ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে ‘ভালো মশা’ উলবাকিয়া
মেডিভয়েস রিপোর্ট: ডেঙ্গু মোকাবেলায় বাংলাদেশের জলবায়ু উপযোগী করে এডিস মশার নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। উলবাকিয়া-সংক্রমিত এই ‘ভালো মশা’ প্রাকৃতিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত ভাইরাসের বিস্তার রোধ করতে সক্ষম হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মঙ্গলবার (৭ মে) আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ার কিআইএমআর বার্গহোফার চিকিৎসা গবেষণা ইনস্টিটিউট, কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের আইসিডিডিআর,বি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এই গবেষণায় অংশ নিয়েছে। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক জার্নাল ‘ন্যাচার’-এর ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ।
আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডেঙ্গু বাংলাদেশে একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৩ সালে এ রোগে এক হাজার সাতশর বেশি মৃত্যু এবং তিন লক্ষাধিক আক্রান্তের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে—যা বাংলাদেশের ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাসে ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। মূলত নগরায়ণ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার ব্যাপক বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে এটি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঐতিহ্যবাহী কীটনাশক ব্যবহার করে মশক নিয়ন্ত্রণ করা এখন মশার বাড়তি প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিজ্ঞানীরা আরও টেকসই বিকল্প অনুসন্ধান করতে শুরু করেছেন—যার মধ্যে রয়েছে ‘ভাল মশা’।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে উলবাকিয়া বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উলবাকিয়া প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যা প্রজাপতি, ফলমাছি ও কিছু মশার শরীরে সাধারণভাবে থাকে—কিন্তু এডিস মশার শরীরে এর উপস্থিতি নেই। তবে যখন এডিস মশাকে এই ব্যাকটেরিয়া দিয়ে সংক্রমিত করা হয়, তখন তারা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং জিকা ভাইরাস বহন ও সংক্রমণ করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। একই সাথে এই ব্যাকটেরিয়া মানুষ বা প্রাণীর শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারে না। কামড় বা সংস্পর্শের মাধ্যমেও এই ব্যাকটেরিয়া ছড়ায় না। তাই এটি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ।
এডিস মশার মধ্যে দুটি পদ্ধতিতে উলবাকিয়া ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। আইসিডিডিআর,বি জানায়, এর একটি ‘দমন পদ্ধতি’। এ পদ্ধতিতে শুধুমাত্র পুরুষ ‘ভাল মশা’ পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারা যখন বন্য স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন ডিম ফোটে না—ফলে মশা সংখ্যা হ্রাস পায়। অন্যদিকে, ‘প্রতিস্থাপন কৌশলে’ পুরুষ ও স্ত্রী দুই ধরনেরই ‘ভাল মশা’ উন্মুক্ত করা হয়। এতে উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া মশার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, উলবাকিয়া আক্রান্ত স্ত্রী মশা সফলভাবে এই ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে দেয়। যখন তারা আক্রান্ত বা অ-আক্রান্ত পুরুষ মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তাদের বংশধর স্বাস্থ্যবান হয়, যা তাদের প্রজনন সুবিধা প্রদান করে; তবে শেষ পর্যন্ত বন্য মশার জায়গা তারা নিয়ে নিবে। ফলে তারা ভাইরাস পরিবহন করতে সক্ষম হয় না।
উভয় পদ্ধতিই কয়েকটি দেশে অত্যন্ত সফল প্রমাণিত হয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে এই কৌশলের মাধ্যমে ডেঙ্গুর হার ৯৬% হ্রাস পেয়েছে। একই ধরনের সাফল্য দেখা গেছে ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, কলম্বিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রে।
গবেষকরা ডব্লিউএএলবিবি (WalbB) নামের একটি উলবাকিয়া স্ট্রেইন ব্যবহার করেছেন, যা ঢাকার উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশের জন্য উপযোগী। অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাগারে কুইন্সল্যান্ডের ভালো মশা ও ঢাকার স্থানীয় এডিস মশার সংকর প্রজননের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে একটি নতুন জাত—যার নাম উলবাকিয়া২-ঢাকা। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ‘ভালো মশা’ ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ানোর ক্ষমতা ৯২.৭% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ডিম পাড়ার হার, ডিম ফোটার হার ও বেঁচে থাকার হার—সবকিছুতেই এটি স্থানীয় মশার সমতুল্য।
আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, এটি নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ থাকতে পারে, কিন্তু এটি জেনেটিকালি পরিবর্তিত নয়। এটি এক ধরনের প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া-সংক্রমিত ‘ভালো মশা’, যা অনেক দেশে নিরাপদভাবে ব্যবহার হয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক হাসান মোহাম্মদ আল-আমিন বলেন, এই ফলাফল মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার পথ উন্মুক্ত করেছে। তবে বাস্তব প্রয়োগের আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে আইসিডিডিআর,বি জানায়, আইসিডিডিআর,বি ও কিউআইএমআরবির মধ্যে উপাদান স্থানান্তর চুক্তি (এমটিএ) স্বাক্ষর হয়েছে, যার ফলে গবেষণার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে ‘ভালো মশা’ আনা ও ছাড়ার অনুমোদন মিলেছে।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমীদ আহমেদ বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে একযোগে আমরা মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চালাতে প্রস্তুত। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধী টিকা নিয়েও আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি।’
গবেষকরা বলছেন, উলবাকিয়া-ভিত্তিক এই ভালো মশা প্রযুক্তি বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত পন্থা হতে পারে। তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য দরকার স্থানীয় জনগণের সচেতনতা, অংশগ্রহণ এবং পরিবেশগত মূল্যায়ন।
টিআই/এনএআর/
-
১২ মে, ২০২৬
-
১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
-
২০ জানুয়ারী, ২০২৬
-
১০ ডিসেম্বর, ২০২৫
-
২৮ নভেম্বর, ২০২৫
-
২৩ নভেম্বর, ২০২৫