‘দেশেই রয়েছে ক্যানসারের সকল চিকিৎসা’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে ক্যানসার সম্পর্কে অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে। চিকিৎসা নেই, চিকিৎসক স্বল্পতা থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা, চিকিৎসা সেবা অপ্রতুলতা ও ব্যবস্থাপনার ত্রুটি নিয়ে অভিযোগও নতুন কিছু নয়। অনেকে এই রোগের চিকিৎসার জন্য অন্য দেশে চলে যান। কিন্তু দেশে ক্যানসারের সকল ধরনের চিকিৎসা রয়েছে, এ বিষয়টা অনেকের অজানা। তাই ক্যানসার প্রতিরোধে প্রাথমিক চিকিৎসা-প্রতিকার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
মেডিভয়েসের সঙ্গে আলাপচারিতায় মরণব্যাধি ক্যানসার নিয়ে পরামর্শ দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন অধ্যাপক ডা. কাজী মুশতাক হোসেন।
ক্যানসারের কারণ:
অধ্যাপক ডা. কাজী মুশতাক হোসেন বলেন, ক্যানসারের কারণ সম্পর্কে অনেকে জানেন। ক্যানসারের প্রধান কারণ হচ্ছে ধূমপান। ধূমপান করলে শুধু ফুসফুসের ক্যানসার হয় না। মুখ, গহ্বর, গলা, শ্বাসনালী, খাদ্যস্থলী, পাকস্থলি ও মূত্রথলীর সঙ্গেও এই ধূমপানের সম্পর্ক রয়েছে। অনেকে ফ্যাশন, স্মার্টনেস প্রকাশের উদ্দেশ্যে ধূমপান করে থাকেন। এতে যিনি ধূমপান করছেন, তার তো ক্ষতি হচ্ছেই। ধূমপায়ীর পাশের ব্যক্তিরও সমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এটিকে পরোক্ষ ধূমপান বলে। এই নিকোটিন বাতাসের মাধ্যমে অন্যের দেহে প্রবেশ করছে। ফলে দুজনই সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। তাই বইটি পড়লে নিজেকে সুরক্ষা দিতে পারবেন।
ক্যানসারের চিকিৎসা সম্পর্কে অধ্যাপক ডা. কাজী মুশতাক হোসেন বলেন, ক্যানসার নিয়ে দেশে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে বলে দেশে চিকিৎসা হয় না। প্রকৃতপক্ষে ক্যানসারের চিকিৎসা কিছুটা অপ্রতুল। যে পরিমাণ ক্যানসার চিকিৎসার কেন্দ্র দরকার। সেই পরিমাণ কেন্দ্র নেই। এ ছাড়া এই রোগের চিকিৎসা নেই কিংবা চিকিৎসক নেই, এটা সঠিক না। অনেকে এই রোগের চিকিৎসার জন্য অন্য দেশে যান। কিন্তু দেশে ক্যানসারের সকল ধরনের চিকিৎসা রয়েছে। এর মধ্যে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, সার্জারি ও হরমোন থেরাপিসহ প্রায় সব ধরনের চিকিৎসা রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে এটি বিদ্যমান রয়েছে। অনেকে অপপ্রচারে প্রলুব্ধ হয়ে কবিরাজি ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। ফলে ক্যানসারের ভয়াবহতা আরও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকে চিকিৎসার আওতার বাইরে থাকছেন। এটি দেশের জন্য বড় ধরনের সমস্যা। সঠিক সময়ে চিকিৎসা নেওয়া গেলে ক্যানসার নিরাময় করা সম্ভব।
ক্যানসারের ধাপ:
অধ্যাপক ডা. কাজী মুশতাক হোসেন বলেন, ক্যানসারের কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগের চিকিৎসা করা গেলে একজন ক্যানসার রোগী নিরাময় লাভ করতে পারবেন এবং দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন। এটি পরীক্ষিত ও প্রমাণিত। কিন্তু সচেতনতার অভাবে দেশে রোগ নির্ণত হয় অনেক দেরিতে। ফলে অনেকে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। দেশে এবং বিদেশে চিকিৎসার খুব একটা পার্থক্য নেই। বিষয়ক পার্থক্য হচ্ছে কোন পর্যায়ে এই রোগের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। বিদেশে শুরুতেই ক্যানসার নির্ণয়ের জন্য সব বয়সের মানুষের জন্য কয়েকটি টেস্ট, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা করতে হয়, যা দেশে এই বিষয়গুলো প্রচলিত নয়। ইউরোপ ও আমেরিকাতে এটি প্রচলিত, যার কারণে ওই সকল দেশে শুরুতেই রোগ নির্ণিত হচ্ছে। এজন্য তারা সব ধরনের চিকিৎসা নিতে পারেন এবং ফলাফলটা ভাল হচ্ছে। দেশে এই ধরনের চিকিৎসা নেই বলে রোগ নির্ণয় হয় দেরিতে। এতে আর কিছু করার থাকে না। বিষয়টি নির্ভর করে চিকিৎসাটি কখন শুরু হয়েছে এবং রোগটি কখন নির্ণিত হয়েছে। এজন্য প্রয়োজন সচেতনতা। এ বিষয়টি জানা থাকলে কেন ক্যানসার হচ্ছে, সেগুলো থেকে দূরে থাকা যায়।
ক্যানসার প্রতিরোধে করণীয়:
প্রতিরোধে করণীয় তুলে ধরে অধ্যাপক ডা. কাজী মুশতাক হোসেন বলেন, ক্যানসার প্রতিরোধে কোন ধরনের ভ্যাকসিন নিতে হবে বা নেওয়া উচিত। বিশেষ করে জরায়ু মুখের ক্যানসার জন্য যে ভ্যাকসিন রয়েছে, সেটি যদি নেওয়া হলে, ক্যানসার শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ইউরোপ ও আমেরিকায় সাধারণত জরায়ু ক্যানসার হয় না। এটি বাংলাদেশে বেশি হচ্ছে, এজন্য ভাইরাস দায়ী। এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে নির্ধারিত ভ্যাকসিন নিতে হবে। তেমনি এ বিষয়ে সচেতন হলে স্ক্র্যানিং পদ্ধতি প্রয়োগ করলে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হবে। এটির ফলে রোগ প্রতিরোধে সুচিকিৎসা বা পরিপূর্ণ চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। এটিই হচ্ছে উন্নত দেশ ও অনুন্নত দেশের মধ্যে পার্থক্য।
আটটি বিভাগে আটটি হাসপাতাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা অনেকটা ঢাকা কেন্দ্রিক। এর বাহিরে এখন যে সেন্টারগুলো রয়েছে, সেখানে সুযোগ-সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল। আটটি বিভাগীয় শহরে সরকার আরও আটটি পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র তৈরি করতে চেষ্টা করছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার উপরে চাপ কমবে। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার লোকজন তার নিজ বিভাগে চিকিৎসা নিতে পারবেন এবং অপেক্ষামান চিকিৎসাটা কমে আসবে এবং সবাই এই রোগের চিকিৎসটা নিতে পারবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বেসরকারি হাসপাতাল ক্যানসার সেন্টার তৈরি করছেন। এটি হয়ে গেলে ঢাকা কেন্দ্রিক চিকিৎসা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে।
এআইডি