জুলাই গণঅভ্যুত্থান: ‘ঢাকা মেডিকেলে লাশের উপর দিয়ে হেঁটেছি’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে লাশের স্তূপ তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ঢামেক ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটির সভাপতি ডা. আবরার হামিম। তিনি বলেন, এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যেতে একের পর এক লাশ অতিক্রম করতে হয়েছে।
শনিবার (২৩ নভেম্বর) ঢাকা মেডিকেলের শহীদ ডা. মিলন অডিটোরিয়ামে ‘জুলাই বিপ্লবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’ শীর্ষক সেমিনারে স্মৃতিচারণ করে এসব কথা বলেন তিনি।
১৯ জুলাই রাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ডা. হামিম বলেন, ‘ইন্টার্ন অবস্থায় আমরা যখন ক্যাজুয়ালটির মধ্যে ছুটেছি, আমাদেরকে বারবার কল এসেছে, তোরা তাড়াতাড়ি চলে আয়, কারণ ইন্টার্ন প্রয়োজন, ডাক্তার প্রয়োজন। আমরা ইমার্জেন্সির মধ্যে যাই। শুক্রবার (১৯ জুলাই) রাতে, গিয়ে দেখি ভয়ানক অবস্থা। দেশের কোনো মিডিয়া সেখানে নেই। কোনো মিডিয়ার কাভারেজ সেখানে ছিল না। সেখানে আমরা যখন যাই, রক্তাক্ত লাশ একের পর এক আসতে থাকে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আট নম্বর রুমে-সাত নম্বর রুমে লাশের উপর দিয়ে আমরা হাঁটি। একটার উপর একটা লাশের উপর দিয়ে আমরা হাঁটি, আমি ভিডিও করেছিলাম, অনেক লুকিয়ে, অনেক ভয়ে।’
তিনি বলেন, ‘আমি খুঁজেছিলাম মিডিয়া কোথায় আছে। কিন্তু সেখানে মিডিয়া নেই। মিডিয়া তখন চাপে ছিল, হয়তো আসতে পারেনি। কিন্তু একজন সাংবাদিক লুকিয়ে লুকিয়ে ছবি তুলছিলেন। ওর সাহায্য নিয়ে আমি কিছু ছবি তুলেছিলাম। অনলাইন মিডিয়ার মাধ্যমে ওই ছবিগুলো বাইরে পাঠাতাম। অনেকগুলো ছবি পরে ভাইরাল হয়েছিল। আলহামদুলিল্লাহ, সে ছবিগুলো কেউ আটকে রাখতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে যখন আমরা যাই, আমাদের কিছু স্যার সারারাত ধরে ওটি করেছেন, একের পর এক অপারেশনের রোগী এসেছে।’
ডা. আবরার হামিম আরও বলেন, ‘একটি শিশু এসেছিল, তার চোখের পাশ দিয়ে গুলি ঢুকেছিল, আপনারা তার কাহিনী শুনেছেন; আমরা তাকে দেখেছি। সেই শিশুকে যখন অপারেশনের জন্য নেওয়া হয়, তখন সেখানে রক্তের হাহাকার। তখন ঢাকা মেডিকেলের ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. নাইম পুরো মেডিকেলের জন্য রক্তের ব্যবস্থা করেন। ওই রাতে যারা মেডিসিন, সার্জারি, গাইনিতে ডিউটিরত ছিল, তারা জানেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজে ওই দিন একটা বিষয় ছিল, যেখানেই রোগী আছে, রক্তের কোনো ঘাটতি নেই। ওই রক্তের কারণেই ওইদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজে অনেক মানুষ তার জীবন ফিরে পেয়েছিল। ওই দিন সম্ভব ছিল না, তার পক্ষে রক্তের ব্যবস্থা করা, কারণ শত শত ব্যাগ রক্ত লেগেছিল, কিন্তু তা হয়েছে।’
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের অবদান তুলে ধরে ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটির সভাপতি বলেন, ‘জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে আমাদের ছেলেরা যখন প্রথম শহীদ মিনারের সামনে যায়, ফজলে রাব্বি ও আলিম হল থেকে ছেলেমেয়েরা বের হয়, তাদের আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় যখন তাদেরকে মারা হয়, সেই মুহূর্তেও আলিম হল থেকে কিছু মেয়ে মেডিকেলের সামনে বসে আন্দোলন চালিয়ে যায়। বুক ভরা গর্বে আমাদের মাথা উঁচু হয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি সেদিন ইন্টার্ন ডিউটি থেকে ফিরছিলাম। আর আলিম হলের কিছু মেয়ে ক্যাম্পাসের সামনে বসে আন্দোলনের স্লোগান দিচ্ছিল। ছেলেরা শেষে বের হতে পারেনি, কারণ ছাত্রলীগ তাদের গেইট আটকে রেখেছিল। আমি যখন ঢুকছিলাম, তখন কয়েকজন ছাত্রকে মারা হচ্ছিল। কিন্তু সেই অবস্থায়ও আলিম হলের মেয়েরা থেমে যায়নি। আমরা গর্ব ভরে তাদের স্মরণ করি।’
এত আন্দোলন-সংগ্রামের পরও চিকিৎসক সমাজ অবহেলিত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ডা. আবরার হামিম। তিনি বলেন, ‘আজকে যদি আমরা চিন্তা করি, এই ঢাকা মেডিকেল কলেজের এই ডাক্তারদের অবস্থা; যারা আন্দোলন-সংগ্রামে এত ভূমিকা রেখেছিল, আজকে তাদের কি সঠিক মূল্যায়ন দেওয়া হয়েছে? দেওয়া হয়নি। বরং নতুন যে আইন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, সে আইনের মধ্যে এমবিবিএস ছাড়াও ডিএমএফদেরকেও ডাক্তার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।’
চিকিৎসকদের আরও বেশি কদর করা উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পিছনে থেকে যারা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে কন্ট্রোল করছে, দিনশেষে সেই ডাক্তাররাই মার খায়। কারণ আমলা পর্যায়ে যারা আছেন, তারা এসি গাড়িতে চলেন। তাদের বউয়ের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারকে তার বাসায় যেতে হয়। আজকে ডাক্তাররা মার খাচ্ছে, অথচ এখন পর্যন্ত চিকিৎসক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন হয়নি। আর কবে? কোন সরকারের আমলে আমরা দেখবো চিকিৎসক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন হয়েছে? আমরা এই সরকারের প্রতি আস্থা রাখি, তারা এদিকে নজর দিবেন।’
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নির্বাহী কমিটির সদস্য তারিকুল ইসলাম ও ঢামেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. কামরুল আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এনএআর/এমইউ
-
২৫ অগাস্ট, ২০২৫
ট্রাইব্যুনালে চিকিৎসকের জবানবন্দি
অভ্যুত্থানে এক চোখ অন্ধ হয়েছে ৪৯৩ জনের, ১১ জন হারিয়েছেন দুই চোখ
-
২২ অগাস্ট, ২০২৫
-
০৯ অগাস্ট, ২০২৫
-
১৮ জুলাই, ২০২৫
-
০২ জুন, ২০২৫
গণঅভ্যুত্থানে হামলা-ভাঙচুর-হত্যাচেষ্টা
চাকরি হারাচ্ছেন বিএমইউর চিকিৎসকসহ ৩৪ কর্মকর্তা-কর্মচারী