, মাইক্রোডপলার ও অন্যান্য মাইক্রোইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করা হয়। এনজিওগ্রামের মাধ্যমে কাটা ছাড়াই স্টেন্ট, কয়েল বা অন্যান্য এন্ডোভাসকুলার পদ্ধতিতে চিকিৎসা। এ ছাড়া কোন ধরনের রোগীর জন্য কোন পদ্ধতি উপযুক্ত, সে বিষয়ে পরিকল্পনা ও আলোচনা করা হয়।
আটটি জটিল সার্জারির কেস উপস্থাপন
মোট আটটি সার্জারির কেস উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছিল অ্যানিউরিজম, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, ভেনাস সমস্যার চিকিৎসা ও বাইপাস সার্জারিসহ মস্তিষ্কের বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, অ্যানিউরিজম হলো মস্তিষ্কের রক্তনালীর গায়ে থাকা জন্মগত ফোসকা। এটি ফেটে গেলে সাবঅ্যারাকনয়েড হেমোরেজ নামে এক ধরনের স্ট্রোক হয়। এ ধরনের রোগের চিকিৎসা দুইভাবে করা যায়। যথা—মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে ওপেন সার্জারি এবং এনজিওগ্রামের মাধ্যমে কয়েলিং।
বক্তারা জানান, ‘বিশ্বজুড়ে এ ধরনের চিকিৎসা সাধারণত নিউরোলজি, নিউরোরেডিওলজি এবং নিউরোসার্জারি—এই তিনটি শাখার চিকিৎসকরা করেন। নিউরোসার্জন হিসেবে আমাদের সুবিধা হলো, আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার ও এন্ডোভাসকুলার—দুই ধরনের চিকিৎসাই দিতে পারি।’
সংশ্লিষ্টরা বলেন, ‘আমরা সবাই নিউরোসার্জন। আমরা এই পদ্ধতিকে ‘হাইব্রিড নিউরোসার্জারি’ বলি। অর্থাৎ রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী কখনও ওপেন সার্জারি, কখনও এন্ডোভাসকুলার চিকিৎসা, আবার কখনও দুটি পদ্ধতি একসঙ্গে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়।’
‘মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে আগে গ্লু বা এমবোলাইজেশন করে পরে অস্ত্রোপচার করা হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে শুধুই স্টেন্ট, কয়েল বা এমবোলাইজেশনেই যথেষ্ট হয়। প্রতিটি রোগীর জন্য চিকিৎসা আলাদাভাবে পরিকল্পনা করা হয়।’
উপস্থাপনায় জায়গা পেল যেসব অস্ত্রোপচার
সভায় দুটি অ্যানিউরিজমের অস্ত্রোপচারে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া এন্ডোস্কোপের মাধ্যমে ছোট ছিদ্র করে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ অপসারণের একটি এবং মস্তিষ্কের ভেনাস সাইনাস ব্লক হয়ে গেলে যে জটিলতা হয়, তার চিকিৎসায় স্টেন্টিংয়ের (রিং স্থাপন) কয়েকটি কেসও দেখানো হয়েছে। সবশেষে একটি বাইপাস সার্জারির কেস দেখানো হয়েছে। এতে স্ট্রোকের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া রক্তনালীর পরিবর্তে ১-২ মিলিমিটার ব্যাসের একটি ক্ষুদ্র রক্তনালী অন্য একটি রক্তনালীর সঙ্গে যুক্ত করে রক্তপ্রবাহ পুনঃস্থাপন করা হয়।
বিশ্বমানের কাছাকাছি বাংলাদেশ, চ্যালেঞ্জ যন্ত্রপাতির সংকট
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের ব্রেইন অ্যান্ড স্পাইন সার্জন ডা. মো. রাশিক আলভী বলেন, বাংলাদেশের নিউরোভাসকুলার নিউরোসার্জারি বর্তমানে বিশ্বমানের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এ ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির স্বল্পতা। অনেক উন্নত ডিভাইস, যেমন—ফ্লো ডাইভার্টার, দেশে সহজলভ্য নয়। এগুলো বিদেশ থেকে আনতে হয়। এ ছাড়া এর দাম অনেক বেশি হওয়ায় অনেক রোগীর পক্ষে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না।
রাষ্ট্রের কাছে চিকিৎসকদের প্রত্যাশা
এ চিকিৎসা এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের প্রত্যাশা তুলে ধরে ডা. আলভী বলেন, বিদেশের উন্নত কেন্দ্রে সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে সরকারি হাসপাতালগুলোতে উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
‘এ ছাড়া দরিদ্র রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহে সরকারি সহায়তা দরকার। প্রতিবছর কত রোগীর এ ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন, তার ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে সরঞ্জাম সরবরাহ করা হলে অনেক রোগী উপকৃত হবেন। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালও এ ধরনের চিকিৎসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে, তবে ব্যয় বহন করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না’—বলেন তিনি।
অস্ত্রোপচারের সংখ্যা দ্বিগুণ করা সম্ভব
প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে চিকিৎসার পরিধি সন্তোষজনকভাবে বেড়ে যাবে জানিয়ে অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে শুধু ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৫-২০টি মস্তিষ্কের ওপেন সার্জারি এবং ১৫-২০টি এন্ডোভাসকুলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ঢাকায় সপ্তাহে প্রায় ৫০-৬০টি এ ধরনের অস্ত্রোপচার হয়।
যথাযথ সহায়তা পেলে এই সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব বলে জানান নিউরোসার্জনরা।
সরকারি-বেসরকারি ব্যয়ের পার্থক্য
সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয়ের পার্থক্য তুলে ধরে চিকিৎসকরা বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের ফি নেওয়া হয় না। রোগীকে মূলত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির খরচ বহন করতে হয়।
অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে বেড, অপারেশন থিয়েটার, চিকিৎসক, অক্সিজেনসহ বিভিন্ন সেবার অতিরিক্ত খরচ থাকে। ফলে ব্যয় অনেক বেশি হয়। তবে অনেক রোগীর জন্য শুধু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির মূল্যই বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রয়োজন দক্ষ জনবল ও উন্নত প্রশিক্ষণ
নিউরোসাইন্স হাসপাতালে ১০০ শয্যার স্ট্রোক সেন্টার রয়েছে জানিয়ে বক্তারা বলেন, মস্তিষ্কের চিকিৎসায় এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হলো দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি উন্নত প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেই দক্ষতা সরকারি হাসপাতালেই কাজে লাগানো যায়, যার সরাসরি সুফল ভোগী হবেন রোগীরা।
দেশে নিউরোসার্জনের সংখ্যা
সভায় জানানো হয়, বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০০ জন নিউরোসার্জন রয়েছেন। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য এই সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সার্জারির সংখ্যা দেড় থেকে দুই গুণ পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে জনসংখ্যার বিপরীতে সার্জনের সংখ্যা আরও বেশি প্রয়োজন উল্লেখ করা বলা হয়, এশিয়ার দেশ জাপানে প্রায় প্রতি ১৭ হাজার মানুষের সেবার জন্য একজন নিউরোসার্জন আছেন।
অনুষ্ঠানে সফল সার্জারিগুলোর সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন ডা. মো. রাশিক আলভী, ডা. তানভীর সিদ্দিকী, ডা. মোহাম্মদ ইশরাক আতাহার, ডা. জুবায়ের আহমেদ, ডা. রেশমা আক্তার ঝুমা, ডা. তারিকুল ইসলমা, ডা. শিখা।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডা. রেশমা আক্তার ঝুমা ও ডা. নাজমুল।
এমইউ/