২১ মে, ২০২৩ ১২:১৫ পিএম

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগে ২৪ শতাংশ মাতৃমৃত্যু

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগে ২৪ শতাংশ মাতৃমৃত্যু
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ, ওজিএসবির সাবেক সভাপতি শাহলা খাতুন ও ওজিএসবির মহাসচিব ডা. ফারহানা দেওয়ানসহ বিশিষ্ট চিকিৎসকরা।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশের মোট মাতৃমৃত্যুর ২৪ শতাংশই গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগে হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। 

শনিবার (২০ মে) রাতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে চ্যাপ্টার অব অর্গানাইজেশন জেস্টোসিস ও অবস্টেট্রিকাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) প্রথম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বক্তারা এ কথা জানান।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশে ক্রমেই মারাত্মক পর্যায়ে যাচ্ছে উচ্চ রক্তচাপের রোগী। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দেশে যত মাতৃমৃত্যু হয়, তার ২৪ শতাংশই গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগে হয়। এ জন্য গর্ভবতীদের উচ্চ রক্তচাপ ঠেকাতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

তাঁরা আরও বলেন, গর্ভবতী মায়েদের জন্য জেস্টোসিস খুবই ভয়াবহ একটি রোগ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আমাদের সন্মিলিতভাবে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ করতে হবে, যা প্রসূতি ও গাইনোকোলজির অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবে। যার ফলে মা, মহিলা এবং নবজাতকের স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। জেস্টোসিসজনিত মৃত্যু কিভাবে শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা যায়, সে সম্পর্কেও তারা সচেতনতায় জোর দেন।

এ সময় বাংলাদেশ চ্যাপ্টার অব অর্গানাইজেশন জেস্টোসিসের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘গর্ভাবস্থায় জটিলতাগুলোর বিষয়ে সবারই জানা জরুরি। এই সময়ে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বেড়ে যায়, অনেকে অত্যাধিক বমি করে, এমনকি শকে চলে যায়, মৃত্যু পর্যন্ত হয়। এ জন্য গর্ভবতীদের উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, প্রতি দশজন গর্ভবতী নারীর একজন এই সমস্যায় ভোগেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মাতৃমৃত্যুর ২৪ ভাগই হয় একলেমশিয়ায়। এই বিষয়টিকে সামনে আনাই এই সংগঠনের উদ্দেশ্য। কম বয়সে, বেশি বয়সে এবং ঘনঘন বাচ্চা নিলে সমস্যাগুলো বেশি হয়। এ জন্য আমাদের কিশোরী বিবাহ রোধ, মুটিয়ে যাওয়া প্রতিরোধ এবং পুষ্টির মান ভালো রাখতে হবে।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ।

তিনি বলেন, ‘গর্ভাবস্থায় নারীদের উচ্চ রক্তচাপ এবং এর জটিলতা সম্পর্কে গাইনি চিকিৎসকদের নিয়ে আজকের এ আয়োজন। আমি মনে করি, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ, গর্ভ অবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ হয়, এমন শতকরা ১০ শতাংশ নারী পাওয়া যায়। এ অবস্থায় যদি যথাযথভাবে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে মায়ের ঝুঁকি ও জটিলতার আশঙ্কা থাকে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুও হতে পারে। তেমনি গর্ভের বাচ্চারও জটিলতা হতে পারে, এমনকি সেটা সন্তানের মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এ বিষয়গুলো সম্পর্কে চিকিৎসকদের অনেক বেশি জানা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু গর্ভবতী মায়ের ক্ষেত্রেই নয়, যে কারও জন্যই উচ্চ রক্তচাপ ঝুঁকির কারণ। কেউ যদি এটাকে কন্ট্রোল না করে, তাহলে ব্রেন অ্যাটাক হয়ে স্ট্রোক হতে পারে, হার্ট অ্যাটাক করে হার্ট ফেইলিওর হতে পারে। এমনকি কিডনি ফেইলিওরসহ চোখেরও ক্ষতি হতে পারে। সুতরাং এই বিষয়গুলোতে চিকিৎসকদের জোর দিতে বলেছি।’

প্রখ্যাত এ মেডিসিন বিশেষজ্ঞের মতে, অধিকাংশ নারীই এ বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেন না। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের উচিত হলো, নিজ দায়িত্বে একটু সময় বেশি দিয়ে রোগীকে বোঝানো এবং সচেতন করা। শুধু রোগী আসলো আর চিকিৎসক চিকিৎসা করে দিলো, এমনটা যেন না হয়। চিকিৎসার পাশাপাশি চিকিৎসকদের রোগ প্রতিরোধেও কাজ করা উচিত।

এ সময় ওজিএসবির মহাসচিব অধ্যাপক ডা. গুলশান আরা বলেন, ‘জেস্টোসিস রোগের মূল উপাদান হলো প্রি-একলামশিয়া ও একলামশিয়া (গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহ পর রক্তের চাপ স্বাভাবিক থেকে বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ওজন বেড়ে যাওয়া এবং পায়ে পানি জমে যাওয়া)। এই রোগটি যদি সময় মতো নির্ণয় এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করা না যায়, তাহলে মা এবং নবজাতকের মৃত্যু হয়ে থাকে।’

তিনি বলেন, ‘একলামশিয়া হলে গর্ভবতী মায়ের খিঁচুনি হয়। আমাদের দেশে এই রোগের কারণে মৃত্যুর হার ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি বছরে যে পরিমাণ মায়ের মৃত্যু হয়, তাদের মধ্যে প্রতি ১০০ জনে ২৪ জনের একলামশিয়ায় মৃত্যু হয়। আর ৩১ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হয় প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণের জন্য, যেটিও জেস্টোসিসের একটি রিচ-ফ্যাক্টর। এই যে শতকরা ৫৫ শতাংশ মায়ের মৃত্যু, যদি সময় মতো জেস্টোসিস রোগ নির্ণয় করা যায় একই সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে মৃত্যুগুলো রোধ করা সম্ভব হয়। তবে আমাদের দেশে একলামশিয়ায় আগের তুলনায় মৃত্যু হার কমেছে।’

গর্ভবতী মায়েদের করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জেস্টোসিস থেকে বাঁচতে মায়েদেরকে এন্টিনেটাল় চেকআপ করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এন্টিনেটাল চেকআপের হার খুবই কম। ৪৭ ভাগ মায়েরা ৪টি এন্টিনেটাল চেকআপ নেয়, বাকিরা নিতে হবে যে সেটিও জানে না। এজন্য আমরা বলি যে, গর্ভাবস্থায় মায়েদের এন্টিনেটাল চেকআপ খুবই জরুরি। একইসঙ্গে হসপিটাল ডেলিভারি বাড়াতে হবে, ডেলিভারির পরে যে কেয়ার নেওয়া হয়, সেটিও বাড়াতে হবে।’

সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসী বেগমের সভাপতিত্বে এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. টিটো মিঞা, স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম, ওজিএসবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. টিএ চৌধুরী। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ওজিএসবি
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক