২২ জুলাই, ২০২৬ ০৬:৫৩ পিএম

এআইভিত্তিক চেম্বার অপারেটিং সিস্টেম উদ্ভাবন মেডিকেল শিক্ষার্থীর, ৩০ সেকেন্ডেই প্রেসক্রিপশন

এআইভিত্তিক চেম্বার অপারেটিং সিস্টেম উদ্ভাবন মেডিকেল শিক্ষার্থীর, ৩০ সেকেন্ডেই প্রেসক্রিপশন
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা চান চিকিৎসকের একটু মনোযোগ, কিন্তু সক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ও প্রেসক্রিপশন লেখায় সময়ক্ষেপণের কারণে সেই চাওয়া অধরাই থেকে যায়। সেকেলে এই ব্যবস্থার ঘূর্ণাবর্তে আটকা পড়ে ব্যাহত হচ্ছে রোগীকে পর্যাপ্ত সময়দানের কাঙিক্ষত বিষয়।

দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধানে স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রযুক্তিগত বিপ্লব আনার অনন্য প্রয়াস চালিয়েছেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাফি ইবনে দেলোয়ার। দৈনন্দিন চিকিৎসাসেবার নানা প্রতিবন্ধকতা কাটাতে তিনি তৈরি করেছেন অভাবনীয় অ্যাপস কেয়ারস্ক্রিপ্টআরএক্স (CareScriptRx) যেটি একটি এআই-পাওয়ার্ড চেম্বার অপারেটিং সিস্টেম।

আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) মেডিভয়েসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন এই প্ল্যাটফর্মটির পথচলা, কারিগরি দিক ও সুযোগ-সুবিধাসহ ভবিষ্যৎ ভাবনার নানা দিক।

এআই সিস্টেম তৈরির চিন্তা যেভাবে এলো

সোহরাওয়ার্দীর শিক্ষার্থী নাফি ইবনে দেলোয়ার বলেন, ‘প্রোগ্রামিং আমার কাছে একদম নতুন কিছু ছিল না। নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থাতেই আমার প্রোগ্রামিংয়ের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের করোনা মহামারীর সময় যখন অনলাইন ক্লাস করতাম, তখন নিজের একটি অনলাইন টিচিং প্ল্যাটফর্ম তৈরির ইচ্ছা জাগে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সে সময় অনলাইন ক্লাসের জনপ্রিয় মাধ্যম ‘জুম’র পেইড সার্ভিস কেনা সম্ভব ছিল না। তখন ভাবলাম, আমার নিজের জন্য একটি জুম অ্যাকাউন্ট তৈরি করলে কেমন হয়?’

‘সেই ভাবনা থেকেই প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ পাইথন শেখা শুরু, যা পরে আমাকে এইচটিএমএল, সিএসএস, জাভাস্ক্রিপ্ট, নোড.জেএস এবং রিয়্যাক্ট.জেএস’র মতো প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলে। উচ্চমাধ্যমিকে আমি নটর ডেম ইনফরমেশন টেকনোলজি ক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি’—বলেন তিনি। 

নাফি বলেন, ‘এদিকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকদের দৈনন্দিন কাজের চাপ দেখে যখন স্ক্রিপ্টআরএক্স’র চিন্তা আসে, তখন তা আমার জন্য নতুন ছিল না। পূর্বের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা ও মেডিকেলের বাস্তব সমস্যা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই এটির জন্ম।’

কেয়ারস্ক্রিপ্টআরএক্স তৈরিতে যে বিষয় প্রেরণা জোগায়

তিনি বলেন, ‘মেডিকেল লাইফ সত্যিই উপভোগ্য। এক্সামের প্রেশার থাকলেও মানুষের জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে পড়া আর ডিসেকশন দেখার অভিজ্ঞতা বেশ উপভোগ্যই ছিল। মেডিকেল লাইফের পাশাপাশি বিভিন্ন মেডিকেল গ্রুপ ও চিকিৎসকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে একটি বিষয় চোখে পড়ে—চিকিৎসকদের দৈনন্দিন নানা চ্যালেঞ্জ। পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে রোগীর সেবা করা। কিন্তু সেকেলে পদ্ধতি, অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে কাজের গতি কমে যায়।’

এই অ্যাপসের ফলে ডাক্তারের সময় বাঁচানো ও রোগীকে পর্যাপ্ত সময়দান নিশ্চিত হবে জানিয়ে এই মেডিকেল শিক্ষার্থী বলেন, ‘রোগীদের একটা সাধারণ অভিযোগ থাকে—‘ডাক্তার শুধু মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর প্রেসক্রিপশন লেখেন, কথা বলেন না। কিন্তু বাস্তবেই একজন চিকিৎসককে একই সাথে তথ্য নিতে হয়, পুরোনো রেকর্ড দেখতে হয় ও ওষুধ বেছে নিয়ে লিখতে করতে হয়। তখন আমার মনে হলো, এমন একটি এআইভিত্তিক সিস্টেম প্রয়োজন, যা ভয়েস কম্যান্ড (মৌখিক নির্দেশনা) নিয়ে মুহূর্তেই ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন তৈরি করবে, পরে পরামর্শ দেবে এবং পুরোনো তথ্য পুনরায় ব্যহারের সুবিধা দেবে। এতে ডাক্তারের সময় বাঁচবে এবং তিনি রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারবেন।’

কেয়ারস্ক্রিপ্টআরএক্স তৈরিতে সহযোগী ছিল কিনা?

তিনি বলেন, ‘সিস্টেম ডিজাইন, ডাটাবেজ, ইউজার ইন্টারফেস ও ডেভেলপমেন্ট—পুরোটাই আমার একক প্রচেষ্টায় করা। তবে এটি যেহেতু একটি স্বাস্থ্যসেবার প্ল্যাটফর্ম, তাই চিকিৎসকদের মতামত ও পর্যালোচনা ছাড়া এটি পূর্ণাঙ্গ হওয়া সম্ভব ছিল না। তাই আমি অনেক চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করে তাদের চেম্বারের কর্মপ্রবাহ বুঝে ফিচার ডেভেলপ করেছি। বিশেষ করে ড. শেখ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল রাফি ভাই দারুণ কিছু ফিডব্যাক দিয়েছেন। যেমন রোগীর বিভিন্ন পরিদর্শনের তথ্য একসাথে বিশ্লেষণ করা এবং ড্রাফটিং সিস্টেম তৈরি করা।'

কেয়ারস্ক্রিপ্টআরএক্স’র ফিচারসমূহ

এটি একটি এআই-পাওয়ার্ড প্রেসক্রিপশন ও কমপ্লিট চেম্বার অপারেটিং প্ল্যাটফর্ম। এর প্রধান ফিচারগুলোর মধ্যে রয়েছে—

ভয়েস-বেসড ইনপুট

যেটি ডাক্তারের মুখের কথায় রোগীর প্রধান অভিযোগ, রোগের ইতিহাস, রোগ নির্ণয় বা ওষুধের নাম বললেই এআই তা ফরম্যাট করে সাজিয়ে দেয়।

ডুয়াল প্রিভিয়াস প্রেসক্রিপশন অটো-রিইউজ

এর মূল কাজ হলো, পুরোনো প্রেসক্রিপশনের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন প্রেসক্রিপশনে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা। এ ছাড়া এটি সম্পূর্ণ ডাক্তার-নির্দিষ্ট হওয়ায় তথ্য গোপনীয়তা বজায় থাকে এবং পরবর্তী ভিজিটে এক ক্লিকেই আগের তথ্য ও ওষুধ লোড করে প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করা যায়।

স্মার্ট মেডিসিন ডাটাবেজে

এখানে বাংলাদেশের ১৫ হাজারের বেশি ব্র্যান্ড ও জেনেরিক ওষুধের ডাটাবেজ রয়েছে। তবুও নির্দিষ্ট ওষুধ না পাওয়া গেলে কাস্টম ওষুধ যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

সিরিয়াল, শিডিউল ও বিলিং ম্যানেজমেন্ট

এটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট, চেম্বার শিডিউল এবং ইনকাম রিপোর্ট (জমা বিবরণী) একসাথে পরিচালনার সুবিধা দেয়। প্রিসেট ও টেমপ্লেট সাপোর্ট— এতে নিয়মিত ব্যবহৃত ওষুধ, পরীক্ষা বা উপদেশগুলো এক ক্লিকেই প্রেসক্রিপশনে যুক্ত করার প্রিসেট ব্যবস্থা রয়েছে।

সবচেয়ে ব্যবহৃত ফিচার হলো এআই-চালিত প্রেসক্রিপশন তৈরি, ভয়েস ইনপুট এবং স্বয়ংক্রিয় পুনঃব্যবহার সিস্টেম। কারণ এগুলো প্রেসক্রিপশন লেখার সময় অবিশ্বাস্যভাবে কমিয়ে মাত্র ৩০ সেকেন্ডে নামিয়ে আনে!

প্রেসক্রিপশন ও রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য গোপন 

স্বাস্থ্যগত তথ্য বা হেলথ ডাটা অত্যন্ত সংবেদনশীল। কেয়ারস্ক্রিপ্টআরএক্স-এ ইউজার অথেন্টিকেশন, সিকিউর ডাটাবেজ ম্যানেজমেন্ট এবং কঠোর এক্সেস কন্ট্রোল ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি ডাক্তারের তথ্য আলাদা ও সংরক্ষিত থাকায় অন্য কেউ রোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য দেখতে পারবে না।

কেয়ারস্ক্রিপ্টআরএক্স’র চ্যালেঞ্জগুলো কী কী

নাফি বলেন, ‘এর প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের পরিবর্তন আনা। চিকিৎসকরা দীর্ঘদিন যে চিরাচরিত পদ্ধতিতে প্রেসক্রিপশন লিখে অভ্যস্ত, সেখান থেকে নতুন প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হতে কিছুটা দ্বিধা থাকে। এজন্য ডেমো সেশন ও ট্রেইনিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টিকে সহজ করার চেষ্টা করছি।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

তিনি বলেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে আমার পরিকল্পনা হলো এআই-পাওয়ার্ড চেম্বার অপারেটিং সিস্টেম কেয়ারস্ক্রিপ্টআরএক্সকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ইকোসিস্টেম’ হিসেবে গড়ে তোলা। পাশাপাশি উন্নত এআই অ্যানালিটিক্স এবং অটোমেশন যুক্ত করে দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই আমার লক্ষ্য।’

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা

‘প্রথমত, নিজের মূল ক্ষেত্রের জ্ঞানকে শক্ত করতে হবে। প্রযুক্তি শেখা মানে নিজের পেশাকে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং নিজের ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করার একটি মাধ্যম। মেডিকেলের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মনে হয়, পড়াশোনার পাশাপাশি যে অবসর সময় থাকে, সেখানে নিজের আগ্রহ অনুযায়ী প্রোগ্রামিং, গবেষণা বা উদ্ভাবনী কোনো কাজে যুক্ত হওয়া ইতিবাচক। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়। সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নিজের লক্ষ্য ও পছন্দ অনুযায়ী’—বলেন তিনি। 

তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু প্রযুক্তি শেখার জন্য নয়, বরং নিজের ক্ষেত্রের একটি বাস্তব সমস্যা খুঁজে সমাধান করাই আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। বর্তমানে এআই’র মাধ্যমে ভাইব কোডিং তৈরির বিষয়টি জনপ্রিয় হলেও, প্রোগ্রামিংয়ের মৌলিক ধারণা ছাড়া নির্ভরযোগ্য প্রজেক্ট তৈরি করা কঠিন। প্রথমে সমস্যাটি বুঝতে হবে, সেটিকে ফিচার হিসেবে সাজাতে হবে এবং তারপর এআইকে একটি টুল হিসেবে ব্যবহার করে সমাধান তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি যখন মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান করে, তখনই সেটির প্রকৃত মূল্য তৈরি হয়।’

‘এ ছাড়া বাংলাদেশে মেডিকেল সেক্টরে আরও বেশি রিসার্চ কালচার তৈরি হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে হেলথকেয়ার ডেটা, রোগের ধরন এবং মেডিকেল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার বিশাল সুযোগ রয়েছে। মেডিকেল শিক্ষার্থী, চিকিৎসক ও প্রযুক্তিবিদরা একসঙ্গে কাজ করলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। আর এই নতুন দিনের স্বাস্থ্যসেবা গঠনে তরুণদের ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

জেএইচ/এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : উদ্ভাবন
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত