০৯ জুলাই, ২০২৬ ০৫:২৫ পিএম

ডেঙ্গু নির্মূলে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বেশি কার্যকর: ড্যাব মহাসচিব

ডেঙ্গু নির্মূলে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বেশি কার্যকর: ড্যাব মহাসচিব
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিকিৎসার চেয়ে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেই সবচেয়ে কার্যকর বলে মত দিয়েছেন বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (বিএমআরসি) ভাইস-চেয়ারম্যান ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল। তিনি বলেন, এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ, বাসাবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণের মাধ্যমে ডেঙ্গুর সংক্রমণ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ কাজে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

‎আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সরকারি তিতুমীর কলেজ ‎সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে ডেঙ্গু এবং হাম প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি বিষয়ক এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। স্বাস্থ্য সচেতনতায় শিক্ষার্থীদের ভূমিকা শীর্ষক সভার আয়োজন করে তিতুমীর কলেজ সাংবাদিক সমিতি।

ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, সরকার স্বাস্থ্য সচেতনায় এই খাতে সর্বোচ্চ বাজেট প্রদান করেছে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য খাতে এই প্রথম ১.০১ শতাংশ জিডিপি বরাদ্দ দিয়েছে, যার পরিমাণ ৬৯ হাজার কোটি টাকা।

বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রতিরোধমূলক ধারণাকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর লক্ষ্য হলো—রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়া, অর্থাৎ ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’ নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া।

বিএমআরসি ভাইস-চেয়ারম্যান বলেন, ডেঙ্গুর মৌসুমকে সামনে রেখে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গুও এমন একটি রোগ, যা সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বাংলাদেশে কলেরা ভয়াবহতার ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা কম থাকায় রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ত। তবে নিরাপদ পানির ব্যবহার, পানি ফুটিয়ে পান করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস গড়ে ওঠায় বর্তমানে কলেরার প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। 

তিনি আরও বলেন, কলেরা হলে শরীর থেকে পানি চলে যায়, লবণ চলে যায়। এখন কলেরার আর ওই রকম চিকিৎসা লাগে না। শুধু একটা স্যালাইন খেলেই কলেরা রোগ থেকে সুরক্ষা মিলে। 

কলেরার মতোই জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে ডেঙ্গুর সংক্রমণও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে জানান ডা. শাকিল। বলেন, ‘আমরা যদি মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি, পরিবারকে রক্ষা করতে পারি, তাহলেই ডেঙ্গু হবে না। আর ডেঙ্গু হলে যে প্রতিক্রিয়াগুলো দেখা দেয়, সেগুলা একটা মারাত্মক প্রতিক্রিয়া। মানুষ মারা যায়, প্লাটিলেট কমে যায়, রক্ত বমি হয় এবং এক পর্যায়ে রোগী মারা যায়।’

জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়। দিনের বেলায় সক্রিয় থাকায় শিশু, শিক্ষার্থী এবং দিনের বেলায় বাসাবাড়িতে অবস্থান করা বয়স্ক ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

বর্ষাকালে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডিম পেড়ে এডিস মশা বংশ বিস্তার করে। ডিম থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন মশা জন্ম নেয়। তাই অন্তত তিন দিন পরপর জমে থাকা পানি অপসারণ প্রয়োজন। বাসাবাড়ির ড্রেন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) পানি, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ারসহ যেসব স্থানে পানি জমে থাকতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। একই সঙ্গে ডাবের খোসা, আইসক্রিমের কাপসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলে যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে, যাতে সেখানে পানি জমে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ না তৈরি হয়।

ড্যাব মহাসচিব  বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর ওই মশা অন্য কাউকে কামড়ালে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এসব শ্রেণির মানুষের সুরক্ষায় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

বাসাবাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দিলে এডিস মশার বংশবিস্তার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

‎শিক্ষার্থীর দিক থেকে তিতুমীর কলেজ অনেক বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উল্লেখ্য করে তিনি আরও বলেন, তিতুমীর আয়তনে ছোট হলেও এখানে অনেক বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। শিক্ষার্থীরা যদি পরিবার থেকে সচেতন হন, তাহলে ডেঙ্গু নিয়ত্রণে চলে আসবে।

এ বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ড্যাব মহাসচিব বলেন, এক সময় ঢাকা শহরের অনেক খাল দখল ও বর্জ্যে ভরাট হয়ে থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো। সরকার খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিষ্কারে কাজ করলেও টানা বৃষ্টির সময়ে এখনো কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। তাই শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, জনসচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সচেতনতা সৃষ্টিতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি। বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইমাম ও খতিবরা তাদের বক্তব্যে পরিচ্ছন্নতা ও জমে থাকা পানি অপসারণের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করলে তা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

পরিচ্ছন্নতা ধর্মীয় শিক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

সভায় ঢাকা মহানগর উত্তরের যুবদলের আহ্বায়ক শরিফউদ্দিন জুয়েল বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে সরকার গঠনের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে আমরা ডেঙ্গু প্রতিরোধে কাজ করছি। মানুষের জন্য আমাদের পরিশ্রম অব্যহত রাখতে প্রস্তুত।’

‎সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি রফিকুল ইসলাম রলি বলেন, ডেঙ্গু সচেতনতা শিক্ষার্থীদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে ডেঙ্গু রোধ করা আমাদের জন্য সহজ হবে। আগামীতে ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণের শঙ্কা থাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে নানান উগ্যোগ নিয়েছেন। তারও অংশ হিসেবে ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটিতে ব্যাপক কাজের উদ্যাগ নিয়েছেন এবং কিছু দৃশ্যমান কাজও করেছেন।

সভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইমাম হোসেন, সদস্য সচিব সেলিম রেজা, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ মোল্লা, যুগ্ন আহ্বায়ক রিমু হোসেন, আবু হুজাইফা রকি, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মো. সোহেল রানা, ছাত্র শক্তির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব লিমন মোল্লা , ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইউনুস আহমেদ, ছাত্র ইউনিয়নের আহ্বায়ক আরাফাত হোসেন তপুসহ অন্যান্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন তিতুমীর কলেজ সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি তাওসিফ মাইমুন, বর্তমান সভাপতি এইচ এম মাহিন, সাধারণ সম্পাদক এইচ এম ইমরান, দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ মজুমদার রাব্বি, অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ মাসুম বিল্লাহ রাব্বি, কার্যনির্বাহী সদস্য শফিক খান, মহি উদ্দিনসহ সাংবাদিক সমিতির সদস্যবৃন্দ।

সভা শেষে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মাঝে ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হয়।

এমইউ/এমআর

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
অনুপস্থিতি ও বেসরকারি হাসপাতালে মালিকানা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত