ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু
চেয়ারম্যান, শিশু নিউরোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
১০ এপ্রিল, ২০২৩ ০৫:০৬ পিএম
যে কারণে গ্রামের তুলনায় শহরে অটিজম আক্রান্তের হার অনেক বেশি
অটিজম শিশুদের মস্তিষ্ক বিকাশজনিত একটি সমস্যা। স্বচ্ছ ধারণা না থাকার কারণে এটি নিয়ে অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়েন। জন্মের দেড় বছর থেকে ৩ বছরের মধ্যে অটিজমের লক্ষণসমূহ প্রকাশ পায়। সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য কোন চিকিৎসা না থাকলেও দ্রুত শনাক্ত করা গেলে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অটিজম কি
অটিজম হচ্ছে শিশুদের নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার এবং নিউরো ডেভলেপমেন্টাল ডিজঅর্ডার। শিশুদের ব্রেনের বিকাশ হয় মায়ের গর্ভকালীন সময় থেকে জন্মের প্রথম ৫ বছর পর্যন্ত। এটিকে মস্তিষ্কের বিকাশ বলা হয়। এ বিকাশে যদি কোথাও সমস্যা হয়, তাহলে সেটিকে অটিজম হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। তাহলে বলা যায় অটিজম শিশুদের মস্তিষ্ক বিকাশজনিত একটি সমস্যা।
এ ধরনের শিশুরা এক বছর বয়সে হাঁটা ও কথা বলা শুরু করে, কিন্তু দেড় বছর বয়সে এসে এদের কথা বলতে অসুবিধা শুরু হয়। আচার-আচরণেও সমস্যা দেখা দেয়। যেমন-তারা অন্য শিশুদের সাথে মিশতে পারে না। তাদের মধ্যে এমন কিছু অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দেয়, যা অন্য কোন স্বাভাবিক শিশুর মধ্যে থাকে না। তারা একই কাজ বারবার করতে পছন্দ করে, একি খাবার পছন্দ করে, একি শার্ট গায়ে দিতে পছন্দ করে। তাদের কিছু নির্দিষ্ট জিনিস আছে, যেগুলো নিয়ে তারা চলতে পছন্দ করে।
কারণ
বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে অটিজম নিয়ে অনেক গবেষণা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েও এ বিষয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি। শুধু এতটুকু সবাই নিশ্চিত যে, এটি একটা জিনগত সমস্যা। পাশাপাশি পরিবেশগত কোনো সমস্যা থাকলে এর মাত্রাটা আরও বেড়ে যায়। অটিজমের মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা এই দুটো বিষয়কেই ধরে থাকেন।
লক্ষণ
অটিজম আক্রান্ত একটি শিশুর দেড় বছর বয়স থেকে কিছু লক্ষণ দেখা যায়। তিন বছরে এসে পুরোপুরি চিত্রটা প্রকাশ পায়। তখন চিকিৎসকরা এটির প্রকারভেদ করে থাকেন। যেমন-সিভিয়ার আকার, মডারেট আকার ও মাইল্ড আকার। অর্থাৎ কম মাত্রা, মধ্যম মাত্রা ও বেশি মাত্রার অটিজম। বেশি মাত্রার অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা একটু আলাদা। তবে মডারেট ও মাইল্ড অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা করালে অনেকাংশে নিরাময় করা সম্ভব।
শুরুতে প্রতিরোধ করতে না পারলে, দিন দিন সমস্যা বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে দেখা যায়, সে অন্য শিশুদের সাথে মিশতে চায় না, একা থাকতে পছন্দ করে, একা একা নির্দিষ্ট কিছু জিনিস নিয়ে খেলতে পছন্দ করে।
স্বাভাবিক শিশুরা যে ধরনের খেলাধুলা করে, অটিজম আক্রান্তরা সে ধরনের খেলাধুলা করে না। অটিজম আক্রান্ত শিশুরা বোতল, ব্রাশ কিংবা কাগজের টুকরো নিয়ে খেলাধুলা করে। এ ধরনের শিশুদের নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় কম, চোখে চোখ রেখে কথা বলে না। তারা বেশি রাতে ঘুমাতে চায়। এদের হজমের অসুবিধা থাকে। কখনো কখনো তারা অধিক পরিমাণে হাইপার থাকে। অনেক সময় কারো কারো খিঁচুনি ও মৃগি রোগ দেখা দেয়।
শনাক্তকরণ
অটিজম কোনো রোগ নয়, কিন্তু আটিজম আক্রান্তদের মধ্যে কিছু রোগের বৈশিষ্ট দেখা যায়। এজন্য বলা হয়ে থাকে অটিজম বৈশিষ্টসম্পন্ন শিশু। গ্রিস শব্দ অটোস থেকে অটিজম শব্দের উৎপত্তি। অটোস শব্দের অর্থ হচ্ছে যে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায়, অন্যদের সাথে মিশতে চায় না। কিছু স্ক্রিনিং টেস্ট বা ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে সমস্যাটি শনাক্ত করা যায়। এম চার্ট নামে একটি স্ক্রিনিং টেস্ট আছে, যেখানে অনেকগুলো প্রশ্ন আছে। সেগুলো দেখে চিকিৎসকরা বুঝতে পারেন, শিশুটি অটিজম বৈশিষ্ট সম্পন্ন কি না। এরপর বড় ধরনের কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছেন, যেমন-এডোজ, কার্টস এগুলো করা হয়।
অটিজম চিহিৃতের জন্য চিকিৎসকদের সাথে সাথে কিছু মনোবিজ্ঞানীদেরও সাহায্যের প্রয়োজন হয়। যেহেতু এ সমস্যার সঙ্গে জেনেটিক সম্পর্ক আছে। কখনো কখনো অটিজম সম্পন্ন শিশুদের জেনেটিক টেস্ট করা হয়ে থাকে। কোনো পরিবারের প্রথম শিশুর অটিজমের সমস্যা থাকলে পরের জনেরও আক্রান্ত হওয়ার ৫-১০ শতাংশ আশঙ্কা থাকে। এক্ষেত্রে আগের শিশু কোন ধরনের জীনের সমস্যার কারণে অটিজমে আক্রান্ত ছিল, এটি শনাক্ত করা গেলে পরবর্তী শিশু গর্ভে আসার আগেই মায়ের পেটের পানি পরীক্ষা করার মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়।
আক্রান্তের হার
২০১০ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এবং ২০১৭ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের শিশুদের চেয়ে শহরের শিশুরা বেশি অটিজমে আক্রান্ত হয়। দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ৩ শতাংশ শিশু অটিজমে আক্রান্ত। তবে গ্রামে এ সংখ্যাটা অনেক কম। গ্রামে প্রতি ৭০০ জন শিশুর মধ্যে এক জন অটিজমে আক্রান্ত হয়। শহর ও গ্রামের এ পার্থক্যটা পরিবেশগত কারণে। জেনেটিক সমস্যা শহর-গ্রাম সব জায়গায় সমান। শহর আর গ্রামের পরিবশেগত বিস্তর ফারাকের কারণে গ্রামের তুলনায় শহরে অটিজম আক্রান্তের হার অনেক বেশি।
অটিজমে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা বেশি আক্রান্ত হয়। ৪ জন অটিজম আক্রান্ত ছেলের বিপরীতে এক জন মেয়ে অটিজমে আক্রান্ত হয়। এই তারতম্যের পেছনে অনেকগুলো হাইফোথেসিস আছে। ছেলেদের মধ্যে এক্স,ওয়াই ক্রোমোজম থাকে, আর মেয়েদের মধ্যে ২টি এক্স ক্রোমোজম থাকে। ছেলেদের যেহেতু এক্স ক্রোমোজম একটি, তাই ছেলেরা বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। আরও একটি বিষয় হলো-বাবার বয়স যদি বেশি হয়, তাহলে সন্তানদের অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চিকিৎসা
ইতোপূর্বেই বলা হয়েছে অটিজম কোনো রোগ নয়, অটিজম আক্রান্তদের মধ্যে কিছু রোগের বৈশিষ্ট দেখা যায়। সুতরাং অটিজমের নির্দিষ্ট তেমন কোনো চিকিৎসা নেই। তবে বেশ কিছু বিষয় অবিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। প্রথমত, রাতে শিশুদের দেরিতে ঘুমানো যাবে না। দ্বিতীয়ত, মোবাইল ফোন হাতে দেওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, শিশুদের সাথে শুরুতেই একের অধিক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া অটিজমের ধরন অনুযায়ী অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে হবে। যেমন-কারও ঘুমের সমস্যা থাকলে, সেটার চিকিৎসা করাতে হবে। আচরণে সমস্যা থাকলে, সেটির চিকিৎসা করাতে হবে। এভাবে ধরন অনুযায়ী পৃথক চিকিৎসা করাতে হবে।
এসএস/এএইচ