২৩ জুন, ২০২৬ ১০:৫০ পিএম
প্যারালাইজড রোগীদের অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে বিশিষ্টজনেরা

বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হবে

বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে হবে
স্ট্রোকে প্যারালাইজড রোগীদের অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠান। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ঢাকাকেন্দ্রিক বড় হাসপাতালের শয্যা বাড়ানোর মাধ্যমে নয়, বরং দেশের প্রতিটি বিভাগে বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যাবে। তাই দক্ষ জনবল তৈরি, তাদের তৃণমূলে কাজে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ধাপে ধাপে বিকেন্দ্রীভূত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে রোগীদের জন্য অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা কমানো, বিনামূল্যে ওষুধপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করাও অপরিহার্য।

আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স (নিন্স) ও হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে স্ট্রোকে প্যারালাইজড রোগীদের অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বিশিষ্টজনেরা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেসের (নিন্স) সক্ষমতা ৫০০ শয্যা থেকে ১০০০ বা ২০০০ করলেই কি লক্ষ্য অর্জিত হবে? কখনোই না। মনে রাখতে হবে, এটাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। আপনি খালি ঢাকা মেডিকেল কলেজকে ৫০০০ শয্যার হাসপাতাল বানালেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হবে না। বরং অগ্রগতিটা তখনই হবে যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের মতো আরও ১০টা মেডিকেল কলেজ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় এবং নিন্সের মতো আরও প্রতিষ্ঠান প্রত্যেক বিভাগে হবে। এটা মানুষের দোরগোড়ায় হতে হবে এবং সাশ্রয়ী মূল্যের হতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আপনাদের দায়িত্ব হচ্ছে এখানে লোক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তাদেরকে তৃণমূলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অথবা বিভাগীয় পর্যায়ে অন্য মেডিকেল কলেজে গিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করা। পাশাপাশি সেখানে কাজ করার জন্য যে পরিবেশ দরকার সেটা সৃষ্টি করতে কি কি জিনিসপত্র দরকার তাও নিশ্চিত করতে হবে, খালি মানুষ পাঠালে হবে না; তাকে প্রযুক্তিগতভাবে সহায়তা দিতে হবে। আর এ রকম সমন্বিত একটা ব্যবস্থা একদিনেই হবে না। আপনাকে মনে করতে হবে যে, আজকে থেকে শুরু করে আগামী তিন বছরের মধ্যে আমরা এভাবে একটু একটু করে ছড়িয়ে দিতে চাই। কারণ দক্ষতা একদিনে আসে না। পড়াশোনা করে শিক্ষিত হওয়া যায়, কিন্তু দক্ষতা অর্জন করতে হলে বা দক্ষ জনবল তৈরিতে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। অন্যথায় দক্ষতা অর্জিত হয় না। আর দক্ষ না হলে শিক্ষার কোনো লাভ নেই। এটাই আপনাকে মানুষের কাছে তুলে ধরবে—মানে আপনি মানুষের কাছে কতটুকু গ্রহণযোগ্য চিকিৎসক, নার্স বা থেরাপিস্ট হয়ে উঠেছেন।’

এ সময় সেবায় আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে অধ্যাপক জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের ফাইল অর্থাৎ রোগীরা কিন্তু কথা বলে, রোগীরা সেবার মান মূল্যায়ন করতে পারেন—কোন স্যার তাকে কেমন চিকিৎসা দিচ্ছেন, কোন স্যার তার সাথে কেমন ব্যবহার করছেন। কাজেই চিকিৎসকদের মনে রাখতে হবে, তাদের এই দক্ষতা অর্জন করতেই হবে। দক্ষতা অর্জনের পর যখন তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে, তখনই তারা একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে গড়ে উঠবেন।’

তিনি আরও বলেন, একই সাথে চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির ওপর জোর দিতে হবে। যেসব সচেতনতার কারণে রোগীরা অসুস্থতার একদম শেষ পর্যায়ে যাবে না কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হবে না—সেই সমস্ত কার্যক্রম বাড়াতে হবে। মানুষের খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রায় কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন, সে বিষয়েও চিকিৎসকদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে এবং সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এ ব্যাপারে আপনাদের কথা বলতে হবে। চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধ এবং পুনর্বাসন—এই বিষয়গুলোকে মাথায় রেখেই নিন্সকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘... একজন রোগী চান সর্বনিম্ন যে কয়টা ওষুধে তার প্রয়োজন মিটে যায়, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখা হলে তাদের জন্য বোঝা হয়ে যায়। তারা চায়, চিকিৎসার জন্য সর্বনিম্ন যে কয়টা ওষুধ দরকার, সেটা লেখা হলে তার একটু উপকার হয়। তাদের চাওয়া চারটা ওষুধের সবগুলো না হলেও দুইটা যেন সে বিনামূল্যে হাসপাতাল থেকে পায় এবং তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার তালিকাও যেন লম্বা না হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতা গ্রহণের পর আমরা বিভিন্ন হাসপাতালগুলো পরিদর্শনে গিয়েছি, চেষ্টা করছি দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত ডাক্তারদের বঞ্চনার অবসান ঘটাতে, যেন তারা সঠিকভাবে চিকিৎসা পেশায় এগিয়ে যেতে পারেন। আমরা গত চার মাসে অনেক ডাক্তারের পদায়নের ব্যবস্থা করতে পেরেছি, যারা পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন।’

‘একই সাথে এই হাসপাতালগুলোতে একজন রোগী গেলে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হন, যার অনেক কিছুই হয়তো চিকিৎসক হিসেবে আমাদের হাতে নেই; কিন্তু যেহেতু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে আমরা চিকিৎসকরা থাকি, তাই মানুষের প্রত্যাশা কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডাক্তারদের কাছেই চলে আসে।’

তিনি বলেন, একজন রোগী মোটা দাগে স্বাস্থ্য খাতে চার-পাঁচটা সমস্যা দেখতে পায় এবং সেই সমস্যাগুলো দূর হলেই সে খুশি। হাসপাতালের সামনে দালাল, মানুষের ভিড় এবং হট্টগোল এবং অন্যদের হাতে যে নাজেহাল হতে হয়—এটা থেকে রোগীরা পরিত্রাণ চায়। তারা চায় হাসপাতালে পৌঁছালে সে অসুখটা নিয়ে একজন ডাক্তারের মুখোমুখি হতে পারবে এবং সঠিক চিকিৎসা পাবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা মানুষের সাথে কথা বলে জেনেছি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এই পরিবর্তনগুলো সে তার চোখে দেখতে চায়। এইগুলো শুনতে ছোট হলেও দীর্ঘ দিনের এসব অব্যবস্থাপনা বিশাল এবং জটিল। আউটসোর্সিং ব্যবস্থার কারণে বর্তমানে হাসপাতালগুলোর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এই সমস্যা দূর করতে সংশ্লিষ্ট নীতিমালায় সংস্কার আনা অথবা নতুন করে নীতি নির্ধারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। আমাদের হাসপাতালগুলোতে অনেক সময়ই দেখা যায়, যিনি শীর্ষ দায়িত্বে আছেন, তিনি হয়তো ক্লিনেশিয়ান হিসেবে খুব ভালো কিন্তু একজন পরিচালক হিসেবে বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নানা কারণে হয়তো সেটা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। আমরা চেষ্টা করছি, এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করতে।’

নিন্সে ক্লিনিক্যাল রিসার্চের সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে এ ব্যাপারে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের প্রতি দিন একটু করে সময় প্রদানের অনুরোধ করেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী।

একই সঙ্গে নিন্সের নিউরো ডেভেলপমেন্টাল সেন্টার আরও সমৃদ্ধ করার আহ্বান জানিয়ে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিয়ে পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান খান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স ও হাসপাতালের সমাজসেবা কার্যালয়ের সমাজসেবা অফিসার মো. মজিবুর রহমান।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত