১২ এপ্রিল, ২০২৬ ০৩:০১ পিএম
হাম নিয়ে গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা

টিকাদান কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও ফল দৃশ্যমান নয়

টিকাদান কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও ফল দৃশ্যমান নয়
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: টিকাদান কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরও প্রত্যাশিত ফল মিলছে না বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। কোথাও কোথাও টিকা না দিয়েই কাগজে-কলমে সাফল্যের তথ্য দেখানোর বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) নবনিযুক্ত (ভিসি) অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, এ বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, এই প্রশ্ন উত্থাপন করতে হবে।

আজ রোববার (১২ এপ্রিল) সকাল ১০টায় বিএমইউর মিল্টন হলে কন্টিনিউইং মেডিকেল এডুকেশন সেশন ( সিএমই) ও গোল টেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের এ আয়োজনে সঞ্চালনায় ছিলেন শিশু অনুষদের ডিন ও শিশু বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, আজকের এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য দুটি। প্রথমত, একই ছাতার নিচে এতজন বিশেষজ্ঞকে একত্র করে একটি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করা। যদিও আলোচনা একটি সীমিত পরিসরে হচ্ছে, তবুও এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় উঠে আসছে, যা সবার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

তিনি বলেন, এসব আলোচনার মূল বিষয়গুলো জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতিনিধিরাই প্রধান ভূমিকা পালন করবেন। তাঁদের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলো সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ জানিয়ে তিনি বলেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। সংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায়। সংক্রমণের অনেক পরে এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়, ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির অজান্তেই রোগটি ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, আজকের বিভিন্নজনের আলোচনায় এটা পরিষ্কর যে, টিকাদান কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও তার যথাযথ ফলাফল অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান নয়। কোথাও কোথাও টিকা না দিয়েই কাগজে-কলমে দেওয়ার তথ্য দেখানো হচ্ছে। এ বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, এই প্রশ্ন উত্থাপন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, এই গোলটেবিল আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলো নথিভুক্ত করে প্রস্তাব আকারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, যেখানে অংশগ্রহণকারী সবার মতামত ও স্বাক্ষর থাকবে।

এ সময় ক্লিনিশিয়ান হিসেবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন বিএমইউর নবনিযুক্ত ভিসি। বলেন, পরীক্ষার ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা একটি বড় বিষয়। সঠিক সময়ের আগে নমুনা সংগ্রহ করা হলে অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত না-ও হতে পারে। এ বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুহার বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ছয় মাসের আগেও হাম সংক্রমণ হচ্ছে, যা আগে ধারণা করা হতো না। এটি ইঙ্গিত করে যে মায়ের শরীর থেকে প্রাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা সব ক্ষেত্রে শিশুর মধ্যে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না।

অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, এ পরিস্থিতিতে বুস্টার টিকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এজন্য গর্ভবতী মায়েদের ওপর বৃহৎ পরিসরে গবেষণা চালিয়ে তাঁদের প্রতিরোধক্ষমতার অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। গবেষণার ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে কিশোরী মেয়েদের জন্য অতিরিক্ত টিকা প্রদানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের বৈজ্ঞানিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে তুলে ধরা জরুরি। প্রতিটি মহামারি আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। সতুরাং পরবর্তী বড় মহামারির জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত, তা বিবেচনার সময় এসেছে।’

তিনি আরও বলেন, এই বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো শুধু আলোচনায় সীমাবদ্ধ না রেখে তা বাস্তবায়নের জন্য উদ্যোগ নিতে হবে। প্রস্তাবগুলো নীতিনির্ধারকদের কাছে পাঠিয়ে নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে। তবেই এ উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাবে।

অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) কর্মকর্তা ডা. লোবাবা শারমিন বলেন, হামে আক্রান্ত রোগীদের ডায়রিয়া হলে স্বাভাবিক সময়ের মতোই চিকিৎসা দিতে হবে। বাসায় রেখেও ওআরএস খাওয়ানোর মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তবে শিশু বেশি দুর্বল হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে হামের সংক্রমণ আবারও বাড়ছে। তারা দ্রুত টিকাদান কভারেজ বাড়ানো, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রাউন্ডটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা হামের বিস্তার রোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং কার্যকর কৌশল বাস্তবায়নের ওপর মতামত দেন।

জ্বর হলেই হাসপাতালে ভিড় করার না করার পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, জ্বর হলেই হাম হয়েছে ভেবে তাৎক্ষণিকভাবে রোগীকে আলাদা (আইসোলেশন) করার প্রয়োজন নেই। তবে চার দিন পর শরীরে র‍্যাশ (ফুসকুড়ি) দেখা দিলে তখন রোগীকে আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

আলোচনা সভায় বিএমইউর প্রো-ভাইচ চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার, বেসিক সাইন্স ও প্যারাক্লিনিক্যাল সাইন্স অনুষদে ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, নিওনেটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল মান্নান, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. এরফানুল হক সিদ্দিকী, শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন মোল্লা, ডা. তাসমিন জারা, অধ্যাপক ডা. মো. মনির হোসেন, অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল হক, অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান, ডা. বিনোদ বড়ুয়া, ডা. চিরঞ্জিত দাস, ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী, আইসিডিডিআরবি ডা. লোবাবা শারমিন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার তার বক্তব্যে হাম থেকে রক্ষা পেতে নারীদের গর্ভবতী হওয়ার পূর্বে, গর্ভবতীকালীন এবং সন্তান প্রসব পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।

হামের প্রকোপ ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির ইঈিত দিচ্ছে জানিয়ে বেসিক সাইন্স ও প্যারাক্লিনিক্যাল সাইন্স অনুষদে ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, কেন হামের প্রাদুর্ভাবের পুনরুত্থান হলো সেটা চিহ্নিত করতে হবে। টিকাদানের মধ্যে কোথায় সমস্যা রয়েছে সেটাও খুঁজে বের করতে হবে।

অধ্যাপক ডা. আবেদ হোসেন মোল্লা বলেন, হাম একটি অতিসংক্রমণজনিত ভাইরাস এতে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগস্থ করে। যেসকল শিশুরা অধিক অসুস্থ তাদেরকে দৈনিক দুইটি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে হাম রোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের যোগান নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া সংক্রমণের ব্যাপকতা রোধে আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুসহ আইসোলেশনের বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

অধ্যাপক ডা. আতিয়ার রহমান বলেন, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই এক্ষেত্রে সঠিক করণীয় কি এখনই তা নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

টিআই/এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক