ডা. এস.এম. লুৎফর রহমান

ডা. এস.এম. লুৎফর রহমান

সহযোগী অধ্যাপক, রেসপিরেটরি মেডিসিন,
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ ১০:৫৭ এএম

বয়স্কদের নিউমোনিয়া: কারণ ও প্রতিকার

বয়স্কদের নিউমোনিয়া: কারণ ও প্রতিকার
নিউমোনিয়া আক্রান্ত হলে ফুসফুস স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না, অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। তখন শ্বাসকষ্ট হয়।

প্রতি বছর নিউমোনিয়ার কারণে হাজার হাজার শিশু ও বয়স্ক মানুষ মৃত্যু বরণ করে। ফুসফুসজনিত রোগের মধ্যে অন্যতম হলো নিউমোনিয়া। সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তিদের, যারা দীর্ঘদিন রোগে ভুগছেন অথবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের মধ্যে রোগটি বেশি দেখা যায়। শীতকালে এ রোগের প্রবণতা বেশি থাকে। আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নিলে মৃত্যুর শঙ্কা অনেকাংশে কমে আসে। চিকিৎসায় বিলম্ব হলে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে রোগীর অবস্থা হয়ে উঠে সঙ্কটাপন্ন। 

নিউমোনিয়া

ফুসফুস শ্বাসনালীর মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং রক্তে পৌঁছে দেয়। নিউমোনিয়া হলে ফুসফুস পচে যেতে থাকে, ফলে ফুসফুস শরীরের দুষিত পদার্থ (কার্বন-ডাইঅক্সাইড) রক্ত থেকে বাতাসে ছেড়ে দিতে ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ নিউমোনিয়া আক্রান্ত হলে ফুসফুস স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না, অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। তখন শ্বাসকষ্ট হয়, যেটিকে নিউমোনিয়া বলা হয়। ফুসফুস শরীরের ইঞ্জিন। আর অক্সিজেন হলো চালনা শক্তি। নিউমোনিয়া হলে ফুসফুস নষ্ট হতে থাকে। তখন এটি ঠিকভাবে অক্সিজেন গ্রহণ এবং শরীরের দূষিত পদার্থকে রক্ত থেকে বাতাসে ছেড়ে দিতে পারে না। ফলে, অক্সিজেনের ঘাটতি হয় এবং মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়ে। বয়স্কদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো নিউমোনিয়া। 

যেসব কারণে বয়স্করা আক্রান্ত হয়

সাধারণত জীবানুঘটিত কারণে নিউমোনিয়া হয়। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পাঙ্গাসের মতো জীবানুর কারণে নিউমোনিয়া হয়। যে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আমাদের নিউমোনিয়া হয়, সেটিকে স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনিয়া বলে। এটি বাতাসে ঘুরে বেড়ায়।  মুখ, শ্বাসনালী ও নাকের ভেতর এ জীবানুটা থাকে। যখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, শরীর দুর্বল হয় তখন জীবানু ফুসফুসে আক্রমণ করে। বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, শরীর দুর্বল থাকে, এজন্য আক্রান্ত হয়। এ ছড়াও আরো বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। যেমন: বয়স্করা মুখের যত্ন নিতে পারেন না। শরীরের যত্ন নিতে পারেন না। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। এজন্য বয়স্কদের নিউমোনিয়া বেশি হয়। এ ছাড়া যাদের ডায়োবেটিস আছে, স্ট্রোক হয়েছে, তারা কাঁশির সঙ্গে কফ ফেলতে পারেন না এবং বিভিন্ন রোগের কারণে হাসপাতালে ভর্তি আছে, তারা হাসপাতালের জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। করোনা ভাইরাস দ্বারাও নিউমোনিয়া হতে পারে। এর আগেও নিউমোনিয়া হতো, সেটি হলো ইনফ্লুয়েঞ্জা। করোনায় যেমন লাখ লাখ মানুষ মারা যায়, তেমনি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসেও কোটি কোটি লোক মারা গেছে এক সময়। 

লক্ষণ

জ্বর, গায়ে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কাঁশি ও এর সঙ্গে রক্ত বের হওয়া এবং বুকে ব্যথা। 

যেসব ক্ষতি হয়

ফুসফুস নষ্ট হয়ে যায়। ফুসফুস অক্সিজেনকে রক্ত পৌঁছে দেওয়ার কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। ফুসফুস অকার্যকর হয়। যেসব জীবানু দিয়ে এ রোগটি হয়, এ জীবানুগুলো শরীরে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া করে। যেমন: মানুষের মেনিনজাইটিস (মস্তিষ্কপর্দার প্রদাহ), কানের প্রদাহসহ অনেক ধরনের সমস্যা নিউমোনিয়া দ্বারা হতে পারে। সর্বোপরি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম একটি কারণ হলো নিউমোনিয়া। 

নির্ণয়ের উপায়

এটা সাধারণত বিভিন্ন সাউন্ড দেখে বোঝা যায়, যেগুলোকে ব্রঙ্কাল সাউন্ড বলে। সিটি স্ক্যান দ্বারা সুনিশ্চিতভাবে বোঝা যায়। এরপর বুকের এক্সরে করার মাধ্যমে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। এক্সরে পরীক্ষায় যদি ফুসফুস সাদা দেখা যায়, তাহলে নিউমোনিয়া। রক্তের টেস্ট করেও এ রোগ নির্ণয় করা যায়।

সুরক্ষায় করণীয়

কাঁশির মাধ্যমে এক রোগী হতে আরেক রোগীর মাধ্যমে রোগটি ছড়ায়। বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই কাঁশি দেওয়ার সময় নাক-মুখ ঢাকতে হবে। মাস্ক পরতে হবে। কাশির সময় টিস্যু ব্যবহার করতে হবে। এবং ব্যবহৃত টিস্যু নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। সামাজিক দূরত্ব (তিনফুট দূরত্ব) বজায় রাখতে হবে। সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা। স্বাস্থ্যসম্মত জীবন-যাপনের জন্য এগুলো দরকার তেমনি নিউমোনিয়া থেকে বাঁচার জন্য এগুলো দরকার। এসব বিষয়ে মেনে চললে নিউমোনিয়া, করোনাসহ বিভিন্ন রোগ থেকে নিরাপদ থাকা যায়। এছাড়াও এ রোগ হতে বাঁচতে হলে ধূমপানমুক্ত ও দূষণমুক্ত পরিবেশ থাকা। পুষ্টিকর খাবার, প্রচুর পানি, শাকসব্জি ও ফলমূল খেলে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। 
 

নিউমোনিয়া নিরাময়যোগ্য

চিকিৎসার মাধ্যমে নিউমোনিয়া ভালো হয়ে যায়। নিরাময়যোগ্য রোগগুলোর মধ্যে একটি নিউমোনিয়া। সঠিক সময় সঠিক এন্টিবায়েটিক ব্যবহার করে সুচিকিৎসা দিয়ে রোগীকে সেরে উঠানো যায়। অর্থাৎ নষ্ট ফুসফুস পুনরায় ঠিক হয়ে যায়। যক্ষ্মাতে যে নিউমোনিয়া হয়, সেটি যক্ষ্মা সেরে গেলেও ভালো হয় না। সেখানে কিছু না কিছু ক্ষত থেকে যায়। সেখানে থেকে ভবিষ্যতে আবার কফ হতে পারে। রক্ত আসতে পারে, অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়। যেটি নিউমোনিয়াতে হয় না। অর্থাৎ নিউমোনিয়া হলে স্থায়ীভাবে ফুসফুসের কোনো ক্ষতি হয় না। চিকিৎসা পরবর্তীতে ফুসফুস আগের মতো ভালো হয় যায়।

চিকিৎসা

স্বাস্থ্য বাতায়ন ও টেলি মেডিসিনের মাধ্যমে ঘরে বসে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। অনেকে চিকিৎসা নিতে দেরি করে ফেলেন, যে কারণে সমস্যা জটিল হয়ে যায় এবং হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়। মুখে এন্টিবায়োটিক দেওয়ার সুযোগ থাকে না, তখন ইনজেকশন এন্টিবায়েটিক দিতে হয়। ফুসফুস দুর্বল হলে মানুষ শ্বাস নিতে পারে না। এজন্য অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে হয়। আইসিউ’র প্রয়োজন হয়। চিকিৎসা নিতে যত দেরি হবে, খরচ তত বেড়ে যায়। শুরুতে মুখের এন্টিবডি খেলে কম খরচে চিকিৎসা হয়ে যায়। এ ছাড়া নিউমোনিয়া রোগীকে যথেষ্ট পানি পান করানো। সুষম খাদ্য খাওয়ানো। জ্বর থাকলে গা মুছে দেওয়া। জ্বরের জন্য প্যারিসিটামল বা সিরাপ ব্যবহার করে জ্বরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। অক্সিমিটার দিয়ে অক্সিজেনের মাত্রা দেখা। যদি অক্সিজেন মাত্রা ৯২ এর নিচে নেমে যায়, তাহলে তাকে অক্সিজেন দিতে হবে। হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শে এন্টিবায়েটিকসহ অন্যান্য ওষুধ খাওয়ানো। যাদের বয়স বেশি (ষাটর্ধ্বো), সাথে ডায়াবেটিস ও হার্টের সমস্যা আছে, ঘনঘন ইনফেকশন হয় তাদেরকে টিকা দিতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে এ বিষয়ে উপদেশ রয়েছে। যেকোনো রোগ হলে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি খাওয়া। নিউমোনিয়ার জন্যও এটা প্রযোজ্য। যথেষ্ট খাবার দেওয়া। শাকসব্জি, প্রোটিন জাতীয় খাবার দিতে হবে। যাতে কষ্ট না পায় এজন্য মুক্ত বাতাসে রাখতে হবে। যেখানে আলো-বাতাস রয়েছে।

এএইচ/এমইউ
 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত