স্বাস্থ্যখাতে প্রায় ৭৭ হাজার পদ খালি: ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্বাস্থ্যখাতে প্রায় ৭৭ হাজার সরকারি পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে বলে জানিয়েছেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ। স্বাস্থ্যের মূল সংকট চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ডাক্তার ও নার্স তৈরির জন্য মেডিকেল ও নার্সিং প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা অনেক কম। সরকারি হিসাবের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, দেশে বিপুলসংখ্যক ডাক্তার কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে অনেকেই কর্মস্থলে নেই।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এনডিএফ আয়োজিত ‘জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেট ২০২৬’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ বলেন, সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বিপুলসংখ্যক ডাক্তার কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে অনেকেই কর্মস্থলে নেই। আবার স্বাস্থ্যখাতে প্রায় ৭৭ হাজার সরকারি পদ দীর্ঘদিন খালি পড়ে আছে। এর অর্থ এই নয় যে সরকার অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে না; বরং বড় সমস্যা হলো প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ জনবল তৈরি করতে না পারা। তাই স্বাস্থ্যখাতের মূল সংকট চিহ্নিত করে পরিকল্পিতভাবে সমাধানের দিকে এগোতে হবে। বর্তমানে দেশে ডাক্তার ও নার্স তৈরির জন্য মেডিকেল ও নার্সিং প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ থাকলেও সেই সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে নতুন পদ সৃষ্টি হলেও তা পূরণের মতো পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল পাওয়া যাচ্ছে না। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে আরও বেশি ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করতে হবে।
ডা. ফরিদ বলেন, বিদেশে দক্ষ জনবল রপ্তানিও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। বাংলাদেশে অদক্ষ শ্রমিক বিদেশে গিয়ে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেন, একজন প্রশিক্ষিত নার্স তার চেয়ে ১০-২০ গুণ বেশি আয় করতে সক্ষম। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কিছু নীতিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তারপরও শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান এ ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। তারা সরকারিভাবে নার্সদের উন্নত দেশে ৩ বছরের চুক্তিতে পাঠায়। সেখানে নার্সরা কাজের পাশাপাশি প্রশিক্ষণও পান। চুক্তি শেষে অনেকে দেশে ফিরে এসে স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কাজ করেন। বাংলাদেশও শ্রম মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এমন উদ্যোগ নিতে পারে। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশে দক্ষ নার্সের ঘাটতিও কমবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে বাজেটের স্বল্পতা। দ্বিতীয়ত, জনবল সংকট। তৃতীয় বড় সমস্যা হলো জনগণের ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার’—অর্থাৎ নিজের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা। আর চতুর্থ সমস্যা হলো, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকৃত বিপুল অর্থ প্রতিবছর ব্যয় না হয়ে ফেরত চলে যাওয়া। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ প্রতি বছর অব্যবহৃত থেকে যায়। এই চারটি সমস্যার সমাধান নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, প্রথমত স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট জিডিপির প্রায় ০.২৭ শতাংশের মতো, যা আশপাশের দেশগুলোর তুলনায়ও অনেক কম। উন্নত দেশের উদাহরণ বাদ দিলেও ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ কিংবা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৩-৪ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করে থাকে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) তৃতীয় লক্ষ্য হলো, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অঙ্গীকার রয়েছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই লক্ষ্যের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি।
এক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের মধ্যে যুক্তরাজ্যের উদাহরণ দিয়ে ডা. মোসলেহ উদ্দীন ফরিদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট যেখানে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলার, সেখানে যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বাজেট প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি, আর যুক্তরাজ্যের মাত্র ছয় কোটি। অর্থাৎ জনসংখ্যার তুলনায় তাদের স্বাস্থ্য বাজেট বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৩০০ গুণ বেশি। তবে এই উদাহরণ দেওয়ার উদ্দেশ্য এই নয় যে বাংলাদেশকেও একই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যুক্তরাজ্যও একসময় আজকের বাংলাদেশের মতো নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। গত ৩০-৩৫ বছরে তারা ধাপে ধাপে গবেষণা, পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান করেছে। তাদের বড় সুবিধা ছিল পর্যাপ্ত বাজেট, যার মাধ্যমে তারা স্বাস্থ্যখাতে ব্যাপক গবেষণা করতে পেরেছে। সেই গবেষণার ফলাফল এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হতে পারে। বাংলাদেশ চাইলে নতুন করে সব গবেষণা না করে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সফল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে সীমিত সম্পদের মধ্যেও স্বাস্থ্যখাতের সমস্যা সমাধান করেছে, সেই অভিজ্ঞতাগুলো বিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো জনবল সংকট জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) একটি ন্যূনতম মানদণ্ড রয়েছে—প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে অবস্থান করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে মাত্র প্রায় ৫ জন নার্স রয়েছে, যেখানে মালয়েশিয়ায় এই সংখ্যা প্রায় ১০০ এবং যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে ১২০-এরও বেশি।
এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদাহরণ হিসেবে উগান্ডার কথা বলা যায়। তারা স্থানীয় জনগণকে নিজ নিজ এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এতে কর্মীরা নিজ এলাকায় স্থায়ীভাবে কাজ করতে আগ্রহী হয়েছে। বাংলাদেশেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। কারণ কক্সবাজার বা চট্টগ্রামের একজন মানুষকে সুন্দরবন এলাকায় চাকরি দিলে তিনি দীর্ঘমেয়াদে সেখানে থাকতে চান না। তাই স্থানীয়ভাবে জনবল নিয়োগ দিলে স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর হবে।
অনুষ্ঠানের মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামের সেক্রেটারি, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ডা. মিজানুর রহমান। তাঁর গবেষণাভিত্তিক উপস্থাপনায় বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ২-২.৪ শতাংশ, যেখানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ ন্যূনতম ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে দেশের মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সুপারিশ
গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্যখাত সংস্কার ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে, স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির অন্তত ৪-৫ শতাংশে উন্নীত করা; জেলা পর্যায়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ), ডায়ালাইসিস, ক্যান্সার ও হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র সম্প্রসারণ; চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ প্রণোদনা প্রদান।
এ ছাড়া ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্যতথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও দূরচিকিৎসা সেবা সম্প্রসারণ, সরকারি হাসপাতালে ওষুধ সরবরাহ বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ব্যয় কমাতে ওষুধ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়নে জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা চালুরও আহ্বান জানান।
সুপারিশে আরও বলা হয়, মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধী স্বাস্থ্যসেবাকে জাতীয় বাজেটে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে ডিজিটাল তদারকি, স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।
শুধু হাসপাতাল বা ভবন নির্মাণ করলেই হবে না উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স ও দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীও নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক চিকিৎসককে বিভিন্ন সংযুক্তির মাধ্যমে জেলা বা শহরে নিয়ে আসা হয়। ফলে গ্রামীণ হাসপাতালগুলোতে জনবল সংকট তৈরি হয়। এ কারণে জনগণ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই চিকিৎসকদের ধরে রাখা এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
তারা বলেন, চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ফ্যাকাল্টি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতের পরিকল্পনা, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য হেলথ একাডেমি ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যখাতের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে পারলে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত হবে বলে মনে করেন বক্তারা।
তারা আরও বলেন, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সেবার গুরুত্ব বাড়ছে। তবে এআই চিকিৎসকের বিকল্প নয়; বরং এটি স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করার একটি সহায়ক মাধ্যম। তাই ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপরও জোর দিতে হবে।
স্বাস্থ্যখাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বৈশ্বিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বিত সম্পর্ক বাড়ানো প্রয়োজন। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার আহ্বান জানান তারা।
বক্তাদের মতে, স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়কে শুধুমাত্র খরচ হিসেবে না দেখে জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কারণ একটি সুস্থ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতার ভিত্তি তৈরি করে।
তারা বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বাস্থ্য মডেল তৈরি করতে হবে এবং ধারাবাহিকভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীল নয়
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও গাইনোকোলজিস্ট ডা. কাজী তাসকিয়া বলেন, একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি, ব্যবস্থাপনা, অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থাও জড়িত। সাধারণ মানুষ মনে করেন ডাক্তারই সব সমস্যার সমাধান করবেন, কিন্তু বাস্তবে হাসপাতালের পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
এ ব্যাপারে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক সময় অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ বা জীবাণুমুক্ত সরঞ্জামের ঘাটতি থাকে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে একজন চিকিৎসকের পক্ষে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই গোড়া থেকে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেক রোগী সরাসরি বড় হাসপাতালগুলোতে চলে আসেন। যদিও তাদের চিকিৎসা জেলা বা উপজেলা পর্যায়েই সম্ভব। এতে বড় হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ তৈরি হয়। এজন্য শক্তিশালী রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একা স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করতে পারবে না বলে মনে করেন ডা. তাসকিয়া। বলেন, এই খাত এগিয়ে নিতে খাদ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে দক্ষ বাজেট পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের আরেকটি বড় সংকট হলো ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার’ বা জনগণের নিজস্ব খরচে চিকিৎসা ব্যয়। বর্তমানে সরকার স্বাস্থ্যখাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করলেও জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হয়। এছাড়া বিদেশে চিকিৎসার জন্য আরও প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। অর্থাৎ স্বাস্থ্যব্যয়ের সবচেয়ে বড় চাপ জনগণের ওপরই পড়ে।
বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। বর্তমানে স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত খরচের হার প্রায় ৭২ শতাংশ, যা অনেকের মতে ৮০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ে। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ গবাদিপশু বিক্রি করেন—শুধু চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য।
এই সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ অনুসরণ করা যেতে পারে। তানজানিয়ায় ৫ বছরের নিচের শিশু, ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এবং গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। অন্যরা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করে। সেই অর্থের একটি অংশ সরকার পায়, একটি অংশ স্থানীয় উন্নয়নে যায় এবং আরেকটি অংশ স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়। ফলে স্বাস্থ্যকর্মীরা ভালো সেবা দিতে উৎসাহিত হন।
ইন্দোনেশিয়ায় জনগণকে আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে এ, বি, সি ও ডি—এই চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা পায়। অন্য শ্রেণিগুলো আংশিক ব্যয় বহন করে। বাংলাদেশেও ফ্যামিলি কার্ড বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে স্বাস্থ্য কার্ড সংযুক্ত করে এমন ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যেও স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা একীভূতভাবে পরিচালিত হয়। ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার ভর্তুকি শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না; সামাজিক সুরক্ষা খাত থেকেও অর্থায়ন হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
এনডিএফ সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘গবেষণার দিক দিয়ে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় আমরা অনেক দুর্বল। সেক্ষেত্রে গবেষণার জন্য ভাতা দেওয়া যায় কিনা এটার বিষয়ে আমরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানাবো।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে চিকিৎসকদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ মহিলা। তাই জেলা উপজেলা পর্যায়ে নিয়োগ করা হলে এসব চিকিৎসকদের নিরাপদ আবাসনের অভাব লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ মাঝে মধ্যেই জেলা উপজেলাতে তারা হামলার শিকার হয়। পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি দূর করার জন্য আমাদের উন্নত নৈতিকতা সম্পন্ন স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করতে হবে।
অধ্যাপক নজরুল বলেন, আজকের বৈঠকে যেসব বিষয়ে আলোচনা হলো আমরা সংশ্লিষ্টদের এ বিষয়ে জানাবো। স্বাস্থ্য খাতকে কোন সামাজিক সেবায় নয় বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দীর্ঘ মেয়াদি অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে এই খাতকে আরও উন্নত করতে হবে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন এনডিএফের সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য মারজিয়া বেগম। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন এনডিএফ বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) শাখার সভাপতি, অধ্যাপক ডা. আতিয়ার রহমান, বিএমইউ এনডিএফের সেক্রেটারি ডা. শাহাদাত হোসেন, এনডিএফ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ডা. এম জি ফারুক হোসেন, এনডিএফ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ডা. মারুফ শাহরিয়ার, এনডিএফ ঢাকা মহানগর উত্তরে সেক্রেটারি ডা. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, এনডিএফ ঢাকা মহানগর উত্তরের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. হাসানুল বান্না, ডা. রুহুল কুদ্দুস বিপ্লব এবং ডা. নাজমুল আরেফিনসহ এনডিএফের বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসক নেতৃবৃন্দ ও স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক বিশিষ্ট চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, গবেষক এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এমইউ/