১৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০ পিএম

‘তরুণ চিকিৎসকরা বিশ্বে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন’

‘তরুণ চিকিৎসকরা বিশ্বে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন’
মাহমুদুর রহমান

মেডিভয়েস রিপোর্ট: চিকিৎসকরা মানবসেবার যে স্তরের পৌঁছাতে পারেন, অন্য কারও পক্ষে সে স্তরে পৌঁছা সম্ভব হয় না বলে মনে করেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে তরুণরা যেভাবে সারা পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের মানচিত্র উজ্জ্বল করেছেন, সেভাবে নবীন চিকিৎসকরাও স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন।

আজ মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে রেটিনা মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কোচিংয়ের আয়োজনে ‘রেটিনা গ্র্যান্ড সেলিব্রেশন’ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘সংক্ষেপে দুটি ঘটনার কথা বলবো। একটা বাংলাদেশের ঘটনা। আপনার সামনে এক অপার সম্ভাবনার সুযোগ দাঁড়িয়ে আছে। তা কী? আমরা যদি পাঁচ আগস্টে ফিরে যাই, ফ্যাসিবাদের পতনের পর আমাদের চারপাশে যে হেজিমনি ভারত আছে, তারা মনে করলো আমাদের সাজা দেবে। কেন? কারণ তাদের যে এজেন্ট ১৫ বছর বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল। তরুণ সমাজ, আপনাদের ভাই-বোনেরা মহান বিপ্লবের মাধ্যমে তাকে উৎখাত করেছেন। সেজন্য তারা সাজা দিতে চাইলো। সাজাটা কী? বাংলাদেশের জনগণকে আর তারা চিকিৎসা করবে না। এ রকম একটি ঘোষণা ভারতীয় ডাক্তাররা দিয়ে দিলো এবং ভারত ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দিলো। এখানেই আপনাদের আসল কাজটা। আমি মনে করি, আপনাদের মতো তরুণেরা, আপনারা যখন ডাক্তার হবেন, বাংলাদেশ চিকিৎসাবিদ্যায় এতোটাই উন্নত হবে যে, আমাদের ভারতে যেতে হবে না। তারা আমাদের দেশে আসবে। আমি সেই বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যখন আমরা চিন্তা করবো, আমরা ভারতীয় নাগরিকদের চিকিৎসা দেবো, কি দেবো না। তবে আমি বলে দেই, বাংলাদেশের মানুষ অনেক মহৎ। তারা কোনোদিনও কোনো অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা দিতে অস্বীকার করবে না। এই বিশ্বাস আমার আছে। আমরা কোনো দিনও অতটা নিচে নামতে পারবো না।’

চিকিৎসকদের পেশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ আমি যদিও ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু আমি বলছি, মহত্বের বিচারে আপনাদের পেশা আমাদের চেয়ে অনেক উপরে। ইঞ্জিনিয়াররা আমার ওপর রাগ করতে পারেন। তারা বলতে পারেন, ইঞ্জিনিয়ারদের থেকে ডাক্তারদের এগিয়ে রাখছেন। আমি এগিয়ে রাখছি, সেই সমস্ত প্রকৃত ডাক্তারদের, যারা মানবতার সেবা করেন। আপনারা বাংলাদেশের মানুষের জন্য এবং বিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে সক্ষম হবেন ইনশাল্লাহ। যেমন করে তরুণরা জুলাই বিপ্লব করে সারা পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশের মানচিত্র নতুন করে উজ্জ্বল করেছেন, সে রকম আপনারা মেডিকেল পেশায় বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন।’

‘আর দ্বিতীয় ঘটনা হলো ফিলিস্তিন নিয়ে। ... মনটা খারাপ হয়ে যায়। একটু আগে ছেলেরা গান গাইলো ফিলিস্তিন নিয়ে এবং আমরা চিত্র দেখলাম। কোনো মুসলমান, মুসলমান কেন, কোনো মানুষই বোধ হয় এই চিত্র দেখে স্থির থাকতে পারেন না, যদি তার মধ্যে কোনো রকম মানবতা থাকে। বাংলাদেশের জনগণ যে, ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষের পাশে আছে, সেটা দুদিন আগে মার্চ ফর গাজা কর্মসূচিতে দেখাতে সক্ষম হয়েছি। সেদিন বাংলাদেশের বহু মানুষ মাইলে পর মাইল হেঁটে শুধু সংহতি প্রকাশ করতে এসেছিলেন’, যোগ করেন মাহমুদুর রহমান। 

তিনি আরও বলেন, জায়নিস্টরা ফিলিস্তিনে সব হাসপাতালে আক্রমণ চালাচ্ছে। তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হাসপাতালগুলো। কেন তারা হাসপাতালে আক্রমণ চালাচ্ছে? কারণ, তারা গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিতে চায়। 

আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক বলেন, ‘পৃথিবী যতগুলো ওয়ার ক্রাইম আছে, তার মধ্যে গণহত্যা ওয়ার ক্রাইম, খাদ্য আটকে দেওয়া ওয়ার ক্রাইম, পানি আটকে দেওয়া ওয়ার ক্রাইম—যা জায়নিস্ট ইসরায়েল করছে। কিন্তু সব থেকে বড় ওয়ার ক্রাইম হচ্ছে, চিকিৎসার জায়গা ধ্বংস করে দেওয়া। হাসপাতাল ধ্বংস করা এসব ক্রাইমের মধ্যে নিকৃষ্ট ক্রাইম এবং জায়নিস্ট ইসরায়েল তা করছে। সেখানে ডাক্তাররা কী অসীম সাহসের পরিচয় দিচ্ছেন। প্রত্যেক হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তাররা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইসরায়েলি আক্রমণের কাছে আত্মসমর্পণ না করে হাসপাতালে দাঁড়িয়ে আছে। সিভিলিয়ানরা চলে গেছে, রোগীরা চলে গেছে। কিন্তু ডাক্তাররা হাসপাতাল ত্যাগ করেননি। কেন করেননি? তারা বলেছেন, তাদের যে পেশা, সেই পেশায় তিনি নিহত হতে পারেন, কিন্তু দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হতে পারেন না। কাজেই ফিলিস্তিনের ডাক্তাররা দেখিয়েছেন, ডাক্তারি মহৎ পেশা। আমি আপনাদের অনুরোধ করবো, আপনারা ফিলিস্তিনের গাঁজার ডাক্তারদের মহৎ কর্ম থেকে অনুপ্রেরণা নেন। তারা কিন্তু টাকার জন্য চিকিৎসা দিচ্ছেন না। তারা ইমানের জন্য লড়াই করছেন।’

‘আমি মনে করি, মানুষের যন্ত্রণা লাঘব করার চেয়ে মহৎ কোনো কাজ হতে পারে না এবং যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য আপনারাই সর্বোত্তম ব্যক্তি। আমরা যে ইবাদাত করি এবং ইবাদাতের মধ্যে যে রিচুয়ালগুলো আছে, নামাজ, হজ্ব, যাকাত—এর বাইরে আমার কাছে বড় ধর্ম পালন মানুষের সেবা করা। সেটার সুযোগ আপনাদের আছে। এ কারণে আপনাদের প্রতি আমার এক ধরনের ইর্ষাও আছে যে, আপনারা মানবসেবার যে স্তরের পৌঁছাতে পারবেন, সেই স্তরে পৌঁছানো আমার পক্ষে সম্ভব না। কারণ আমি ডাক্তার নই’,—যোগ করেন মাহমুদুর রহমান।

এ সময় ছাত্রজীবনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেন এই প্রকৌশলী। বলেন, ‘আপনাদের মতো তরুণদের সামনে আমরা যখন দাঁড়াই, আমরা প্রবীণরা স্বাভাবিকভাবেই স্মৃতিকাতর হয়ে যাই, পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যাই। আপনারা মেধাবী। মেডিকেলে সুযোগ পেয়েছেন। আপনারা নিশ্চয় মানবতার সেবায় নিয়োজিত থাকবেন।’

অনুষ্ঠানে তরুণরা দেশের ভবিষ্যৎ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তরুণ মুখগুলো দেখে ভালো লাগছে। সবাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। তবে আমাকে কেন যে প্রধান অতিথি করা হলো, সেটা আমি বুঝতে পারছি না। মনে হয় এটা রেটিনার সেন্স অব হিউমার। কারণ আমি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র। বুয়েটের সাথে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বাদানুবাদ পুরনো। বেশ কিছু মজার স্মৃতি আছে আমার ছাত্রজীবনে। আমি শেরেবাংলা হলে থাকতাম। সেটা মেডিকেল কলেজ থেকে একটু দূরে। মেডিকেল কলেজের খুব কাছাকাছি বুয়েটের কয়েকটি হল ছিল। তার মধ্যে দুটি হলের নাম এখনো আমার মনে আছে। একটি নজরুল ইসলাম হল, আরেকটি আহসান উল্লাহ হল। আমরা শুনতাম যে, বাতি নিভে গেলে, অর্থাৎ লোশেডিং যখন হতো, তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী আর নজরুল ইসলাম হল ও আহসান উল্লা হলের ছাত্রদের মধ্যে এক ধরনের মক টেস্টের মতো মক ঝগড়া হতো। তাদের মধ্যে বিভিন্ন রকম শ্লীল এবং অশ্লীল কথা বিনিময় হতো। তার মধ্যে দুটি শ্লীল কথা মনে আছে আমার এখনো। মেডিকেল কলেজের  হলগুলো থেকে চিৎকার করে বলা হতো, এই মিস্ত্রীরা! অর্থাৎ আমাদের সবাই মিস্ত্রি ডাকতো সেই সময়। নজরুল ইসলাম হল থেকে বলতো, এই কবিরাজরা! এখন মনে হয়, ‍দুটিই সঠিক কথা ছিল। মনে হতো, দু’দল দুদলকে গালিগালাজ করছে, বিষয় কিন্তু সঠিক। কারণ ইঞ্জিনিয়ার তো আদতে মিস্ত্রিই।  আর কবিরাজদের কাজ হচ্ছে চিকিৎসা করা। তরুণ বয়সে এই ধরনের কথাগুলোর মধ্যেই দুই দল এক ধরনের পারস্পরিক আনন্দ উপভোগ। কাজেই বুয়েট আর ঢাকা মেডিকেল কলেজের যে লড়াই, এই লড়াই পুরনো লড়াই। আজকের তরুণরা এই লড়াই করে কিনা, আমি জানি না। হয় তো করে, হয় তো করে না। তবে বিষয়টা কিন্তু নির্দোষ লড়াই। দেখা যেতো বিদ্যুৎ এলে এক হল থেকে আরেক হলে গিয়ে ছেলেরা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করতো।’

রেটিনার প্রধান পরিচালক মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ ছিলেন একুশে পদক প্রাপ্ত বিশিষ্ট গাইনোকোলজিস্ট ও স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. সায়েবা আক্তার ও স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম প্রমুখ।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক