স্বাস্থ্য সেবা অধিকার, জানে না পথশিশুরা
সালাহউদ্দীন কাদের: প্রতিটি শিশুই অপার সম্ভাবনা নিয়ে মায়ের উদর থেকে আসে এই পৃথিবীতে। কিন্তু সামাজিক বিচ্যুতির কারণে কিছু শিশুর সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। বলছি সেসব শিশুদের কথা, যাদের বেড়ে ওঠা কোনো রাস্তার পাশে, রেল স্টেশনে বা লঞ্চ টার্মিনালে। এসব শিশুদের অধিকাংশই জানে না তাদের বাবার পরিচয়। আবার অনেকে জানলেও পারিবারিক কলহের জেরে তাদের বাবা, মায়ের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে। এদের নেই কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা। খোলা আকাশ, ফুটপাত, রেলস্টেশন, ফেরিঘাট ও লঞ্চ টার্মিনাল কিংবা বাস স্টেশনেই এদের থাকার জায়গা। এভাবে জীবন তাদেরকে দাঁড় করিয়ে দেয় এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি।
স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত
পথশিশুরা প্রায় সবাই মৌলিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য পুষ্টিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে চিকিৎসাসেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। এসব সুবিধাবঞ্চিত পথশিশুদের অধিকাংশই তাদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে কোনো খেয়াল রাখে না। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা বলেন, চিকিৎসা সেবা নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তাদের নেই।
তামান্না, বয়স মাত্র ১৩ বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুল বিক্রি করে চলে তার জীবনচাকা। সঙ্গে রয়েছে তার দুই ছোট ভাই সুজন (০৮) ও সবুজ (০৬)। যে বয়সে তাদের মায়ের আঁচলে থাকার কথা, সে বয়সে কিনা তাদের নামতে হয়েছে নির্মম বাস্তবতায়। ছোট দুই ভাইকে নিয়ে সারাদিন ফুল বিক্রি করে যা আয় হয়, তা দিয়ে তাদের খাওয়ার যোগান হয়। সুজন বেশ কয়েকদিন জ্বরে ভুগছে। কিন্তু তাদের আয় দিয়ে ডাক্তার দেখানো সম্ভব নয়।
অর্থাভাবে হয় না চিকিৎসা
সুজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রতিদিন আয় ১০০-২০০ টাকা। এই টাকায় চলে তাদের তিন বেলা খাবার। বাবা-মা অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ায় তারা এখন জেলে আছে। ফলে চিকিৎসা সেবা তো দূরের কথা প্রতিদিনের খাদ্য জোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
শাহবাগ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকা মমিন নামে এক পথশিশু বলেছে, যেখানে তিনবেলা খাওয়ার টাকা উপার্জন করা তাদের কাছে কষ্টসাধ্য, সেখানে অসুস্থ হলে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করা তাদের জন্য বিলাসিতা। কান্না জড়িত কণ্ঠে সে বলেছে, কিছুদিন আগে প্রচণ্ড জ্বরে ভুগেছিল। কিন্তু চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। তাই রাস্তার পাশের ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে খেয়েছে।
কমলাপুর রেল স্টেশনে থাকা হাসানুজ্জামান নামে আরেক পথশিশুর ফুটবল খেলতে গিয়ে পা ভেঙে যায়। তখন স্থানীয় মানুষজন দেখে তাকে হাসপাতাল নিয়ে ভাঙা পায়ে প্লাস্টার করে দেয়। কিন্তু অর্থের অভাবে নিতে পারছে না প্লাস্টার পরবর্তী চিকিৎসা সেবা। তাই পায়ের কোন উন্নতি দেখতে পাচ্ছে না।
ওদের মতো অনেক পথশিশু রাস্তার পাশে অসুস্থ হয়ে পড়ে রয়েছে। অর্থের অভাবে দেখাতে পারছে না কোনো ভালো মানের চিকিৎসক। আবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে তাদের শরীরে বাসা বাঁধছে শারীরিক, মানসিক রোগ থেকে শুরু করে এইডসের মতো ভয়াবহ রোগ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর মেডিভয়েসকে বলেন, পথশিশুদের প্রথম স্বাস্থ্যঝুঁকি হচ্ছে তাদের পরিবেশের যতো প্রতিকূলতা তা সহ্য করে চলতে হয়। এখন গ্রীষ্মের সময় চলছে, এখন তাদের রোদ, বৃষ্টি সহ্য করতে হচ্ছে। আবার যখন শীত আসবে তখন অনেকে ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হবেন। কেউ কেউ নিউমোনিয়া পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে যায়। তার মানে পরিবেশের প্রতিকূলতার কারণে তাদের কিছু অসুখ হচ্ছে।
তিনি বলেন, পথে যে সব শিশুরা থাকছে তাদের নিরাপদ পানির কোনো নিশ্চয়তা নেই। এতে ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড থেকে শুরু করে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ার কারণে তারা বেশ অপুাষ্টিতে ভোগে। এতে ছোটখাটো অসুখ তাদের সহজে আক্রমণ করে। এ ছাড়া ভিটামিন ‘এ’ এর অভাবে রাতকানা, ভিটামিন ‘ডি’ এর অভাবে মুখের ঘা হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মাদকে ক্ষুধা নিবারণ
অনেক পথশিশু মাদকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। মাদকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দুটি প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে এ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘অনেক পথশিশু অর্থের অভাবে মাদক বিক্রি শুরু করে। সেখান থেকে তারা গাঁজা, ফেন্সিডিলসহ নানা ধরনের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। আর একটি কারণ হচ্ছে, যখন তাদের ক্ষুধা লাগে, তখন খাবার না পেয়ে মাদক গ্রহণ করে ক্ষুধা নিবারণ করে থাকে।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ড্যান্ডি নামে একটি মাদক ছড়িয়ে পড়েছে সারা ঢাকার শহরে। এটি মূলত এক ধরনের আঠা। এই আঠা সাধারণত জুতা মেরামতের কাজে ব্যবহৃত হয়। অত্যন্ত সহজলভ্য হওয়ায় এবং মোটামুটি সব এলাকায় এটি সহজে পাওয়া যায়। পথশিশুরা মারাত্মকভাবে এই ড্যান্ডি নেশার আসক্ত হয়ে যাচ্ছে। এই নেশার মূল কারণ ক্ষুধা কমানো। এই নেশা গ্রহণ করলে বেশ অনেকটা সময় ক্ষুধার অনুভূতি থাকে না। আর এই ছোট ছোট শিশুরা এই নেশার ফাঁদে পড়ে তলিয়ে যাচ্ছে নেশার অতল গহ্বরে।
ডা. আব্দুস সবুর বলেন, বিশেষ করে মেয়ে শিশুরা দালাল চক্রের খপ্পরে পরে যৌনকাজে বাধ্য হচ্ছে। ফলে তারা নানা রকম যৌন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। একসময় এরা ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবে রোজগারের পথ করে নিচ্ছে।
পথশিশুদের পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ আদমশুমারিতে ভাসমান মানুষ সম্পর্কে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, দেশে চার লাখের মতো পথশিশু রয়েছে, যার অর্ধেকই অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকায়।
অন্যদিকে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। ঢাকার হিসাব অবশ্য তাদের কাছে নেই। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ঢাকাতেই ছয় লাখ পথশিশু রয়েছে।
৫৪ শতাংশের অসুস্থতায় দেখার কেউ নেই
পথশিশুদের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ২০১৬ সালে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (সিপ)। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৪ শতাংশ অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই ও ৭৫ শতাংশ শিশু অসুস্থতায় চিকিৎসকদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করতে পারে না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পথশিশুদের প্রায় ৪৪ শতাংশ মাদকাসক্ত, ৪১ শতাংশ শিশুর ঘুমানোর কোনো বিছানা নেই, ৪০ শতাংশ শিশু প্রতিদিন গোসলহীন থাকে, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলত্যাগ করে।
ঢাকায় পথশিশুদের মাত্র দুটি সরকারি শেল্টার হোম আছে। তাতে সব মিলিয়ে তিনশ' শিশু থাকতে পারে। আর বেসরকারি উদ্যোগে কিছু শেল্টার হোম আছে, যেখানে পথশিশুরা রাতে থাকতে পারে। তবে তা পথশিশুদের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। বিভিন্ন কারণে ঢাকা শহর ছাড়াও অন্য বিভাগীয় শহরগুলোতে ভাসমান শিশুর সংখ্যা বাড়ছে।
তামান্না, মমিন, সুজন ও হাসানুজ্জামন নামে এ রকম অসংখ্য সুবিধা বঞ্চিত শিশু রয়েছে, যারা শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে। সমাজের নিষ্ঠুর সত্যের সাথে এরা বাস করে। আরাম-আয়েশের ঠিক উল্টো চিত্রে এদের বসবাস। অথচ এসব পথশিশুদের পড়াশোনা, শিক্ষার পাশাপাশি সুস্বাস্থ্যের বিষয়টি নিশ্চিত করা যেতে পারলে তারাও হয়ে উঠতে পারে দেশের জন্য দক্ষ মানব সম্পদ।
এমইউ
-
১৬ অক্টোবর, ২০২২
মেডিভয়েসকে ঢাবির ২য় প্রফে ২য় তুর্জয় কবির
প্রশ্নোত্তরে প্রাসঙ্গিক ছবি এঁকে দিলে বেশি নম্বর পাওয়া যায়
-
০৩ জুলাই, ২০২২