দুঃসময়
‘ওরে মিষ্টির মা-রে, তালা খুলতে পারছি না তো।’ দুবার এভাবে আর্তনাদ করার পর শায়লাবানু এলেন স্বামীর তালা খুলে দিতে, মানে গেটের তালা খুলে দিতে। শায়লা বানু জানেন ভুল চাবির গোছা নিয়ে তার স্বামী তালা খুলতে গেছেন। সঠিক চাবি দিয়ে তালা খুলে দিতেই রাইফেলের গুলির মত ছিটকে বেরিয়ে গেলেন রহমত সাহেব। ‘আজ নির্ঘতি দেরি হয়ে যাবে, ফের বসের ঝাড়ি খাব’, বলতে বলতে ন’টা-পাঁচটার অফিসে ছুটলেন।
সরকারি অফিসে অফিস সহকারী পদে আছেন রহমত সাহেব। এক মেয়ে, এক ছেলের ছোট সংসার। সহকর্মীরা এবং নিজ গ্রামের লোকজন জানেন, ছোট পরিবার নিয়ে রহমত সাহেব বেশ সুখেই আছেন। কিন্তু কতটা যে সুখে আছেন তা তিনি বেশ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, ছেলেমেয়েদের টিউশান খরচ প্রদানের পর মাসিক বেতনের অবস্থা দাঁড়ায় পটেটো চিপসের প্যাকেটের মত। তার উপর প্রতি মাসেই এটা-সেটা বাজে খরচ লেগেই আছে।
অফিসে বসে ফাইল খুলে কেবল বসেছেন। চশমার পাওয়ার বাড়াতে হবে, চোখের পাওয়ার বেড়ে গেছে। দু’শতে আর চলছে না, বোধ হয় আড়াইশ নিতে হবে। নেব নেব করেও কিনতে পারছেন না, কৃপণতা করে চোখ কুঁচকেই কাজ চালাচ্ছেন। মোবাইল বেজে উঠল, চমকে গেলেন রহমত সাহেব। আবার কে কোন মতলব করছে কে জানে। রহমত সাহেব বুঝেছেন, মোবাইলে কোন সুসংবাদ তিনি পাবেন না। ইদানিং তার প্রধান ভয় মা বাবার অসুস্থতা নিয়ে। কিছুদিন আগে মায়ের চিকিৎসায় মোটা টাকা খরচ হয়ে গেছে।
ভবিষ্য তহবিল থেকে লোন করতে হয়েছে। পঁয়ত্রিশ কিস্তির মধ্যে ষোল কিস্তি পরিশোধ করেছেন। সকাল সকাল মোবাইল এলেই ভয় হয়, আবার কেউ অসুস্থ হলেন বুঝি। মোবাইল রিসিভের বাটন চেপে কানে ধরলেন, হ্যালো বললেন না।
- হ্যালো, রহমত, আমি অখিল বলছি, হ্যালো, শুনতে পাচ্ছিস?
অখিলের কণ্ঠ পেয়ে রহমত সাহেব আরও নিঃশব্দ হলেন। ব্যাটা ধড়িবাজ একাধিক সিম ব্যবহার করে। জানে, যে নম্বর সেইভ করা আছে সেটায় কল করলে নাও ধরতে পারে।
- হ্যালো রহমত, তোর বৌদির অবস্থা বেশ খারাপ, জরায়ুর টিউমার ধরা পড়েছে, মিশন হাসপাতালে ভর্তি করেছি। টিউমার আবার পেকে গেছে, যে কোন মুহূর্তে বাস্ট হতে পারে। ডাক্তার বলেছে ইমিডিয়েট অপারেশান করা লাগবে।
রহমত সাহেব ভাবলেন, টিউমার ধরা পড়ুক না বাঘ ধরা পড়ুক আমার কিছু করার নেই।
- হ্যালো, কে কল করেছে? কিছু শুনতে পারছিনা তো, আজ সকাল থেকে নেটওয়ার্ক ডিসটার্ব দিচ্ছে। হ্যালো কে বলছেন?
অখিলের কথা পরিষ্কার শুনতে পেয়েও রহমত সাহেব ভান করলেন। তিনি জানেন অখিল কিছু টাকা চাইবে।
- হ্যালো রহমত, আমি তো পরিষ্কার তোর কথা শুনতে পাচ্ছি। যাক, অপুকে তোর কাছে পাঠালাম, আমার খুব বিপদ, যে করেই হোক হাজার দশেক টাকা পাঠাবি।
- হ্যালো, কে বলছেন? অখিল মোবাইল ছেড়ে দিয়েছে।
মুখ ভোঁতা করে বাড়ি ফিরলেন রহমত সাহেব। বাল্যবন্ধু অখিল বেহায়া এবং নাছোড় বান্দা। আবার কিছু খরচের মধ্যে পড়ে গেলেন।
‘এক কাপ চা দাও মিষ্টির মা।’ নড়বড়ে সোফায় বসে পড়লেন তিনি।
২য় শ্রেণিতে পড়ুয়া পুত্র সাগর প্রাত্যহিক নিয়মেই টেলিভিশনে ডোরেমন দেখছে। এই একটা জিনিস রহমত সাহেবের খুবই অপছন্দ। অথচ উনার যতটা অপছন্দ, সাগরের ততটাই পছন্দ। সব সময় ডোরেমন নিয়েই আছে। হয় টিভিতে, না হয় ডোরেমনের স্টিকার নিয়ে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। সাগর রান্নাঘরে মায়ের কাছে গেল।
- মাম্মি তোম কি স্রেফ মিষ্টি আপু কি মাম্মি হো? মেরি মাম্মি নেহি হো?
- কেন রে, হঠাৎ এ প্রশ্ন?
- নেহি, পাপা হামেশা মিষ্টি কি মা, মিষ্টিকি মা, ক্যাহেতা হে, ইসি লিয়ে থোড়া সন্দেহ হে।
লোডসেডিংয়ের মাঝে বসে চা পান করে ঘেমে গেলেন রহমত সাহেব। মাথায় শুধু অখিলের কথাটাই ঘুরপাক খাচ্ছে। দেখা গেল বউয়ের তেমন কিছুই হয়নি, মাঝখান থেকে বাগিয়ে নিলো পাঁচ হাজার টাকা। নিজেকে বড় বোকা মনে হলো তার। সবাই তাকে ঠকিয়ে নেয়। এমনকি বাজার করতে গেলেও প্রতিটি আইটেমেই তিনি ঠকে আসেন। অপুষ্ট মানি ব্যাগ নিয়ে বাজারে যান। জিনিস পত্রের একটু দরদাম করার চেষ্টা করেন। বাজারে শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ আইটেমই তিনি কেনেন। যেমন—মাছের বেলায় সিলভারকার্প, তেলাপিয়া বা বাটামাছ। কোনদিন তিনি শিং, মাগুর, পাবদা, চিংড়ি বা বড় সাইজের মাছের দিকে তাকান না বা দামও জিজ্ঞাসা করেন না।
না ঠকে আসার জন্য যথেষ্ট সর্তক থাকেন তিনি। তবুও পেরে উঠেন না। হয়ত সবজির দোকানে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পটল কত করে কেজি?’ দোকানদার বলল, ‘স্যার, ২৪ টাকা, ৩০ টাকা কেজি বিক্রি করলাম, আপনার জন্য ২৪ টাকা।’ রহমত সাহেব মনে মনে বলেন, ‘কেন রে? আমার জন্য চব্বিশ কেন? আমি কি তোর দুলাভাই নাকি? পটলতো কুড়ি টাকা কেজি, দোকানির এটা ভাঁওতাবাজি।’
রাতে খাবার টেবিলে কথাটা উঠালেন শায়লাবানু। শোন, শেফালির বিয়ে ঠিক হয়েছে, বড় ভাবী মোবাইল করেছিল। ছেলে পুলিশ অফিসার, অনেক টাকা আয় করে। আমরা কয়েক বোন মিলে ঠিক করেছি, সবাই মিলে একটা ভাল কিছু গিফ্ট দেব।
খাবারের মেনু খুব সাদামাটা। ঝিঙে আলুর চচ্চড়ি, মশুর ডাল, লাল শাক। তৃপ্তি করেই আহার করছিলেন রহমত সাহেব, হঠাৎ রুচি কমে গেল।
সাগর ঘ্যান ঘ্যান করছে, এ তরকারি দিয়ে সে খেতে পারবে না। সে খাওয়া ছেড়ে বসে আছে। বায়না ধরেছে ডিম ভেজে দেওয়ার জন্য। শায়লাবানু একটা ডিম ভেজে আনলেন। অর্ধেকটা সাগরকে এবং বাকিটা মিষ্টি ও স্বামীর পাতে দিলেন। ডিমভাজি পেয়েও রহমত সাহেবের রুচি বৃদ্ধি পেল না।
- এত তাড়াতাড়ি বোনদের মধ্যে যোগাযোগ হলো কী করে?
- মোবাইল মে, মোবাইল কি যুগ মে যোগাযোগ ক্যারনে মে বাত লাগতা হে ক্যায়া?
- তুই থাম। ছেলেকে ধমকে উঠলেন রহমত সাহেব। হিন্দি কথা শুনলে মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন না।
- বাবা, আমার কিন্তু পাজামা ছিঁড়ে গেছে। এবার একসাথে দু‘টো পাজামা বানিয়ে দিবে। কথাগুলো মিষ্টি করেই বলল মিষ্টি, কিন্তু রহমত সাহেবের মিষ্টি লাগল না।
শায়লাবানু বললেন, বড় আপা তো বলে দিয়েছে ও কিছু দিতে পারবে না। মিঠুর বউয়ের সিজার করতে হয়েছে, অনেক টাকা খরচ হয়ে গেছে।
- সবাই মিলে দেওয়ার দরকার কী? যার যার সামর্থ মত কিছু একটা দিলেই তো হলো।
- আহা, বুঝছো না কেন? আলাদা আলাদা দিলে, ভালো কিছু হবে না।
- তার চেয়ে সবাই মিলে দিলে একটা সোনার কিছু দেওয়া যাবে।
সোনার কথা শুনে পিলে চমকে গেল রহমত সাহেবের।
- স্বর্ণ নির্মিত বস্তু প্রদানের বাসনা বাতিল কর শায়লাবানু। সোনার দাম কত জান?
- কত?
- ঊনষাট হাজার পাঁচশত টাকা ভরি। তার চেয়ে আত্মীয় স্বজনের বিয়েতে অন্যরা কী ধরনের গিফ্ট দেয়, সেটা ভেবে একটা কিছু ঠিক কর।
- না, না, আমার বড় ভাইয়ের ছোট মেয়ের বিয়ে, সবাই যা দেয় তা দিলে চলবে কেন? বিয়েতো এখনো দু’মাস বাকি। তাছাড়া আগামী মাসে তো ঈদের বোনাস পাবে।
- বোনাস দিয়ে কোরবানির খাসি কিনতে হবে। তাছাড়া গত ঈদে তো মিষ্টির কোন জামা কাপড় কেনাই হয়নি।
ঈদ বোনাসের গন্ধ পেয়ে সবাই চনমনে হয়ে উঠল। মিষ্টি বলল, বাবা গত ঈদে তো কিছু দাওনি, মনে আছে? বলেছিলে এবার ঈদে আমার পছন্দমতো পোশাক কিনে দিবে।
- আমার স্কুল ব্যাগ ছিড়ে গেছে, আমাকে কিন্তু ডোরেমনের ছবিওয়ালা স্কুল ব্যাগ কিনে দিতে হবে বাবা, সাগরের বায়না। স্কুল ব্যাগ ছাড়াও জিন্সের প্যান্ট এবং রিমোট কন্ট্রোল গাড়ি।
মিষ্টি বলে ওঠে—এবার ঈদে আমি দুই সেট নেব, মাছাককলি আর জিপসি।
নামগুলোর সাথে মোটেও পরিচিত নন রহমত সাহেব, বললেন, ‘ওগুলো আবার কি?’
- জামার সেট বাবা, নাম শোন নি?
- না। তবে দুটো নয়, যে কোন একটার কথা ভাবো মা। কিন্তু দাম কেমন বলতে পারিস?
মিষ্টি বলল, চার থেকে সাত হাজার টাকা হবে বোধ হয়।
দাম শুনে রহমত সাহেবের হেঁচকি উঠে গেল। তিনি দ্রুত পানি খেলেন।
পরের মাসে ঈদ বোনাস পেলেন রহমত সাহেব। বসকে বলে দুপুর নাগাদ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। উদ্দেশ্য সিটি হাটে গিয়ে কোরবানির খাসি দেখা। পছন্দ হলে কিনেই ফেলবেন এবং বাসায় নিয়ে গিয়ে সবাইকে চমকে দেবেন। গলায় লাল ফিতে বাঁধা একটা সুদর্শন ঘোর কৃষ্ণবর্ণের খাসিকে সাগর আদর করে কচি কাঁঠালের পাতা খাওয়াচ্ছে, এমন দৃশ্য তিনি কল্পনায় দেখলেন।
দুপুরের কড়া রোদ মাথায় নিয়ে অটো যোগে সিটি হাটে পৌঁছলেন তিনি। হাটে নেমে রীতিমত হকচকিয়ে গেলেন। একে রোদ আর প্রচণ্ড গরম তার উপর হাটে গরু মহিষের গাদাগাদি। গরু কেনার বাজেট নেই বলে তিনি গরুর দিকে তাকাতে চাইলেন না। তবুও চোখ ফেরাতে পারলেন না। হাতির সমান বড় বড় এক একটা গরু। বাহার বৃদ্ধিকল্পে রঙিন কাগজের মালা পরিয়েছে। বাহারি শিংয়ের গুঁতোয় অনেকে নাজেহাল হচ্ছে। হাটের মাঝে এখানে সেখানে গোময়ের ছড়াছড়ি। রহমত সাহেব ছাগল হাটের খোঁজ করতে লাগলেন।
একটা বেয়াড়া বলদ রহমত সাহেবের পা মাড়িয়ে দিল। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলেন রহমত সাহেব। তিনি নিচু হয়ে পায়ের পাতাটা দেখলেন। এমন সময় ৪/৫ জন লোক এসে বলল, ‘আহা, আহা, আপনার পেছনে তো গোবর লেগে গেছে, আসুন আসুন, এদিকে টিউবয়েল আছে।’ রহমত সাহেব দেখলেন সত্যিই কিছুটা গোবর তার পেছনে শার্ট-প্যান্টে লেগেছে।
লোকগুলো এক প্রকার জোর করে তাকে টিউবয়েলের নিকট নিয়ে পানি দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে লাগল। পায়ের ব্যথাটা তখনও তীব্র, এদিকে কয়েকজন লোক পানি দিয়ে তার ময়লা ধুয়ে দিচ্ছেন। মুহুর্তের মধ্যে ঘটনাগুলো রহমত সাহেবকে বিচলিত করল। লোকগুলো বিদেয় হবার পর তিনি একটু স্থির হওয়ার চেষ্টা করলেন। মাথার উপর প্রচণ্ড সূর্যতাপ। তিনি এগুলেন ছাগল হাটের দিকে।
প্রচণ্ড রোদ মানুষের ভীড় আর ভ্যাপসা গরমে মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। ছাগল হাটে দেখলেন, নানা কিসিমের ছাগল আমদানী হয়েছে। অধিকাংশই মোটাতাজা সুদর্শন। মাঝারি সাইজের একটার দাম তিনি জানলেন, পনের হাজার টাকা। দাম শুনে প্রায় আঁতকে উঠলেন তিনি। ছাগল কিনতেই বোনাস শেষ হলে ছেলেমেয়ের জামাকাপড় কিনবেন কি দিয়ে? পুরো বোনাসই প্যান্টের পকেটে। কথাটা মনে হতেই প্যান্টের পকেটে হাত রাখলেন। সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। কিছুক্ষণ আগে ময়লা পরিস্কার করে দেওয়ার সময় লোকগুলো তার পকেটও পরিষ্কার করে দিয়েছে।
এনএআর/