ইসলামি দর্শনের আলোকে মেডিকেল এথিক্স শিক্ষা দেওয়ার পরামর্শ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দাওয়াহর ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞান যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এথিক্স অ্যান্ড রিসার্চের (আইএমইআর) শরীয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. গিয়াস উদ্দীন তালুকদার।
বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত মেডিকেল দাওয়াহ সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় মেডিকেল এথিক্স ও ইসলামী দাওয়াহ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক গিয়াস উদ্দীন তালুকদার।
সেমিনারে ড. গিয়াস উদ্দীন তালুকদার বলেন, বাণিজ্যিক স্বার্থে অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে নিম্নমানের ওষুধ প্রেসক্রাইব করা মেডিকেল এথিক্সবিরুদ্ধ। এ ছাড়া যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে প্রেসক্রাইব করা যাবে না। এটাও মেডিকেল এথিক্সের সাথে সাংঘর্ষিক।
তিনি কোরআনের নির্দেশনা স্মরণ করিয়ে বলেন, ‘যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে তোমরা কথা বলো না।’ বরং এ বিষয়ে যিনি বিশেষজ্ঞ তাঁর নিকট পাঠাতে হবে।
ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, চিকিৎসা দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্ম অন্তরায় হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন মুসলিম অমুসলিমকে চিকিৎসা দিবে, একইভাবে একজন অমুসলিমও মুসলিমকে চিকিৎসা দিবে। এটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে স্বীকৃত। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় অপারেশন কোনোভাবেই মেডিকেল এথিক্স ও ইসলাম সমর্থন করে না।
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ইসলামের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ড. গিয়াস উদ্দীন তালুকদার বলেন, মাতৃগর্ভের জরায়ুর শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিতে যখন ডিম্বাণু শুক্রাণুর দ্বারা নিষিক্ত হয়, তখন সন্তানের লিঙ্গান্তর নির্ধারিত হয়ে যায়। এটিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে জিনগত বৈশিষ্ট্য স্থানান্তরিত হওয়া বুঝায়। কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেছেন, মিন নুতফাতিন খালাকাহু ফা-কাদদারাহু; অর্থাৎ, শুক্র থেকে তাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে সুপরিমিত করেছেন।’
ড. গিয়াসউদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘চিকিৎসাবিজ্ঞান দাওয়াহর ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। মাদক ও এইডসের মতো জীবন বিপন্নকারী ব্যাধি থেকে মুক্তিতে চিকিৎসার পাশাপাশি দাওয়াহ হতে পারে ওষুধ।’
ইসলামে স্বাস্থ্যকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হযরত তালুতকে (আ.) আল্লাহ তায়ালা রাজা হিসেবে ঘোষণা করেন। নাগরিকরা বললেন, তিনি কীভাবে রাজা হবেন? অথচ আমাদের ঐশ্বর্য, বৈভব, প্রতিপত্তি আছে। আল্লাহ বললেন, তার একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে দৈহিক শক্তি রয়েছে।’
‘আমরা মনে করি, পরহেযগার ব্যক্তি খুব রুগ্ন হবেন, সারাক্ষণ নানা অসুস্থতার মধ্যে থাকবেন। এজন্য সুস্থ থাকার পরও অসুস্থতার ভান করি, যেন মানুষ বুঝতে পারে আমি পরহেযগার। এটি ভুল ধারণা’—যোগ করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি একটি হাদীস তুলে ধরে বলেন, ‘তোমার ওপর শরীরের অধিকার রয়েছে। তার মানে ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নেওয়া আমার ওপর শরীরের অধিকার। অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া আমার ওপর শরীরের অধিকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘মেডিকেল এথিক্সের পাশাপাশি চিকিৎসকদের ইসলামি দর্শনে শিক্ষা দেওয়া হলে চিকিৎসকরাই হবেন সকল প্রশ্নের সমাধান।’
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মিজানুর রহমান আজহারী বলেন, চিকিৎসা একটি মহৎ পেশা। এর মাধ্যমে রোগীদের মধ্যে সত্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ অনেক বেশি।
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা সরাসরি রোগীদেরকে সেবা দেওয়ার সুযোগ পান। যুদ্ধে আহতদের সেবা দিতে পারেন। আগুনে পোড়া রোগীদেরকে সেবা দিতে পারেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত, যাদের যাওয়ার আর জায়গা নেই, তাদের সেবা দিতে পারেন। যে কোনো রোগ বালাইয়ে আক্রান্তদের সেবা দিতে পারেন। যে কোনো পরিস্থিতিতে যখন একজন মানুষ অসুস্থ হয়, তখন তাকে আপনি সেবা দিতে পারছেন। এই সময় তার মনটা নরম থাকে, তার মধ্যে একটি অসতায়ত্ব কাজ করে। ওই সময় রোগীরা চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়, ফলে এই সময় তাদের মধ্যে ইসলামের কথা পৌঁছানো সহজ।’
আরোগ্যের ক্ষেত্রে রোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. মিজানুর রহমান আজহারী। বলেন, ‘মৌখিক দাওয়াতের চেয়ে প্রায়োগিক দাওয়াত বেশি কার্যকর। অর্থাৎ একজন চিকিৎসক তার চলনে-বলনে, ব্যক্তিত্বে, লেন-দেন, আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করলে তা বেশি কাযর্কর। রোগীদের মধ্যে আচরণ দিয়ে যে বার্তা দেওয়া যায়, তা বেশি কার্যকর।’
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকরা যখন ইসলামী দাওয়াত দেন, তখন মানুষ তাদের সম্মান করে এবং তাদের কথার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
এসএইচবি/এনএআর/