১৮ জুলাই, ২০২৫ ০৩:৫২ পিএম

ডা. সজীবের প্রথম শাহাদাতবার্ষিকী আজ: ছেলের শোকে শয্যাশায়ী মা

ডা. সজীবের প্রথম শাহাদাতবার্ষিকী আজ: ছেলের শোকে শয্যাশায়ী মা
শহীদ ডা. সজীব সরকার।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ছোটভাইকে নিতে ঢাকায় এসেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ডা. সজীব সরকার। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় শেষবারের মতো অসুস্থ মায়ের কপালে চুমু এঁকে দিয়েছিলেন। ঠিকঠাক ঢাকায় পৌঁছেছিলেনও। কিন্তু ছোটভাই আব্দুল্লাহকে নিয়ে আর মায়ের কোলে ফেরা হয়নি তাঁর। গত বছরের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরার আজমপুরে পুলিশের বর্বর আক্রমণে শাহাদাত বরণ করেন তিনি। আজ শুক্রবার (১৮ জুলাই) তাঁর প্রথম শাহাদাতবার্ষিকী।

পরিবারের বড় ও একমাত্র কর্মক্ষম সন্তান হিসেবে ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনা ও মায়ের চিকিৎসার খরচ বহন করছিলেন ডা. সজীব সরকার। বাবা হালিম সরকার সরকারি চাকরিজীবী, এখন অবসরের অপেক্ষায়। সজীবের মৃত্যুর দশ দিন পরই আগের ভাড়া বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তার পরিবার। সজীবনির্ভর পুরো পরিবার যেন দিন পার করছে বুকে পাথর চাপা দিয়ে। সন্তান শোকে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন শহীদের মা ঝর্ণা বেগম।

পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মাত্র এক ফিট দূরত্ব থেকে করা একটি গুলি ডা. সজীব সরকারের হৃৎপিণ্ড ভেদ করে ডান দিকের স্কাপুলারের (কাঁধের হাড়) নিচে দিয়ে বের হয়ে যায়। তাঁকে বাঁচাতে জুলাই অভ্যুত্থানের ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধারা নিয়ে যান উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে নিভে গেছে প্রাণপ্রদীপ। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

শাহাদাতের অল্প কিছুক্ষণ আগে ছোটবোন সুমাইয়া সরকার স্বর্ণার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সজীব সরকারের। ১৭ জুলাই ছিল তার জন্মদিন। স্বর্ণা ডা. সজীবকে জন্মদিনের শুভেচ্ছাও জানিয়েছিলেন। পরে শহীদ হওয়ার আগে চাচাতো ভাই ডা. অনিকুর রহমানকে পাঠিয়েছিলেন শেষ ক্ষুদেবার্তা। বলেছিলেন, পুলিশ খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। সবার কাছে দোয়াও চেয়েছিলেন তিনি।

পরিবারের তথ্যমতে, উত্তরার একটি মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছোটভাই আব্দুল্লাহকে নিতে গ্রামের বাড়ি নরসিংদী থেকে ঢাকায় এসেছিলেন সজীব সরকার। সন্ধ্যা আনুমানিক ছয়টার দিকে আজমপুর এলাকায় পৌঁছান তিনি। এ সময় কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। এক পর্যায়ে পুলিশ ডা. সজীব সরকারকে ঘিরে ফেলে।

শাহাদাতের বিবরণ দিয়ে গত বছরের ২৯ জুলাই শহীদ ডা. সজীব সরকারের চাচাতো ভাই ডা. অনিকুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ভাইকে নিয়ে ফেরার পথে বিকেল পাঁচটা ৪৫ মিনিটের দিকে এক ক্ষুদেবার্তায় ডা. সজীব আমাকে জানান, পুলিশ তার কাছাকাছি রয়েছে। তাই নিরাপদে ফিরতে সবার দোয়া চান।’

‘সাথে সাথে আমি মুঠোফোনে কল এবং বার্তা পাঠাই। কিন্তু সাড়া পাওয়া যায়নি। তার ঠিক এক ঘণ্টা পরে একজন ফোন ধরে জানালো, ডা. সজীবের লাশ উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে এবং পুলিশের গুলিতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে’—যোগ করেন ডা. অনিক।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে ডা. সজীবকে পেটে লাথি দেওয়া হয়েছিল। আঘাতের তীব্রতা সইতে না পেরে বসে পড়েন তিনি। আর এই অবস্থায় এক ফিট দূরত্বের মধ্যে উপর থেকে তাকে গুলি করা হয়। উপর থেকে নিচ অ্যাঙ্গেলে একটা গুলি করা হয়। গুলিটা হার্টে লেগে ডান দিকের স্কাপুলার (কাঁধের হাড়) নিচে দিয়ে বের হয়ে যায়। উত্তরা আধুনিক মেডিকেলের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ডা. সজিব গুলি খাওয়ার এক মিনিটের মধ্যে মারা গেছেন।’

পরে মেডিভয়েসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. সজীব সরকারের মা ঝর্ণা বেগম বলেন, ‘সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আমার হাতে চার হাজার টাকা দিয়ে সে বিদায় নিয়েছে। বলেছে, মা টাকাটা রাখো, প্রয়োজনে খরচ করিও। যাওয়ার সময় কপালে একটা চুমু দিয়ে গেছে। তিনবার ডাক দিয়েছে, বলেছে—মা আমি যাই। আমি বলেছি, সাবধানে যেও। নিজের খেয়াল রেখো। আল্লাহ তোমার হেফাজত করবে।’

এরপর রাতে লাশ নরসিংদী পৌঁছার পর ডা জানতে পারেন সজীব সরকার আর নেই। দীর্ঘদিনের বাসস্থান নরসিংদী সদরের জেলখানা মোড় এলাকায় ডা. সজীবের জানাযার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু পুলিশের বাধায় জানাযা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়।

প্রসঙ্গত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ডা. সজীব সরকারকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় পলাতক শেখ হাসিনাসহ ৭১ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। গত ২২সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বরাবর এ অভিযোগ দায়ের করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশের সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

ডা. সজীব সরকারের বাড়ি নরসিংদী সদরের জেলখানা মোড় এলাকায়। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। তিনি গাজীপুরের তাইরুন্নেছা মেমোরিয়াল মেডিকেল কলেজের ২০১১-২০১২ সেশনের শিক্ষার্থী। ব্যক্তিগত জীবনে ডা. সজীব সরকার বিবাহিত ছিলেন।

এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : শহীদ ডা. সজিব সরকার
ওজিএসবির ৩৪তম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বক্তারা

তৃণমূলে নিরাপদ প্রসবে বড় প্রতিবন্ধক জনবল ও অবকাঠামো সংকট

ওজিএসবির ৩৪তম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বক্তারা

তৃণমূলে নিরাপদ প্রসবে বড় প্রতিবন্ধক জনবল ও অবকাঠামো সংকট

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক