রক্তাক্ত জুলাই: মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মুত্তাকিনের শাহাদাত দিবস আজ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মুত্তাকিন শুধু পেশাগত দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল তার জীবনের ব্রত। তাই উত্তাল জুলাইয়ের দিনগুলোতে চারদেয়ালে নিজেকে বন্দি রাখতে পারেননি তিনি। দেড় দশকের স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে চলা ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু থেকেই নিয়মিত অংশ নিতেন কর্মসূচিতে। দিনের বেলা দায়িত্ব পালন করতেন হাসপাতালে, আর অফিস শেষে যোগ দিতেন আন্দোলনে। ক্লান্ত, ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে গভীর রাতে বাসায় ফিরতেন তিনি। আন্দোলনের এই পথ ধরেই ১৯ জুলাই বিকেলে মিরপুর-১০ নম্বরে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন এই স্বাস্থ্যকর্মী। আর ওই দিন দিবাগত রাতে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।
স্বামীর আন্দোলনে যোগ দেওয়ার স্মৃতিচারণ করে মুত্তাকিনের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট স্ত্রী নাঈমা এরিন নিতু মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মুত্তাকিন সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার খবর টেলিভিশনে দেখলে তিনি বলতেন, তাদের অন্যায়ভাবে কেন মারা হবে? তাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া উচিত। অফিস শেষে প্রায় প্রতিদিনই তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতেন।’
নিতু জানান, ১৮ জুলাই রাতে বাসায় ফিরে মুত্তাকিন মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঘামে ভিজে ছিলেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়েছিল। ওই ঘটনার পর আন্দোলনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তিনি আরও দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন।
পরদিন ১৯ জুলাই অফিস শেষে আবারও আন্দোলনে যোগ দেন মুত্তাকিন। সেদিন আন্দোলনের মাঝেও স্ত্রীর সঙ্গে কয়েক দফা মোবাইল ফোনে কথা হয় তার। স্ত্রীকে তিনি জানান, এক ঘণ্টা দেরি হবে, কারণ তিনি আন্দোলনে রয়েছেন। একই সময়ে তার পাশে থাকা ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর গুলিবিদ্ধ হলে চিকিৎসাকর্মী হিসেবে মুত্তাকিন তাকে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
নাঈমা এরিন নিতু বলেন, ‘আমি তাকে বারবার বাসায় ফিরে আসতে বলেছিলাম। এমনকি হাসপাতালের গেটেও অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, তুমি আসার দরকার নেই। আমি সাবধানে আছি, কোনো সমস্যা হবে না।'
মুত্তাকিনের সহযোদ্ধা ও সরকারি বাংলা কলেজের শিক্ষার্থী সাকিব জানান, জুমার নামাজের পর আন্দোলনকারীরা আবারও মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় জড়ো হন। আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়। বিকেল ৫টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর ওভারব্রিজের নিচে গুলি শুরু হলে মুত্তাকিনের মাথায় গুলি লাগে। তিনি ঘটনাস্থলেই সড়কে লুটিয়ে পড়েন।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে পাশের আল হেলাল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ইবনে সিনা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. ফেরদৌস মাহমুদ বলেন, ‘মুত্তাকিনকে হাসপাতালে আনার পর জরুরি বিভাগে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। মস্তিষ্কের আঘাতের মাত্রা নির্ণয়ে দ্রুত সিটি স্ক্যান করা হয়। পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। তখনও মাথার ক্ষতস্থান থেকে ব্যাপক রক্তক্ষরণ হচ্ছিল এবং মস্তিষ্কের টিস্যু বাইরে বেরিয়ে আসছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘রক্তের গ্রুপ নিশ্চিত হওয়ার পর দ্রুত রক্ত দেওয়া শুরু করা হয়। রক্তচাপ কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও স্যালাইন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে চিকিৎসক দল ক্ষতস্থান সেলাই করে রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু গুলিতে মস্তিষ্কের টিস্যু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কোনোভাবেই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছিল না।’
ইবনে সিনা হাসপাতালের আরেকজন চিকিৎসক ডা. এবিএম আল আমিন বলেন, মুত্তাকিনের মাথার এক পাশ দিয়ে গুলি প্রবেশ করে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
এদিকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে আন্দোলনকারীরা অনেক চেষ্টা করে মুত্তাকিনের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্বামীর এমন সংবাদ শুনে নাঈমা এরিন নিতু জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
স্বজনদের অভিযোগ, সে সময় আন্দোলনকারী আহতদের চিকিৎসা দেওয়া নিয়েও নানা বাধার মুখে পড়তে হয় চিকিৎসকদের। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য মুত্তাকিনকে জাতীয় ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু স্বৈরশাসকের অনুগামী হাসপাতাল প্রশাসকদের অনুমতি না পাওয়ায় সেখানে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি।
উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত তাকে তার কর্মস্থল সেলিনা হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর রাতে মারা যান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই সাহসী যোদ্ধা। মুত্তাকিনের অকাল মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে পরিবারজুড়ে। তবে স্বামীর আত্মত্যাগ নিয়ে গর্বও প্রকাশ করেন তার স্ত্রী।
নাঈমা এরিন নিতু বলেন, ‘আমার গর্ব, আমার শক্তি একজন শহীদের সন্তানকে বড় করছি। এটাই আমার সম্বল, এটাই আমার প্রেরণা।’
একই সঙ্গে তিনি ঘটনার বিচার দাবি করে বলেন, ‘যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তারা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করলে পুরো ঘটনা স্পষ্ট হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
জুলাই আন্দোলনে মুত্তাকিনের মতো অসংখ্য তরুণ প্রাণ হারিয়ে গেছে। স্বজনদের প্রত্যাশা, তাদের আত্মত্যাগের সঠিক মূল্যায়নের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে।
এনএইচ/এমইউ