১০ জুলাই, ২০২৫ ১১:৫৬ এএম

গৌরব ও সংগ্রামে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৭৯ বছরে পদার্পণ

গৌরব ও সংগ্রামে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৭৯ বছরে পদার্পণ
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশের প্রাচীনতম মেডিকেল কলেজ ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ ১০ জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৩৬ সালের একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৪৬ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যা বর্তমানে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে ভারতবর্ষের ক্ষমতা দখলের প্রায় একশ বছর পর ১৮৫৩ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কলকাতায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠারও একশ’ বছরে এ অঞ্চলে কোন মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়নি। মধ্যবর্তী এ দীর্ঘ সময়ে কিছু মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মিটফোর্ড হাসপাতালের সাথে মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল (যা বর্তমানে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ), ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও সিলেট মেডিকেল স্কুল।

তবে পূর্ববঙ্গে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিতে নিতে চলে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিল তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের কাছে ঢাকায় একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব পেশ করে। কিন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে প্রস্তাবটি হারিয়ে যেতে থাকে তবে যুদ্ধের ডামাডোলে হারিয়ে যাওয়া প্রস্তাবটি ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষে আলোর মুখ দেখে।

ব্রিটিশ সরকার উপমহাদেশের ঢাকা, করাচি ও মাদ্রাজে (বর্তমানে চেন্নাই) তিনটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ উপলক্ষে ঢাকার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. মেজর ডব্লিউ. জে. ভারজিন এবং এ অঞ্চলের প্রথিতযশা নাগরিকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৩৬ সালের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সরকারি আনুষ্ঠানিকতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার দরুন কলেজটি কার্যক্রম শুরু করতে প্রায় দশ বছর সময় লেগে যায়। অবশেষে ১০ জুলাই ১৯৪৬ তারিখে ঢাকা মেডিকেল কলেজ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়।

বঙ্গভঙ্গের কারণে নবগঠিত বাংলা ও আসাম প্রদেশের সচিবালয়ের জন্য ১৯০৪ সালে নির্মিত ভবনটি ১৯২১ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল এবং এ ভবনের একাংশে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা কেন্দ্র, আরেকটি অংশে ডরমিটরি এবং অবশিষ্টাংশে কলা অনুষদের শিক্ষা ভবন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সম্পূর্ণ ভবনটি আমেরিকান বেস হাসপাতালরূপে ব্যবহূত হয় এবং যুদ্ধ শেষে আমেরিকানরা চলে গেলে ওখানে একটি ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে এভবনটিতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চালু হয়।

প্রথম অবস্থায় এ হাসপাতালে মাত্র চারটি বিভাগ ছিল, যেমন: মেডিকেল, সার্জারি, স্ত্রীরোগবিদ্যা (গাইনিকলজি) এবং ইএনটি (নাক, কান, গলা)। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের জন্য কোনো হোস্টেল বা আবাসিক ব্যবস্থা ছিল না। ছাত্রদেরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলসমূহে থাকার অনুমতি দেওয়া হতো কিন্তু ছাত্রীদের নিজ নিজ বাসা থেকে এসে ক্লাস করতে হতো।

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এক বিরাট সংখ্যক ছাত্র চলে এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। একইভাবে অনেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছেড়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজে চলে যায়। কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরে সাময়িক ছাউনি বানিয়ে সেগুলির কয়েকটিতে হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও কয়েকটিতে ছাত্রদের হোস্টেল খোলা হয়। অতঃপর পর্যায়ক্রমে ছাত্রাবাস, কলেজ ও হাসপাতালের জন্য নতুন নতুন ভবন নির্মিত হতে থাকে। ১৯৫২ সালে ছাত্রীনিবাস, ১৯৫৪-৫৫ সালে ছাত্রাবাস, ১৯৫৫ সালে অনেকগুলি শিক্ষাভবন, ১৯৭৪-৭৫ সালে ইন্টার্নি ডাক্তারদের হোস্টেল নির্মাণ করা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত একই প্রশাসনের আওতায় থাকার পর দুটিকে বিভক্ত করে কলেজের প্রধান হিসেবে একজন প্রিন্সিপাল এবং হাসপাতালের প্রধান প্রশাসক হিসেবে একজন পরিচালক নিয়োগ করা হয়। যদিও দুটি প্রতিষ্ঠানই পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। মেডিকেল কলেজসহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ভবন ও সংস্থা এখন প্রায় ২৫ একর জমির উপর ছড়িয়ে আছে।

ভাষা আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঐতিহাসিক আমতলায় (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে, যেখানে নতুন অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স তৈরি হয়েছে) প্রতিবাদী ছাত্রদের সভার পর ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল শুরু হয়। পুলিশের বেপরোয়া লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও গ্রেপ্তারের কারণে শান্তিপূর্ণ মিছিল কিছুক্ষণের মধ্যে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দুপুরের পর পুলিশ গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে, ব্যারাক চত্বর ও তার আশপাশে গুলির আঘাতে শহীদ হন রফিক, বরকত ও জব্বার। বরকতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে জরুরি অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা লাশগুলো বর্তমান ডিসেকশন হলের পেছনে লুকিয়ে রেখেছিলেন পরদিন জানাজার জন্য, কিন্তু রাতে পুলিশ তা ছিনিয়ে নিয়ে যায় এবং আজিমপুর কবরস্থানে গোপনে দাফন করে।

মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজ

মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসক, তৎকালীন ছাত্র, কলেজ ও হাসপাতালে কর্মরত নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভূমিকা তিন ভাগে বর্ণনা করা যেতে পারে।

প্রথম ভাগে যাঁরা এই সময় কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের তৎপরতা। দ্বিতীয় ভাগে এ কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসকদের একটি অংশ, তৃতীয় ভাগ হলো যাঁরা অন্যান্য হাসপাতাল ও সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরে কর্মরত ছিলেন, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেছেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে যুদ্ধে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বেশির ভাগই ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তৎকালীন ছাত্র ও চিকিৎসকেরা বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছিলেন।

২৪- এর ‘জুলাই বিপ্লব’ বা গণ-অভ্যূত্থানে ঢামেকের ভূমিকা

২০২৪ সালের কোটা সংস্কারের দাবিতে চলা আন্দোলনে মেডিকেল ও ঢামেক শিক্ষার্থীরা নেতৃত্বে থাকার পাশাপাশি অন্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সমন্বয় করেন। তারা শুধুমাত্র কোটা বাতিল নয়, বরং সংশোধিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিও রাখেন, যার ফলস্বরূপ সরকার-ব্যাপক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌছায়।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে সারাদেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণ ও ছাত্রদের উপর হামলা ফলে আহত, নিহত আন্দোলনকারীরা ঢামেক হাসপাতাল পৌঁছাতেন যা ছিলো আহত ও নিহতদের চিকিৎসার কেন্দ্র। এখানে চিকিৎসক, ইন্টার্ন, নার্স ও শিক্ষার্থীরা রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে তাদের সেবা প্রদান করেন। কিন্তু, ১৫ ও ১৬ জুলাই-এর গণহত্যা চলাকালে হাসপাতালেও হামলা চালানো হয়।

ফলে ঢামেক চত্বর ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ছাত্রী-ছাত্রীরা মিছিল ও স্লোগানে প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে, যা সারা দেশে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। বাধা ও হামলার মাঝেও ঢামেকের শিক্ষার্থীরা আহতদের চিকিৎসা ও আন্দোলন চালিয়ে যান সাহসিকতার সঙ্গে।

এসএইচবি/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ঢাকা মেডিকেল কলেজ
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন খারিজ
হামে চিকিৎসা ব্যর্থতা ও শিশু মৃত্যুর দায়

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন খারিজ

হামে চিকিৎসা ব্যর্থতা ও শিশু মৃত্যুর দায়

ড. ইউনূস-নুরজাহান বেগমসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

হামে চিকিৎসা ব্যর্থতা ও শিশু মৃত্যুর দায়

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন খারিজ

হামে চিকিৎসা ব্যর্থতা ও শিশু মৃত্যুর দায়

ড. ইউনূস-নুরজাহান বেগমসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত