০৫ জানুয়ারী, ২০২৬ ০৮:৩৪ পিএম

বিদ্যমানগুলোর আসন কমিয়ে মেডিকেল কলেজ বৃদ্ধি নিয়ে স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া

বিদ্যমানগুলোর আসন কমিয়ে মেডিকেল কলেজ বৃদ্ধি নিয়ে স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া
ফাইল ছবি

তারিকুল ইসলাম: স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি চিকিৎসা শিক্ষারমান বারাতে মেডিকেল কলেজের আসন সংখ্যা ৫৭২টি কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে মুন্সিগঞ্জে একটি নতুন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এর আগে ঢাকার জুরাইনে ব্যারিস্টার রফিকুল হক মেডিকেল কলেজ স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। তবে সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে শিক্ষার্থী ও চিকিৎসসহ স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ ও নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশের অভাবে যেখানে বিদ্যমান মেডিকেল কলেজগুলোর আসন কমানো হয়েছে এবং ছয়টি বেসরকারি মেডিকেলে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রয়েছে, সেখানে নতুন কলেজ স্থাপন করা যৌক্তিক নয়।

বিদ্যমানগুলোর আসন কমার কারণ

জানতে চাইলে মুগদা মেডিকেলের কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মুস্তাফিজুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘সরকারি মেডিকেল কলেজে আসন সংখ্যা কমানোর মূল কারণ শিক্ষকের স্বল্পতা এবং অন্যান্য সক্ষমতার অভাব। একটি কলেজে ৫০ জন শিক্ষার্থী পড়ানোর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেখানে ১০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সম্ভবত এই কারণেই আসন সংখ্যা কমানো হয়েছে।’

বাংলাদেশের বাস্তবতায় নতুন করে আর মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মুন্সিগঞ্জে যে নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন হয়েছে, তা প্রয়োজনীয় মনে হয় না, কারণ ঢাকায় চারটি সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে এবং আশপাশে কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ফরিদপুরেও কলেজ রয়েছে। তবে এটি সরকারের সিদ্ধান্ত। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা যোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হয়ে দেশ বা বিদেশে দক্ষভাবে প্র্যাকটিস করুক। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের ৩৭টি মেডিকেল কলেজ থাকা সত্ত্বেও নতুন কলেজ অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে আরও চিন্তাভাবনার দরকার ছিল।’

শিক্ষকের পদ শূন্য ৪২.৬০ শতাংশ

২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষকের ঘাটতি এখনও গুরুতর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ ৩৭টি। এসব মেডিকেলে মোট ছয় হাজার ৪৪৬টি শিক্ষক পদ রয়েছে, কিন্তু বর্তমানে মাত্র তিন হাজার ৭০০ জন শিক্ষক শিক্ষাদানের কাজ করছেন। ফলে দুই হাজার ৭৪৬টি পদ ফাঁকা, যা মোট পদসংখ্যার ৪২.৬০ শতাংশ।

পদের ধরণ অনুযায়ী খালি অবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি অধ্যাপক পদে, যেখানে ৮৭৭টির মধ্যে ৫৬৭টি ফাঁকা (৬৪.৬৫ শতাংশ)। এছাড়া সহকারী অধ্যাপক পদে এক হাজার ৬৩৪টির মধ্যে ৭৩৫টি, সহযোগী অধ্যাপক পদে দুই হাজার ৪৫৩টির মধ্যে এক হাজার ২৫০টি, কিউরেটর পদে ৬২টির মধ্যে ১২টি, এবং প্রভাষক পদে এক হাজার ২৪০টির মধ্যে ১৮২টি পদ শূন্য রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, এখন নতুন করে সরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়াটা যুক্তিযুক্ত মনে করছি না। ইতিপূর্বে পড়াশোনার মান ঠিক রাখতে সিট সংখ্যা কমিয়েছে। গত বছর মানহীনতার কারণ দেখে কয়েকটা মেডিকেল কলেজ বন্ধ করলো। ওই মেডিকেল কলেজগুলোর দিকে দৃষ্টি না দিয়ে নতুন করে মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়াটা যুক্তিসঙ্গত মনে হচ্ছে না। বিদ্যমান মেডিকেলগুলোতে যে বিষয়গুলো ঘাটতি আছে অবকাঠামোগত ও শিক্ষকের পর্যাপ্ততানিয়ে। সেসব বিষয়ে দৃষ্টি দিয়ে কাজ করা উচিত। নতুন করে মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া যুক্তিযুক্ত মনে করছি না।

অন্য এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের দেশে মেডিকেল কলেজ বাড়ানোর আগে সরকারের উচিত মেডিকেল কলেজের মান ঠিক করা। শিক্ষক সংকট, হোস্টেলগুলোর নানাবিধ সমস্যা সমাধান না করে নতুন মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়াটা কিছুটা রসিকতার মতো দেখায়।

নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়া

এর আগে গত বছরের ১১ নভেম্বর ব্যারিস্টার রফিকুল হকের নামে একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম চালুর অনুমোদন দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এই সংবাদ শেয়ার করার পর মেডিভয়েসের ফেসবুক পেজে নানা মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্যকারীদের মধ্যে ছিলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এফসিপিএস পার্ট-২ প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসক আতাউর রহমান রুবেল। তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নতুন করে মেডিকেল কলেজের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং বিদ্যমান মেডিকেল কলেজগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। মানহীন মেডিকেল কলেজ বন্ধ করা বা আসন সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, বিগত সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় যেভাবে মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে, তা ছিল অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও মান উন্নয়ন না করে মেডিকেল কলেজ চালু করায় চিকিৎসক তৈরির মান খারাপ হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। এ কারণে তিনি নতুন করে আর কোনো মেডিকেল কলেজ অনুমোদনের বিরোধিতা করেন।

মেডিসিন ক্লাব, এফএমসিইউর উপদেষ্টা রাশেদুজ্জামান জয় বলেন, ‘নতুন মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিলে পুরাতন বেসরকারি মেডিকেল বন্ধ করছেন কেন? কেনই বা সরকারি মেডিকেলের আসন কমাচ্ছেন? এই দেশ একদিকে গড়ে, একদিকে ভাঙে। নেট অর্জন শূন্য।’

টিআই/এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক