ছয় দাবিতে টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট পরিষদের মানববন্ধন
মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্বতন্ত্র পরিদপ্তর গঠন ও ডিপ্লোমাধারীদের ১০ম গ্রেড পদমর্যাদা প্রদানসহ ছয়টি দাবিতে মানববন্ধন করেছে বৈষম্যবিরোধী জাতীয় মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট পরিষদ। বুধবার (২০ নভেম্বর) সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ একযোগে রাজধানীর ১৪টি হাসপাতালে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে সংগঠনটির সভাপতি আব্দুস সামাদ ও মহাসচিব মো. রিপন শিকদার এক প্রেস রিলিজে তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবাকে গণমুখী করতে হলে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট সকল জনবলের অধিকার সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রেস রিলিজে নেতৃবৃন্দ বলেন, চিকিৎসক-নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের পেশাগত সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করতে সকলকে নিয়েই একটি অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। একটি জনমুখী কল্যাণকর সাম্যবাদী রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে জুলাই বিপ্লব অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়।
তারা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা একটি টিমওয়ার্ক। যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তত্ত্বাবধানে চিকিৎসক ও নার্সদের পাশাপাশি মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। রোগীদের সেবাদান কার্যক্রমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো রোগ নির্ণয়,যার পুরোধা বলা হয় মেডিকেল টেকনোলজিস্টদেরকেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেবা পরিদপ্তর নার্সিং ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গঠিত হয় ১৯৭৭ সালে। কাজের পরিধি বৃদ্ধি ও জনবলের আকার বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যতা রেখে ২০১৬ সালের ১৬ নভেম্বর পরিদপ্তরকে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর হিসেবে উন্নীত করা হয়। কিন্তু ৪০ হাজারেরও বেশি পেশাজীবী মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের কোনো স্বতন্ত্র পরিদপ্তর বা উইং না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তারা বলেন, অতীব দুঃখের বিষয় যে স্বাস্থ্য সেবা ও শিক্ষা উভয় বিভাগের অধীনস্ত মেডিকেল টেকনোলজি শিক্ষা ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পেশাজীবীদের পেশাগত লক্ষ্য বাস্তবায়ন, বদলি, পদোন্নতি, উন্নত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সমন্বয়ের জন্য কোনো উইং, পরিদপ্তর বা অধিদপ্তর নেই।
তারা বলেন, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত দেশে সরকারি পর্যায়ে ২৩টি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ৬৫টিরও অধিক আইএইচটিতে আটটি অনুষদে ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজি ও ফার্মেসি পাশকৃত ডিগ্রিধারীদের চাকরি সংক্রান্ত সার্বিক বিষয়াদি, তাদের বদলি-পদোন্নতি সংক্রান্ত বিষয় দেখভাল করার জন্য স্বতন্ত্র কোনো ব্যবস্থা নেই। এই ৪০ হাজারেরও বেশি জনবলের পরিকল্পনামাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো প্রকার দপ্তরের ব্যবস্থা না থাকা দুঃখজনক বিষয়।
তারা আরও বলেন, দীর্ঘ ১৪ বছরেরও অধিক সময় প্রশাসনিক জটিলতায় মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সরকারি চাকরিতে কর্মরত মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সংখ্যা মাত্র চার হাজার ১০৬। যেখানে পদ মাত্র পাঁচ হাজার ৯৭৫। চিকিৎসক ও নার্সের বিদ্যমান সংখ্যার অনুপাতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল ৮০ হাজারেরও বেশি।
এ ছাড়া নিয়োগ জটিলতা শেষে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট নবসৃষ্ট পদে ৮৮৯ জনকে নিয়োগ দেয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, যা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য। দীর্ঘদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় একটি বৃহৎ অংশের সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা পার হয়ে গেছে।
মেডিকেল টেকনোলজি শিক্ষায় ডিপ্লোমার পাশাপাশি বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে মেডিকেল টেকনোলজি বিষয়সমূহে উচ্চ শিক্ষা চালুর বিশ বছর পেরিয়ে গেলেও গ্র্যাজুয়েটদের জন্য কোনো প্রকার পদসৃজন করা হয়নি। ২০১৪ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে গঠিত একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি মেডিকেল টেকনোলজি শিক্ষায় সনদপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের জন্য অ্যাকাডেমিক, ক্লিনিক্যাল ও অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ শাখায় উপজেলা থেকে বিভাগীয় হাসপাতাল, ইনস্টিটিউট ও প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে পদ সৃজন সংক্রান্ত অর্গানোগ্রাম প্রস্তুত ও চূড়ান্ত সুপারিশ করলেও নানাবিধ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তা আটকে আছে বছরের পর বছর।
ছয় দফা দাবি
সেবার এই গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবীদের প্রতি দীর্ঘকাল বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে উল্লেখ করে তার আশু অবসানের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ছয় দফা দাবি তুলে ধরে সংগঠনটি। দাবিগুলো হলো—
১. স্বতন্ত্র পরিদপ্তর গঠন করতে হবে।
২. ডিপ্লোমাধারীদের ১০ম গ্রেড (দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড) পদমর্যাদা প্রদান করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী আনুপাতিক হারে পদ সৃজনপূর্বক দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে, পাশাপাশি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২০১৩ সালের স্থগিতকৃত নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
৩. গ্রাজুয়েট মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের নবম গ্রেডের পদ সৃষ্টিপূর্বক চাকরিজীবীদের আনুপাতিক হারে পদোন্নতির নিয়ম বহাল রেখে স্ট্যান্ডার্ড সেটআপ, নিয়োগবিধি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৪. ঢাকা ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিকে (আইএইচটি) ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামকরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল আইএইচটির জন্য মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্ট শিক্ষকদের স্বতন্ত্র ক্যারিয়ার প্ল্যান গঠন করে বিদ্যমান নিয়োগবিধি ও অসংগতিপূর্ণ গ্রেড সংশোধন করতে হবে।
৫. মেডিকেল টেকনোলজি কাউন্সিল গঠনের মাধ্যমে পেশাদার লাইসেন্স প্রদান, ডিপ্লোমা মেডিকেল এডুকেশন বোর্ড গঠন এবং প্রাইভেট সার্ভিস নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৬. বি ফার্মসহ সকল অনুষদের বিএসসি ও এমএসসি কোর্স চালু করা এবং স্কলারশিপসহ প্রশিক্ষণ ভাতা চালু করতে হবে।
পরিষদ জানিয়েছে, ছয় দফা দাবি আদায়ের ধারাবাহিক কর্মসূচি হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টার, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা ডেন্টাল কলেজ, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউট, জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় ক্যান্সার গবেষনা ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল এবং ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব কিডনী ডিজিজেসে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
এনএআর/