অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান

চেয়ারম্যান, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ;
কোষাধ্যক্ষ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়


০৪ জুন, ২০২২ ০৪:৩৯ পিএম

দেশ, বিশ্ব ও মানুষকে বাঁচাতে পরিবেশ রক্ষার বিকল্প নাই

দেশ, বিশ্ব ও মানুষকে বাঁচাতে পরিবেশ রক্ষার বিকল্প নাই
অপরিকল্পিত নগরায়ন, যততত্র ময়লা ফেলা, পলিথিনের ব্যবহারের মহোৎসব পরিবেশকে দূষিত করছে। প্রতীকী ছবি

তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খড়া, প্রবলমাত্রায় ঘনঘন ঝড়বৃষ্টিসহ নানা কারণেই বিশ্বের মানুষ হুমকির মধ্যে রয়েছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ পানি দূষণ, স্থালভাগ/মাটি দূষণের কারণে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। তামাক চাষ, ধূমপান, কলকারখানা ও গাড়ির ধোঁয়া পরিবেশকে দূষিত করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, যততত্র ময়লা ফেলা, পলিথিনের ব্যবহারের মহোৎসব পরিবেশকে দূষিত করছে।

গ্রিন হাউজ ইফেক্ট, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়সহ পৃথিবীর পর্বতসমূহের জমাটবাঁধা বরফ গলার আশঙ্কায় পৃথিবীর মানুষসহ সকল জীব বৈচিত্র্য হুমকির মধ্যে রয়েছে। এ অবস্থায় দেশ, বিশ্ব ও মানুষকে বাঁচাতে পরিবেশ রক্ষার বিকল্প নাই। ভারসাম্যপূর্ণ সুন্দর পরিবেশই রক্ষা করতে পারে আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীকে। নিরাপদ পরিবেশ জনস্বাস্থ্য রক্ষায়ও অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ নামক ব-দ্বীপ রক্ষায় বিশ্বব্যাপী নিরাপদ পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। পরিবেশ দূষণের কারণে সমুদ্রের জলরাশির উচ্চতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি সেই জলরাশির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সিডর, আইলার মতো প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় যা মুহূর্তের মধ্যেই বিপুল প্রাণহানিসহ সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে সে আশঙ্কাও রয়েছে। এই অবস্থায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

যতদূর জানা যায়, ১৯৬৮ সালের ২০ মে জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক পরিষদের কাছে একটি চিঠি দেয় সুইডেন সরকার। চিঠির বিষয়বস্তু ছিল প্রকৃতি ও পরিবশে দূষণ সম্পর্কে উদ্বেগের কথা। একই বছর জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সাধারণ অধিবেশনের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৬৯ সালে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সমাধানের উপায় খুঁজতে সদস্য রাষ্ট্রেগুলোর সম্মতিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনটি ইতিহাসের প্রথম পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের স্বীকৃতি পায়। ১৯৭৪ সালে সম্মেলনের প্রথম দিন ৫ জুনকে জাতিসংঘ ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালন করা হচ্ছে। পরিবেশ রক্ষায় সচেতনা বৃদ্ধি, নতুন নতুন পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে বিশ্ব পরিবেশ দিবস গুরুত্বসহকারে পালন করা হয়। বিশ্বের বুকে প্রকৃতির অবদান সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে এই দিবস উদযাপিত হচ্ছে। জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রকৃতির অবদান সম্পর্কে  মানুষকে সচেতন করার ক্ষেত্রে এই দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতিকে রক্ষা করাও যে মানুষের কর্তব্য সে সম্পর্কে বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও প্রতিবছর এই দিবসে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সামাজিক-স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, এনজিও জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে র‌্যালি, লিফলেট বিতরণ, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে থাকে।

জানা গেছে, ২০২২ সালে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের শ্লোগান হলো ‘অনলি ওয়ান আর্থ কলস ফর কালেক্টিভ, ট্রান্সফরমেটিভ এ্যাকশন অন এ গ্লোবাল স্কেল টু সেলিব্রেট, প্রটেক্ট এন্ড রিস্টোর আওয়ার প্ল্যানেট’। সংক্ষেপে বলা হয়েছে ‘পৃথিবী একটাই তোমার আমার সবার’।

বর্তমান বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণেও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। যানবাহন ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করছে। এসব ধোঁয়ায় রয়েছে ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদান যা ফুসফুসে দীর্ঘমেয়াদী শ্বাসকষ্ট রোগ সৃষ্টি করছে।  বর্তমানে নগরায়নের সঙ্গে শিল্পায়নও বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কতটুকু স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপদ পরিবেশ রক্ষার নিয়ম মেনে চলছে, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। ঘনবসতিও পরিবেশ দূষণের কারণ। অনেক উন্নত শহরে যেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ৮ থেকে ১০ মানুষ বসবাস করে সেখানে ঢাকা শহরে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় লক্ষ মানুষ বসবাস করছে। ফলে মানুষ বেশি, তাই ময়লা ও বর্জ্য বেশি, গাড়ি বেশি, ভবন বেশি যা নিরাপদ পরিবেশের অন্তরায়। পরিবেশবান্ধব নগরকে গড়ে তুলতে সিটি কর্পোরেশন, রাজউক, ওয়াসাসহ অন্যান্য সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে নগর সরকার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। একটা কথা জোর দিয়ে বলা যায়, পরিবেশ বাঁচলে জীববৈচিত্র বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে। আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম বাঁচবে। তাই পরিবেশ রক্ষায় আমাদের সকলকেই আরো উদ্যোগী ও সক্রিয় হতে হবে।

নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম জোরদারসহ পরিবেশের জন্য যা যা করণীয় তা অবশ্যই পালন করতে হবে। আর যা বর্জনীয় তা অবশ্যই পরিহার করতে হবে। পলিথিনের ব্যবহার, ধূমপান, তামাক চাষ, যত্রতত্র ময়লা ফেলা, বিভিন্নভাবে পানি ও বায়ুকে দূষণ করা, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন, অনুপযুক্ত স্থানে অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ইটেরভাটা তৈরি ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে। পরিশেষে বলবো, বিশ্ব পরিবেশ দিবসের জয় হোক। আসুন, পরিবেশ রক্ষায় নিজে সচেতন হই এবং অন্যকে সচেতন করি। অস্বাস্থ্যকর বিষয় এড়িয়ে চলি। সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর জীবনের জন্য এবং পৃথিবীকে রক্ষায় সফল হোক, সার্থক হোক বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২২।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত