২৬ এপ্রিল, ২০২২ ০৫:৫১ পিএম

১০ মাস ভাতা পান না নন-রেসিডেন্ট চিকিৎসকরা, ধার-দেনায় চলছে জীবন

১০ মাস ভাতা পান না নন-রেসিডেন্ট চিকিৎসকরা, ধার-দেনায় চলছে জীবন
আগামী জুনের বাজেটে এটা হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আশা করা যায়, এই বাজেটে পেয়ে যাবো।’

মো. মনির উদ্দিন: গত দশ মাস ধরে ভাতা পাচ্ছেন না বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজ ও ইনস্টিটিউটগুলোতে ডিপ্লোমা-এমফিল (নন-রেসিডেন্সি) কোর্সে অধ্যয়নরত ২১-২৩ সেশনের আট শতাধিক চিকিৎসক। ফলে ধার-দেনা করে মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে তাদের। ইন্টার্নশিপে ভাতা পেলেও বিনা টাকায় পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্স চালাতে গিয়ে হতাশ এসব নবীন চিকিৎসক।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় এখনো কিছুই জানায়নি। 

দফা দফায় বিএসএমএমইউ ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) অধ্যয়নত একজন নন-রেসিডেন্ট চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘নির্দেশনার আলোকে আমরা প্রতি মাসে হাজিরাসহ প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাচ্ছি। ১০ মাস হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো টাকা পাচ্ছি না। এ পরিস্থিতিতে গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। স্যারের প্রথম কথা, শিক্ষার্থীরা ভাতা পাচ্ছেন না, সেটা তিনি জানেন না। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (হিসাব ও অর্থ) মো. আব্দুস সোবহানের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। দেখা করতে গেলে আব্দুস সোবহান জানান, আপনাদের ভাতা সংক্রান্ত কাজ ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে গেছে। তাতে আশ্বস্ত হয়ে আমরা আবারও ভিসি স্যারের সঙ্গে কথা বলতে যাই। তিনি বলেন, পড়াশোনা করো। তোমাদের টাকার ব্যবস্থা হবে। এর পর থেকে আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি।’

তিনি বলেন, এর এক মাস পর জানুয়ারিতে নন-রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের আরেকটি দল ভিসি স্যারের সঙ্গে সাক্ষাৎকার করতে যায়। তখন তিনি বলেন, তোমরা চলে যাও। এখন থেকে তোমাদের ভাতার ব্যবস্থা করে দেওয়া আমাদের পূর্ণ দায়িত্ব। তৃতীয় দফায় গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) প্রায় ১৬/১৭ জনের একটি প্রতিনিধি দল ভিসি স্যারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যায়। পারিতোষিকের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।’

‘এরই ধারাবাহিকতায় রোববার (২৫ এপ্রিল) সকালে ১৫/২০ জনের একটি দল অধ্যাপক শারফুদ্দিন স্যারের সঙ্গে দেখা করতে যায়। তিনি জানালেন, আপনাদের ভাতা বরাদ্দ হয়নি। বাজেট পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে এটা দেয়নি’, যোগ করেন তিনি। 

কোর্স চালাতে লাখ টাকা ঋণ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের একজন নন-রেসিডেন্ট চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা পুরোপুরিই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। আসন্ন ঈদ রোস্টার অনুযায়ী মর্নিং, ইভিনিং, নাইট করতে হবে। ডিউটি আমাকে করতেই হচ্ছে। প্রতিটি নোটিসে সাড়া দিচ্ছি। বিনা পয়সায় মর্নিং করার পর নাইট করার মানসিক জোর কোথা থেকে আসবে? কোর্সের নিয়ম অনুযায়ী, আমরা কোনো চাকরি করতে পারি না। আমরা চলবো কিভাবে? আমাদেরকে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে। এখন মাসের পর টাকা পাচ্ছি না। এমনটি জানলে আমরা এই কোর্সে ভর্তি হতাম না। আমরা জেনেছি, ভাতার বিষয়টি সিন্ডিকেট মিটিংয়ে পাস হয়েছে। এতেই আশাবাদী হয়ে সবাই ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়েছে।’

জীবন-যাপনে অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘জীবনের এই পর্যায়ে এসে মাসের পর মাস পকেটশূন্য—পরিবারের সদস্যদের কাছে তো এ কথা বলাও যাচ্ছে না। টাকাও চাইতে পারছি না। তাহলে চলবো কীভাবে? আমাকে তো বাসা ভাড়া দিতে হচ্ছে, খাওয়া-দাওয়া করতে হচ্ছে, জীবনের প্রয়োজনে সব চালাতে হচ্ছে। কোর্স চালাতে গিয়ে এ পর্যন্ত ৮০/৯০ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। এসবই হচ্ছে ধার-কর্জায়। কোর্সে অধ্যয়নরত আট শতাধিক চিকিৎসকের অনেকেই বিয়ে-শাদি করেছেন। কারও আছে সন্তান-সন্ততি।’

চরম হতাশায় দিন পার করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা বিনা পারিতোষিকে করোনার মধ্যেও ডিউটি করেছি। কারও কারও হিসাব অনুযায়ী, ৫০ হাজার টাকায়ও চলে না। আমরা যে এক টাকাও পাই না, আমাদের কিভাবে চলে, তাতো কেউ দেখছে না! আমরা একজন আত্মীয়-স্বজনের বাসায়ও যেতে পারি না। এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর একজন চিকিৎসক পোস্টগ্রাজুয়েশনের সময়টায় কিভাবে চলবে? কোর্সের দুই বছর তার থাকা-খাওয়া কিভাবে চলবে? পরিবার চালাবে কিভাবে? এটা দেখার কেউ নেই। ভিসি স্যার বলেছেন, পড়াশোনা করো। পেটে ভাত না থাকলে কিভাবে পড়াশোনা হবে? দুই বেলা খেয়ে তো বাঁচতে হবে?’

তার প্রশ্ন, হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট হয়, ‘বিএসএমএমইউর অধীনে চলমান কোর্সের এই অবস্থা কেন? সাকুল্যে ১৫ কোটি টাকা হলেই তো এ সংকট মিটে যায়। দেশে এতো এতো বরাদ্দের ভেতরে এই টাকা আহামরি কোনো পরিমাণ। প্রধানমন্ত্রীর পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকদের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে প্রশ্ন আসে চিকিৎসকরা করোনাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংকটে কী দিলো? অথচ আমাদের কেউই ডিউটি পালনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছেন না। এখানে আমাদের পেছনে যে বরাদ্দ করার কথা রয়েছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসকরা।’

গ্রাজুয়েট-আন্ডার গ্রাজুয়েটে নেই পার্থক্য 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক) অধ্যয়নরত আরেক নন-রেসিডেন্ট চিকিৎসক বলেন, ‘আমাদের অবস্থা হয়ে গেছে আন্ডার গ্রাজুয়েট একজন বেকার চিকিৎসকের মতো। অথচ তাঁরাও তো প্রাকটিস করার সুযোগ পাচ্ছেন। মেধার লড়াইয়ে স্বীকৃতি পেয়ে এখানে ভর্তি হয়েছি। আমরা বিশেষায়িত সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি, অথচ আমাদের পেটে ভাত নেই। তাহলে আমাদের আর ওদের মধ্যে পার্থক্য কী? আমরা যেখানে ডিউটি করি, সেখানে ইন্টার্ন নেই। দেশের ইন্টার্নরা তো ১৫ হাজার টাকা করে পান। সেখানে আমাদের অবস্থান কোথায়? আমি কোনো টাকা পাই না, কিভাবে সেবা দিয়ে যাবো? কিন্তু সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আমি বাঁচবো কীভাবে? খাবো কী, পরবো কী?’

কোর্সে ভর্তি হতে খরচ লক্ষাধিক টাকা 

চমেকের এই নন-রেসিডেন্ট চিকিৎসক আরও বলেন, বিএসএমএমইউ কোর্সটি চালু করেছে, ভাতা নিশ্চিত করতে না পারলে বন্ধ করে দেওয়া হোক। আমি কোর্সে ভর্তি হয়েছি ১৫ হাজার টাকায়। আরেকজন ভর্তি হয়েছে ৪৫ হাজার টাকায়। সদ্য পাস একজন চিকিৎসক এই টাকা কোথা থেকে দিয়েছে? অনেক মেডিকেল কলেজে ১ লাখ গুণতে হয়। কোথাও আবার ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। রাষ্ট্র আমাদের দুঃখ না বুঝলে মেধা দিয়ে কী হবে?

যেহেতু আমরা বাইরে কোথাও প্রাকটিস করতে পারছি না, সেহেতু আমাদের অভিভাবক হিসেবে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টি ভেবে দেখা যে, এভাবে ছেলেগুলো বাঁচবে কীভাবে? কারণ সবার আর্থিক অবস্থা তো এক না। বিএসএমএমইউতে বড় বড় ভবন হচ্ছে, স্পেশালাইজড হাসপাতাল হচ্ছে। কিন্তু আমরা যে কি খাচ্ছি, আমাদের খবর রাখা হচ্ছে না।

বিএসএমএমইউ ভিসির বক্তব্য

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা তাদের ব্যাপারে সামগ্রিক তথ্য জমা দিয়েছি। এখনো মন্ত্রণালয় কিছুই জানায়নি। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।’

আগামী জুনের বাজেটে এটা হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেখি, এই বাজেটে ধরতে পারি কিনা, আশা করা যায়, পেয়ে যাবো।’

এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব মো. সাইফুল হাসান বাদলকে ফোনে করে পাওয়া যায়নি। 

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট মিটিংয়ে নন-রেসিডেন্সি কোর্সে অধ্যয়নরত চিকিৎসকদের ২০ হাজার টাকা করে ভাতা প্রদান সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ঐতিহাসিক এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রতি বছর ৯ শতাধিক চিকিৎসক ভাতার আওতায় আসেন।

তবে নানা জটিলতায় তা চালু হতে সময় লেগে যায় এক বছরের ওপরে। গত বছরের ৩১ আগস্ট ২০-২২ সেশনের নন-রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের চেক হস্তান্তরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় পারিতোষিকের টাকা প্রদানের কাজ। ভাতা সংক্রান্ত বিল পাসের সময় অধ্যয়নরত সকল শিক্ষার্থী এর আওতাভুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও ১৯-২১ সেশনের শিক্ষার্থীরা এ থেকে বঞ্চিত হন

একইভাবে পরের সেশনের (২১-২৩) শিক্ষার্থীদের ভাতা প্রদানেও দেখা দেয় জটিলতা। গত বছরের জুলাইয়ে সেশন শুরু হলেও এখন পর্যন্ত ভাতা পাচ্ছেন না তারা। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ডিপ্লোমা-এমফিল
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি