অনুপস্থিতদের উপস্থিত দেখিয়ে বেতন উত্তোলন
সিওমেক হাসপাতালের ৩ নার্স সাময়িক বরখাস্ত, সেবা তত্ত্বাবধায়ককে শোকজ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: অনুপস্থিত নার্সদের উপস্থিত দেখিয়ে বেতন-ভাতা উত্তোলন ও আত্মসাতের অভিযোগে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ (সিওমেক) হাসপাতালের তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক রিনা বেগমকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ প্রদান করা হয়েছে।
একই সাথে বছরের পর বছর অনুপস্থিত থাকায় সাত নার্সকে অপসারণ করা হয়েছে। অনুপস্থিত আরও সাত নার্সকে দেওয়া হয়েছে শোকজ নোটিশ।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের যুগ্মসচিব মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ স্বাক্ষরিত একাধিক অফিস আদেশ ও চিঠিতে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৪৩ জন নার্স দীর্ঘদিন থেকেই কর্মস্থলে আসেন না। এর মধ্যে ১৬ জনকে উপস্থিত দেখিয়ে বেতন-ভাতা বাবদ ১৮ লক্ষ চার হাজার ১০৫ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলন করা হয়েছে। হাসপাতালটির সেবা তত্ত্বাবধায়ক রিনা বেগম, সিনিয়র স্টাফ নার্স তৃষ্ণা তেরেজা ডি কস্তা, আসমা আক্তার ও এমএফকে আল-জান্নাহর বিরুদ্ধেই এসব অভিযোগ। এ ঘটনায় রিনা বেগমকে শোকজ করা হয়েছে। শোকজ ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে তৃষ্ণা তেরেজা ডি কস্তা ও আসমা আক্তারকে। আর শোকজ ছাড়াই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এমএফকে আল-জান্নাহকে।
সিনিয়র স্টাফ নার্স এমএফকে আল-জান্নাহ ২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগদান করেন। কিন্তু ২০১৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত তিনি। তবে তখন থেকে পরবর্তী ২২ মাসের বেতন-ভাতা বাবদ সাত লক্ষ পঁচানব্বই হাজার ৯০৫ টাকা অবৈধভাবে উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এজন্য সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও অসদাচরণের দায়ে তাকে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে এ সময়ে তিনি খোরপোষ ভাতা পাবেন।
অপরদিকে ১৬ জন নার্সকে উপস্থিত দেখিয়ে অতিরিক্ত ভাতা অবৈধভাবে উত্তোলনের দায়ে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে সেবা তত্ত্বাবধায়ক রিনা বেগমকে। বুধবার (৮ জানুয়ারি) নার্সিং অধিদপ্তরের মহাপরিচালক স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির গত ২৭ আগস্ট দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে ৪৩ জনের মধ্যে ১৬ জন নার্স অনুপস্থিত হলেও আপনি অতিরিক্ত বেতন ভাতা অবৈধভাবে উত্তোলন করেছেন মর্মে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে আপনার উপর অর্পিত সরকারি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে চরম অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায়, যা অসদাচরণের শামিল।
তবে সিনিয়র স্টাফ নার্স তৃষ্ণা তেরেজা ডি কস্তা ও আসমা আক্তারের বিরুদ্ধে অবৈধ উত্তোলনের পাশাপাশি আইবাস++ সিস্টেমে অনুপস্থিত কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা দাখিল করা ও ভিডিও ফরওয়ার্ডিংয়ের কাজে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে। এজন্য তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সাথে সাত কর্মদিবসের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে তাদের।
অনুপস্থিত সাত নার্সকে অপসারণ
মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ স্বাক্ষরিত পৃথক অফিস আদেশে সাত সিনিয়র স্টাফ নার্সকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। তারা হলেন রিপ্না বেগম, শাহানুর তালুকদার, শিরীন সুলতানা, জান্নাতুল ফেরদৌস, লাভলী বেগম, তাসলিমা আক্তার ও জাকেরা সিদ্দিকা তাপাদার।
এর মধ্যে ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে শাহানুর, ৩০ নভেম্বর থেকে জান্নাতুল ফেরদৌস, ২০২৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে রিপ্না বেগম, ২৩ মে থেকে শিরীন সুলতানা, ২৯ জুলাই থেকে তাসলিমা ও ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত লাভলী বেগম।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, এদের প্রত্যেককে গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক স্মারকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু তারা এর কোনো জবাব দাখিল করেননি। এ ছাড়া তারা দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে সরকারি হাসপাতালে সেবা প্রদানে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
একে সরকারি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা ও শিক্ষানবীশকালে চাকরিতে বহাল থাকার অনুপযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অফিস আদেশে। শিক্ষানবীশ হওয়ায় বিধি মোতাবেক পুনরায় শোকজ নোটিশ জারি ছাড়াই তাদের চাকরি থেকে অপসারণ করা যাবে বলেও উল্লেখ রয়েছে এতে।
এ অবস্থায় অফিস আদেশে তাদের সকলকে অনুপস্থিতির তারিখ থেকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে।
কারণ দর্শানোর নোটিশ আরও সাত নার্সকে
এর আগে ৬ জানুয়ারি পৃথক চিঠিতে আরও সাত সিনিয়র স্টাফ নার্সকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। শোকজ নোটিশপ্রাপ্ত নার্সরা হলেন ঝিলি ধর, শাহিন মিয়া, মো. আলী আশরাফ কামরুল, জাহেদ আহমেদ, শাহনাজ আক্তার খান, মো. একরামুল হক ও লাভা দেবী তালুকদার।
এর মধ্যে মো. একরামুল হক ২০২১ সালের ১ অক্টোবর, শাহনাজ আক্তার খান ২০২২ সালের ২৮ আগস্ট ও একই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ঝিলি ধর, ৪ নভেম্বর শাহিন মিয়া ও ৩০ নভেম্বর থেকে মো. আলী আশরাফ কামরুল হাসপাতালে আসেন না। আর জাহেদ আহমেদ ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল ও লাভা দেবী তালুকদার আসনে না একই বছরের ৩০ জুলাই থেকে।
এসব নার্সকেও গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি অনুপস্থিতির কারণ জানাতে শোকজ নোটিশ প্রেরণ করা হয়। কিন্তু এ পর্যন্ত তারা কোনো জবাব দেননি। একে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-২০১৮ অনুযায়ী অসদাচরণ ও পলায়ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।
এসব বিষয় উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘একই বিধিমালার ৪(৩)(ঘ) অনুযায়ী কেন আপনাকে চাকরি হতে বরখাস্ত করা হবে না বা এই বিধির আওতায় অন্য কোনো যথোপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা হবে না, সে মর্মে এই অভিযোগনামা পাওয়ার ১০ কর্মদিবসের মধ্যে আপনাকে কারণ দর্শানোর জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো। এ বিষয়ে আপনি ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক কিনা তাও জানানো জন্য বলা হলো।’
উল্লেখ্য, বছরের পর বছর অনুপস্থিত ১৬ নার্সকে উপস্থিত দেখিয়ে বেতন-ভাতা উত্তোলনের সাথে জড়িত থাকার দায়ে গত ৩১ ডিসেম্বর সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ (সিওমেক) হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক রিনা বেগমসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। একই সাথে অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকা নার্সদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সাথে উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
এনএআর/