ডা. বাপ্পা আজিজুল
রেসিডেন্ট, সাইক্রিয়াট্রি বিভাগ
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ
০৬ এপ্রিল, ২০২৬ ০২:৩৮ পিএম
স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও মানবতা: টেকসই উন্নয়নে অপরিহার্য সমন্বিত পদক্ষেপ
প্রতি বছর ৭ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এবারের প্রতিপাদ্য ‘টুগেদার ফর হেলথ: স্ট্যান্ড উইথ সায়েন্স’, যার বাংলা রূপ ‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান: সুরক্ষিত সকল প্রাণ’। স্লোগানটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। এটি কেবল স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের আহ্বান নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা, নীতি এবং মানবিক সংহতির এক সমন্বিত দর্শনকে তুলে ধরে।
স্বাস্থ্যসেবার অগ্রগতি ও বিজ্ঞানের অবদান
মানবসভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান, টিকা, অ্যান্টিবায়োটিক, সার্জারি, মহামারি ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সবকিছুই বিজ্ঞানের অবদান। বিশেষ করে সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের দেখিয়েছে, বিজ্ঞান ছাড়া মানবজাতি কতটা অসহায়। ভ্যাকসিন উদ্ভাবন, সংক্রমণ প্রতিরোধ, চিকিৎসা প্রোটোকল সবই বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফল।
গবেষণা ও সচেতনতার আহ্বান
এই প্রেক্ষাপটে ‘স্ট্যান্ড উইথ সায়েন্স’ মানে হলো—গুজব, অপচিকিৎসা, লোকবিজ্ঞান ও অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। এটি গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক (এভিডেন্স বেইস্ট) সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং চিকিৎসাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার আহ্বান জানায়।
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। স্বাস্থ্যসেবা কখনোই একক প্রচেষ্টার ফল নয়, এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। সরকার, চিকিৎসক, সকল স্তরের সেবাপ্রদানকারী স্বাস্থ্যকর্মী, গবেষক, নাগরিক সমাজ, সাধারণ মানুষ, মিডিয়া ও সেলিব্রিটি সবারই এখানে অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
এই প্রতিপাদ্যের ‘টুগেদার’ শব্দটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাস্থ্য সুরক্ষা একটি মৌলিক অধিকার এবং সামাজিক চুক্তি। একজনের অসচেতনতা পুরো সমাজকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জনসংখ্যার ঘনত্ব, নগরায়ণ, পরিবেশ দূষণ, সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবার অসম বণ্টন—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
বৈজ্ঞানিক মনোভাব ও সচেতনতার গুরুত্ব
এ ছাড়া স্বাস্থ্যের সামগ্রিক (হোলিস্টিক) বিবেচনাকেও সামনে আনতে হবে। ডব্লিউএইচওর ‘স্বাস্থ্য’ সংজ্ঞা আমাদেরকে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক সুস্থতার নির্দেশ দেয়। অথচ আমরা মানসিক ও আত্মিক সুস্থতার কথা প্রায় ভুলতে বসেছি এবং সমাজে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অস্থিরতা সৃষ্টি করছি।
শুধু চিকিৎসক, প্রযুক্তি বা ওষুধ থাকলেই স্বাস্থ্য নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন জনমনে বৈজ্ঞানিক মনোভাব, সচেতনতা ও শিক্ষার বিস্তৃতি। আমাদের সমাজে এখনও ভ্রান্ত চিকিৎসা পদ্ধতি, গুজবভিত্তিক চিকিৎসা, টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা, ধর্ম বা সংস্কৃতির ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে চিকিৎসা-বিরোধিতা বিদ্যমান।
ফলে ‘স্ট্যান্ড উইথ সায়েন্স’ মানে কেবল বিজ্ঞানীদের সমর্থন নয়; বরং এটি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের আহ্বান। এবারের বাংলা প্রতিপাদ্য ‘সুরক্ষিত সকল প্রাণ’ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু মানুষের স্বাস্থ্য নয়; বরং পরিবেশ, প্রাণিজগৎ ও বাস্তুতন্ত্র সবকিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান
আধুনিক জনস্বাস্থ্য ধারণায় ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতি মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে বিবেচনা করে, উদাহরণস্বরূপ—জুনোটিক রোগ (প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়), জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, খাদ্য নিরাপত্তা—এসবই নির্দেশ করে যে, স্বাস্থ্য একটি আন্তঃসম্পর্কিত বাস্তবতা।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এবারের প্রতিপাদ্য একটি কর্মপরিকল্পনার আহ্বান। স্বাস্থ্যখাতে গবেষণা ও উদ্ভাবনে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং এটি প্রযোজ্য মানসিক স্বাস্থ্য খাতেও। প্রাথমিক জ্ঞান উৎপাদন করা জরুরি, যাতে গ্রামাঞ্চলে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায়।
শিক্ষা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা (হেলথ লিটারেসি) গড়ে তুলতে হবে। এ ছাড়া টেলিমেডিসিন ও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান ও মানবতার একসঙ্গে পথচলা
‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান: সুরক্ষিত সকল প্রাণ’ প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান ও মানবতা একসঙ্গে চললে, তবেই একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ সম্ভব। এটি কেবল একটি দিবসের স্লোগান নয়; বরং একটি নৈতিক অবস্থান, যেখানে মানবতা তার উদ্দেশ্য এবং সম্মিলিত উদ্যোগ তার শক্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। আর সেই অধিকার রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হলো বিজ্ঞান।
টিআই/এমইউ