ডা. মুনিম রেজা
সহকারী অধ্যাপক, মানসিক রোগ ও মাদকাসক্তি বিভাগ, এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।
২০ জুলাই, ২০২৬ ০৬:৪২ পিএম
মানসিক হাসপাতালকে কেন ‘পাগলা গারদ’ বলা যাবে না?
সম্প্রতি দেশের একটি মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘পাগলা গারদে সারজিস আলমকে গান গেয়ে শোনালেন রোগী।’ এই ধরনের শিরোনাম শুধু ভাষাগতভাবে অনুপযুক্তই নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের প্রতি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকেও আরও শক্তিশালী করে।
প্রশ্ন হলো, মানসিক হাসপাতালকে কি ‘পাগলা গারদ’ বলা উচিত? উত্তর এক কথায়—না।
কেন বলা যাবে না
‘গারদ’ শব্দের অর্থ বন্দিশালা। আর এর সঙ্গে ‘পাগলা’ শব্দটি যুক্ত হলে এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে, সেখানে থাকা মানুষগুলো বিপজ্জনক, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার মতো ব্যক্তি। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানসিক হাসপাতালে রোগীরা বন্দি হিসেবে থাকেন না। সেখানে রোগীরা চিকিৎসার অংশ হিসেবেই সেখানে ভর্তি থাকেন। শারীরিক রোগের মতোই মানসিক রোগেরও কখনো কখনো হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হয়। চিকিৎসা শেষে অধিকাংশ রোগী আবার স্বাভাবিক জীবনেই ফিরে যান।
কিন্তু যখন আমরা কোনো মানসিক হাসপাতালকে ‘পাগলা গারদ’ বলে উল্লেখ করি, তখন সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীরা মারাত্মকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হন। শুধু তারাই নন, তাদের পরিবার ও স্বজনদেরও সামাজিক লজ্জা ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। একই সঙ্গে যেসব মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন কিন্তু এখনো চিকিৎসা শুরু করেননি, তারাও লজ্জা ও সামাজিক ভয়ের কারণে চিকিৎসকের কাছে যেতে অনীহা বোধ করেন।
এমনকি যখন কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি রাখার প্রয়োজন হয়, তখন অনেক পরিবার অস্বস্তিতে পড়ে যান। তারা আশঙ্কা করেন, সমাজ তাদের কীভাবে দেখবে। এর ফলে অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিলম্বিত করেন বা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, যা রোগীর জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে।
কোন শব্দ ব্যবহার করা প্রয়োজন
সংবাদমাধ্যমসহ আমাদের সবার ভাষা ব্যবহারে আরও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি। ‘পাগলা গারদ’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘মানসিক হাসপাতাল’, ‘মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র’ বা ‘মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্র’ -এ ধরনের যথাযথ ও সম্মানজনক শব্দ ব্যবহার করা উচিত। শুধু একটি শব্দ পরিবর্তনের মাধ্যমেই আমরা অসংখ্য রোগীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারি এবং তাদের চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারি।
যেসব কাজ করা উচিত না
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানসিক রোগীদের ভিডিও, ছবি বা আচরণ নিয়ে বিভিন্ন কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই সেগুলো দেখে হাস্যরসের উপাদান খুঁজে পান, কিন্তু রোগী ও তার পরিবারের জন্য এগুলো অত্যন্ত বেদনা, কষ্টদায়ক ও অপমানজনক।
মানসিক রোগের কারণে একজন ব্যক্তি কখনো কখনো এমন কিছু আচরণ করতে পারেন, যা তার স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি তার ইচ্ছাকৃত আচরণ নয়, এটি একটি রোগের লক্ষণ। তাই এসব ভিডিও ধারণ করা, অনুমতি ছাড়া প্রচার করা কিংবা তা নিয়ে হাস্যরস সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মানসিক চিকিৎসায় বাধা
এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানসিক রোগীদের আরও বেশি সামাজিক কলঙ্কের (স্টিগমা) মুখে ঠেলে দেয়। যার ফলে তারা চিকিৎসা নিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন, চিকিৎসকের কাছে যেতে চান না। এমনকি প্রয়োজন হলেও হাসপাতালে ভর্তি হতে ভয় পান।
এখানে একটি আইনগত ও নৈতিক বিষয়ও রয়েছে। কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তার ভিডিও ধারণ ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার লঙ্ঘন। যারা এসব কনটেন্ট শেয়ার করেন বা ছড়িয়ে দেন, তারাও অনিচ্ছাকৃতভাবে সেই অধিকার লঙ্ঘনের অংশীদার হয়ে যান।
তাই শুধুমাত্র গণমাধ্যম নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী প্রত্যেকেরই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থারও উচিত এ ধরনের অনৈতিক কনটেন্ট প্রচার নিরুৎসাহিত করা।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
আমি ব্যক্তিগতভাবে বহু পরিবারকে দেখেছি, যারা রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি রাখার পরামর্শ শুনে অস্বস্তিতে পড়েন। তাদের আশঙ্কা থাকে, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর মতো তাদের স্বজনকেও কি অপমানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে? এই ভয় অনেক সময় চিকিৎসার পথেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সকলের প্রতি আহ্বান
আমাদের মনে রাখতে হবে, মানসিক রোগও অন্য সব রোগের মতোই একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা। একজন রোগীর অসুস্থতাজনিত আচরণ কখনোই হাস্যরসের উপাদান হতে পারে না। বরং তাদের প্রতি সহানুভূতি, সম্মান এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিই হওয়া উচিত আমাদের পরিচয়।
এমআই/