১১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১১:৪৪ পিএম

‘স্বাস্থ্য অধিকারের আইনি স্বীকৃতি না থাকায় সেবা বঞ্চনায় প্রতিকার মেলে না’

‘স্বাস্থ্য অধিকারের আইনি স্বীকৃতি না থাকায় সেবা বঞ্চনায় প্রতিকার মেলে না’
বিএমএ সভাকক্ষে দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য আন্দোলনের আয়োজনে আলোচনা সভা।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: সংবিধান অনুযায়ী স্বাস্থ্য মৌলিক অধিকার হলেও এটি আইনগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় নাগরিকরা সেবা বঞ্চিত হলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়া সম্ভব হয় না বলে মনে করেন জনবিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকে আইনগত অধিকার না করলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। দুর্নীতি রোধ করা যাবে না।

আজ বৃহস্পতিবার (১১ডিসেম্বর) বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাকক্ষে দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য আন্দোলনের আয়োজনে ‘সর্বস্তরে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে চাই দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক হিসেবে লেলিন চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্যখাতে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় তার মাত্র অল্প অংশ মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, বাকিটা হারিয়ে যায় অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও দালাল-ঠিকাদার চক্রের লুটপাটে।

তিনি বলেন, বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেও সেবার মান বাড়ে না, কারণ বরাদ্দের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ব্যয়ই হয় না। আরও অন্তত ৩০ শতাংশ সরাসরি দুর্নীতিতে হারিয়ে যায়।

লেলিন চৌধুরী আরও বলেন, দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সবার আগে দেশের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে জনপ্রতিনিধিসহ বিশিষ্টজনদের সেবা নেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। চিকিত্সার জন্য তাদের বিদেশে যাওয়া বন্ধে আইন প্রণয়ন করা গেলে স্বাস্থ্যখাত দুর্নীতিমূক্ত হবে। একই সঙ্গে সেবার মান ভালো হবে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী।  

তিনি বলেন, দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, মন্ত্রীপরিষদ, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, সরকারী কর্মকর্তাদের চিকিত্সা দেশে করতে হবে। এমন আইন দেশের স্বাস্থ্যখাত পরিবর্তন সম্ভব। 

এ ব্যাপারে সেনা কর্মকর্তাদের দেশের চিকিৎসা নেওয়ার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, কোনো সেনাকর্মকর্তা অসুস্থ হলে বাইরে যান না। তারা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসা নেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সুন্দর হওয়ায় তাদের বাইরে চিকিৎসা নিতে হয় না।

লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘করোনার সময় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আমরা নির্ভরশীল ছিলাম। তখন কাউকে বাইরে যেতে হয়নি। সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা নিয়েছে এবং যথাযথ সেবা পেয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বাস্তবে স্বাস্থ্যখাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তার মাত্র অল্প অংশ মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, বাকিটা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও দালাল-ঠিকাদার চক্রের লুটপাটে হারিয়ে যায়। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি শুধু আর্থিক নয়, এটি সরাসরি মানুষের জীবনের ক্ষতি ডেকে আনে।

স্বাস্থ্য বাজেটের কমবেশি ৫৫ শতাংশ অপচয় ও দুর্নীতিতে হারিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, বাকি টাকায় এই দেশের ১৮ কোটি মানুষকে চিকিৎসা দিতে বলা হয়, এটা আদৌ সম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা (ডব্লিউএইচও) জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য বাজেট বরাদ্দের সুপারিশ করলেও বাংলাদেশে বরাদ্দ মাত্র ০.৬৯ শতাংশ। আর সেই সামান্য বরাদ্দের বড় অংশই গায়েব হয়ে যায়।

এ সময় দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে লেলিন চৌধুরী বলেন, আসল চাহিদা যাচাই না করে মনগড়া তালিকা করে হাসপাতালগুলোতে যন্ত্রপাতি পাঠানো হয়, যার অনেকগুলো ব্যবহারই সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, যে উপজেলায় বিদ্যুতের সংযোগ ছিল না, সেখানে এক্স-রে মেশিন পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দামটা ঠিকই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে।

করোনা মহামারির সময় ৪০ হাজার কোটি টাকার ভ্যাকসিন কেনার হিসাব এখনো প্রকাশ না হওয়াকে ‘রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আড়ালে দুর্নীতির আবরণ’ বলে অভিহিত করেন তিনি।

আলোচনায় স্বাস্থ্য সেবার মানবসম্পদ সংকট ও পরিকল্পনার অভাব নিয়ে সমালোচনামুখর এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত সরকার কখনোই চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, অ্যানেস্থেটিস্ট বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঠিক সংখ্যাগত চাহিদা নির্ধারণ ও তাদের জন্য প্রাক্কলিত খরচের জাতীয় কোনো পরিকল্পনা তৈরি করেনি।

লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা একটি টিমওয়ার্ক। কিন্তু আমাদের দেশে কতজন ডাক্তার, কতজন নার্স বা টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন, সরকার জানে না, আমরাও জানি না।’

অনুষ্ঠানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির ঘটনায় আলোচিত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম ওরফে মিঠুর প্রসঙ্গ ধরে তিনি বলেন, ‘মিঠুরা স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিতে মুখ্য নয়, বরং উপলক্ষ মাত্র। তারা মন্ত্রণালয়ে তৈরি হয়। তাদের শেকড় অনেক গভীরে। যাদের ছত্রছায়ায় তারা বেড়ে ওঠে তাদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়া জরুরি।’

স্বাস্থ্যের বিতর্কিত ঠিকাদার মিঠু দুর্নীতিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন মন্তব্য করে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সভাপতি রাশেদ রাব্বি বলেন, দুনীতি এবং স্বাস্থ্য এই দুটি শব্দের সঙ্গে মিঠুর নাম চলে আসে।

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময় নিউজ করতে গিয়ে দেখেছি, কান্ট্রি অব অরজিন লেখা জার্মানি। এজন্য তিনি শিপমেন্টের কাগজে অ্যাড করেছেন পোল্যান্ড, যে মেশিন দিয়েছেন সেটি চাইনিজ ও পুরাতন। পুরাতন একটি মেশিন তিনি চায়না থেকে পোল্যান্ডে পাঠিয়েছেন, পোল্যান্ড থেকে শিপমেন্ট করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন, যাতে বোঝা না যায় মেশিনটা কোন দেশ থেকে এলো।’

মিঠুর দুর্নীতি নিয়ে লিখলেও তার কিছুই হয়নি উল্লেখ করে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, এই সরকার তাকে জেলে নিলেও তিনি বেরিয়ে গেছেন। আগের সরকারের হয় তো তাকে জেলে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল না।

অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লায়ন ক্লাবের সাবেক ডিস্ট্রিক্ট গভর্নর আশফাকুল রহমান, হ্যালক্রো গ্রুপের সাবেক কনসালটেন্ট আশফাকুল রহমান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সভাপতি রাশেদ রাব্বি প্রমুখ। 

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত