১৬ অগাস্ট, ২০২৫ ০১:৪৪ পিএম
বিপিএইচসিডিওএর নবনির্বাচিত কমিটির অভিষেক

স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের অন্যায় মুনাফা বন্ধ করা হবে: অধ্যাপক সায়েদুর রহমান

স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের অন্যায় মুনাফা বন্ধ করা হবে: অধ্যাপক সায়েদুর রহমান
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ন্যায়সঙ্গত মুনাফা নিশ্চিতে নীতিমালা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান। তিনি বলেন, অন্যায় মুনাফা কাম্য নয়, স্বাস্থ্য খাতে এটি বন্ধ করা হবে।

আজ শনিবার (১৬ আগস্ট) বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ঔনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএইচসিডিওএ) নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক ও সাধারণ সভায় এ কথা বলেন তিনি।

রাজধানীর শাহবাগে শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন অধ্যাপক সায়েদুর রহমান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।

বক্তব্যের শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের বিভিন্ন পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় অনেক চিকিৎসা বেসরকারি পর্যায়ে হয়েছে উল্লেখ করে জাতীয় সংকটে এগিয়ে আসায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান অধ্যাপক সায়েদুর রহমান।

তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক বৈষম্যের পরেই সবচেয়ে বড় হচ্ছে স্বাস্থ্যখাতের বৈষম্য। এজন্য স্বাস্থ্যখাতের পুনর্গঠন কর্মকাণ্ডে এটিকে আমরা জাতীয় স্বাস্থ্যখাত বলছি, সরকারি না। সরকারি-বেসরকারিসহ লাভজনক-অলাভজনক প্রতিষ্ঠান—সবাই মিলে ১৮ কোটি মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য একটি রূপান্তর প্রক্রিয়া চলমান। এই প্রক্রিয়ায় যার যার অবস্থান থেকে সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন।’

অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ‘মুনাফার জন্য স্বাস্থ্যখাত, অ-মুনাফার জন্য স্বাস্থ্যখাত এবং সেবার জন্য স্বাস্থ্যখাত—এই তিনটি খাতের মধ্যে একটি যথাযথ সমন্বয় বাংলাদেশকে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যখাতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।’

‘দেশের সকল বিশেষজ্ঞের মত নিয়ে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষকে একটি মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, এই রূপান্তরই হচ্ছে আমাদের অঙ্গীকার’—যোগ করেন বিশেষ সহকারী।

স্বাস্থ্যখাতের মুনাফা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আপনারা প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন, তার যুক্তিসংগত একটি মুনাফা দরকার। সেটি বিকাশের জন্যও যে প্রয়োজনীয় মুনাফা, সেটির জন্য জায়গা থাকা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই আপনার ন্যায়সঙ্গত মুনাফার পক্ষে আইন প্রণয়ন করে যাব। কিন্তু অন্যায় মুনাফা অবশ্যই বন্ধ হওয়া দরকার।’

স্বাস্থ্যখাতের অচলাবস্থার তথ্য তুলে ধরে অধ্যঅপক সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আজকে যখন কথা বলছি আপনার সঙ্গে, এই দেশের যত পরিমাণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে, তার চাইতে বেশি পরিমাণে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে আছে। আজকাল প্রায়ই ঢাকার ক্লিনিকগুলোতে বা বড় হাসপাতালগুলোতে কেবিনে ভর্তির জন্য সুপারিশ করতে হয়। তার মানে সারাদেশের স্বাস্থ্য কাঠামো বা চিকিৎসা কাঠামো এখনও এই দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।’

তিনি বলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে যখন কথা বলছি, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ন্যূনতম ১০-১২ হাজার মানুষ ফ্লোরে শুয়ে আছে। কোন মানুষটি ফ্লোরে শুয়ে থাকে? যার আসলে কোনো আর্থিক সামর্থ্য নেই কোথাও যাওয়ার, কিন্তু তার চিকিৎসা প্রয়োজন। অর্থাৎ এই ১০-১২ হাজার শয্যা সম্প্রসারণের আগে কোনো মানুষকে অন্তত বিছানায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। এরকম একটি ভঙ্গুর, দুর্বল, দীর্ঘদিন যাবৎ অবহেলিত একটি স্বাস্থ্যখাতকে পুনর্গঠন-পুনর্নিমান অল্প সময়ের কাজ না।’

‘কিন্তু এটি একটি সত্য কথা—চিকিৎসা কিংবা স্বাস্থ্যকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে তীব্র অসন্তোষ। এটি যে শুধু সরকারি হাসপাতাল ঘিরে, তা নয়। একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার যে প্রবণতা, সেক্ষেত্রে আপনাদেরকে আমাদের পাশে দাঁড়াতে হবে’—যোগ করেন তিনি।

বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা জেনে অবাক হয়েছি যে এটি প্রতি বছর করা লাগে। আমরা ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছি। এটি আসলে অসম্ভব একটি প্রক্রিয়া। ১৫ থেকে ২০ হাজার প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর লাইসেন্সিং করা যৌক্তিকও না বটে। কিন্তু এটিকে নির্দিষ্ট মেয়াদ আনতে যেন সঠিক পরিদর্শন হয়। আমরা জেনেছি পরিদর্শনগুলো সঠিক হয় না।’

এ সময় স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষা বিভাগের সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানের মান একইভাবে নির্ধারণের কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক সায়েদুর রহমান। বলেন, ‘এটি নিশ্চিত করার জন্য আমরা হেলথ ফ্যাসিলিটি অ্যাক্রিডিটিশন কাউন্সিল গঠন করতে যাচ্ছি। এই দেশের নাগরিকের জন্য এক মানের সেবা দিতে যা যা প্রয়োজন, আমরা সব উদ্যোগ নিয়ে যাচ্ছি।’

অনেক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে একজন চিকিৎক ৩০ হাজার চেয়েও কম টাকায় চাকরি করেন জানিয়ে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, এটি কাম্য নয়। বেসরকারি পর্যায়ে  কোনো বেতন কাঠামো নেই। এখানে বৈষম্য দূর করতে একটি বেতন বোর্ড গঠন করা হবে।

স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে হামলা ও চিকিৎসক নিগ্রহের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সকল নির্যাতনই অন্যায়। তবে নারী নির্যাতন নিশ্চয় বড় অন্যায়। একইভাবে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে হামলা ভাঙচুরের ঘটনায় বড় ধরনের শাস্তির বিধান রাখতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে দেশের চিকিৎসাসেবায় ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি প্রকাশ করে একই মানের সেবা সকল নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করতে অনুরোধ জানান আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। নবনির্বাচিত কমিটিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, বছরে অন্তত ৫-৬ বার তাঁকে হাসপাতালে যেতে হয়৷ এ পর্যন্ত বিদেশে চিকিৎসা নিতে হয়নি৷

দেশের চিকিৎসা সেবায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ড. আসিফ নজরুল জানান, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁকে আন্তরিক সেবা দেওয়া হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষদের অভিযোগ চিকিৎসকরা যত্ন নিয়ে দেখেন না।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, আগামী এক বছর পঁচিশ থেকে একশ কোটির টাকার ইন্স্যুরেন্সের আওতায় দরিদ্র রোগীদের সেবা নিশ্চিত করা হবে।

সভায় জানানো হয়, বছরে ৪-৫ বিলিয়ন ডলার চিকিৎসা বাবদ দেশের বাইরে চলে যায়। এই ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান বৃদ্ধিতে সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।  

দেশে তিন ভাগের দুই ভাগ স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি পর্যায়ে হচ্ছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে ১২ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সেবা নিশ্চিত হচ্ছে। দেশে ৯৯ শতাংশ বিশেষায়িত সেবা দেশেই সম্ভব হবে। করোনার সময় এই সক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছে।

তারা আরও বলেন, ভয়াবহ এই স্বাস্থ্য দুর্যোগে সর্বপ্রথম দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত এগিয়ে আসে। এই অবদানের কথা দেশ ও দেশের বাইরে বড় পরিসরে আলোচনায় নিয়ে আসতে গণমাধ্যমের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়।

অভিষেক অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. এ এম শামীম। এতে সভাপতিত্ব করেন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস ডাম্বেল।

এমইউ/এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক